মোবাইল ফোনে করারোপ

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা
নাগরিকদের ওপর করোরোপ শুধু রাষ্ট্রাচারের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং তা শাসন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কোনো সুনাগরিকের পক্ষে রাষ্ট্রের করারোপ বা কর প্রদানের বিরোধিতা করার সুযোগ নেই নাগরিকদের ওপর কর আরোপিত হয় রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য। সাধারণত কর নির্ধারিত হয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় ও সামর্থ্যরে সাথে সঙ্গতি রেখে। তাই রাষ্ট্রের কর্তব্য হচ্ছে করারোপ প্রক্রিয়া সহজীকরণ তথা সহনশীলপর্যায়ে রাখা, যাতে তা কোনোভাবেই গণদুর্ভোগের কারণ না হয়। কিন্তু আমাদের দেশে করারোপের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ অনেক পুরনো। সদ্য ঘোষিত বাজেটে মোবাইল কলের ওপর মাত্রাতিরিক্ত করারোপ সে অভিযোগেরই জোরালো ভিত্তি দিয়েছে। যা সাধারণ মানুষ মোটেই সঙ্গত মনে করছে না।
সম্প্রতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের দেশে বাজেট ঘোষণার পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কিছু গদবাঁধা প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথামতো সরকারি দল ঘোষিত বাজেটকে গণমুখী আর বিরোধী দলগুলোর পক্ষে গণবিরোধী ও উদ্দেশ্যহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য সব বাজেটেই কিছু নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক থাকে। সম্প্রতি ঘোষিত বাজেট সেই চিরচেনা বৃত্তের মধ্যেই রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কিন্তু জনজীবনের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ মোবাইল ফোনের ওপর নতুন করে করারোপের বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মোবাইল ফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ পরিণত হয়েছে। আর দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে এই প্রযুক্তির। সেবাও পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। মোবাইল ফোনের সূচনা ১৯৭৩ সালে হলেও তার প্রথম বাণিজ্যিক সংস্করণ বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে। ১৯৯০ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২.৪ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ছয় বিলিয়নের বেশি হয়ে গেছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৭ শতাংশ মোবাইল ফোন যোগাযোগের আওতায় এসেছে। সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তি বৈশ্বিক যোগাযোগ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেবার মানের ভিন্নতাও রয়েছে। কোনো কোনো দেশে এই খাতকে সেবাধর্মী করা হয়েছে। ব্যতিক্রমও রয়েছে অনেক দেশে। সঙ্গত কারণেই বিভিন্ন দেশে মোবাইল সেবার মান এবং ব্যয় অভিন্ন নয়। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বিশ্বে ভারতে মোবাইল ইন্টারনেট সবচেয়ে সাশ্রয়ী! দেশটিতে এক জিবি ইন্টারনেট ডাটার জন্য ব্যবহারকারীদের গড়ে মাত্র ১৮.৫ টাকা খরচ করতে হয়। যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রায় ৬০০ টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে এক জিবি ডাটার দাম গড়ে ০.২৬ মার্কিন ডলার। ব্রিটেনে এ জন্য খরচ করতে হয় ৬.৬৬ মার্কিন ডলার। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওই এক জিবি ডাটার জন্য গ্রাহকদের গড়ে ১২.৩৭ মার্কিন ডলার করে গুনতে হয়। বিশ্বে এক জিবি ডাটার গড় দাম ৮.৫৩ মার্কিন ডলার। বিশ্বের ২৩০টি দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই তুলনামূলক রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৩০ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যানে বিশ্বে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে গণচীন। বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি রয়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার। গ্রামীণফোনের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা সাত কোটি ৬৪ লাখ ৬২ হাজার, রবির চার কোটি ৯০ লাখ চার হাজার, বাংলালিংকের তিন কোটি ৫২ লাখ ৩৯ হাজার এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টেলিটকের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ৪৮ লাখ ৬৮ হাজার।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা অন্য দেশের তুলনায় আনুপাতিক হারে বেশি হলেও সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের দেশের মোবাইল কোম্পানি উচ্চহারে কলরেট আদায় করলেও সেবার মান ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার সাথে সরকার এই খাতে উচ্চমাত্রার করারোপ করায় তা এখন রীতিমতো ব্যয়বহুল খাতে পরিণত হতে যাচ্ছে। মোবাইল সেবায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সরকারি কর এখন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। দেখা গেছে, আফগানিস্তানে মোবাইল সেবা গ্রাহকের ওপর কর ১২ শতাংশ। ভারতে ১৫, পাকিস্তানে ১৭ ও শ্রীলঙ্কায় ২৩ শতাংশ। আমাদের দেশে নতুন বাজেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে করভার ৩৩ শতাংশ করা হয়েছে। মোবাইল সেবায় নতুন করে ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় সাধারণ মানুষ ব্যবহার কমিয়ে খরচ কমাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হবে না বলেও মনে করা হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে মোবাইল সিম বা রিমকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সেবার বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে মোবাইলে কথা বলা ও খুদেবার্তা পাঠানোয় মোট করভার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। ইন্টারেনেটে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ফলে এখন থেকে ১০০ টাকা রিচার্জে কথা বলা ও খুদেবার্তায় সরকারের ঘরে যাবে ২৫ টাকার মতো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার কর বাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি লাভ করার চিন্তা করলেও এতে খুব একটা সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ, কলরেট কম ও সহনীয় পর্যায়ে থাকলে গ্রাহকরা বাড়তি ব্যয় করত। এতে পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব বাড়ত। প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন করে করারোপের ফলে এসএমএস পাঠানো এবং ডাটা ব্যবহারের খরচ বেড়েছে। বাজেটে ঘোষণা আসার পর এনবিআর এসআরও জারি করায় সেদিন মধ্যরাত থেকেই বাড়তি হারে টাকা কাটা শুরু করেছে দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কেউ যদি ১০০ টাকার সেবা নেন তাহলে তিনি ৭৫ দশমিক ০৩ টাকার সেবা পাবেন। বাকি ২৪ দশমিক ৯৭ টাকা যাবে সরকারের পকেটে।
নতুন বাজেটে মোবাইল ফোনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত করপ্রস্তাব কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সহজলভ্য ও সর্বজনীন হওয়া উচিত। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে যেন উল্টোপথেই হাঁটছে। দেশে করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন একমাত্র মাধ্যম ছিল। সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অল্প দূরত্বেও কথা বলার জন্য মোবাইল ব্যবহার করতে হয়। এ সময় সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের দিকে লক্ষ রেখে মোবাইল ট্যারিফ আরো কমাই ছিল যুক্তিযুক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা প্রায় একমাস ধরে অনলাইনে রুটিন অনুযায়ী ক্লাস নিচ্ছেন। যথারীতি পরীক্ষাও চলছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। যেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত আছে। অসচ্ছল যেসব শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন নেই তাদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হয়েছে। পরে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা। কিন্তু মোবাইল ফোনকলে নতুন করে করারোপ করায় এসব শিক্ষামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন তারা। যা শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুয়েটেও অনলাইনে পরীক্ষামূলক ক্লাস শুরু হয়েছিল। পরে নানাবিধ জটিলতার কারণে তা আর অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। আবার রাজধানীর কিছু কিছু কোচিং সেন্টার কলেজ ভর্তিতে সহযোগিতার জন্য অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছে। মূলত করোনার নেতিবাচক প্রভাবে শিক্ষার্থী অনেক বেশি মোবাইল-নির্ভর হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যম ও ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাতারাও পড়েছেন বড় ধরনের বেকায়দায়। তারা অভিযোগ করছেন, ‘মোবাইলের খরচ বাঁচাতে ওয়াইফাই দিয়েই সব কাজ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সব সময় কারো পক্ষেই বাসায় থাকা সম্ভব হয় না। এগুলো তো বাইরে থাকলে মোবাইলেই দেখতে হয়। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে নতুন করে করারোপ করায় ট্যারিফ বেড়েছে। ফলে তারা নতুন জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে কলরেট, ইন্টারনেট খরচ ক্রমেই কমিয়ে আনা হচ্ছে। তারা বোঝেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা যত সহজ হবে ততই কর্মক্ষেত্রে সহজে জায়গা করে নেবে মেধাবী উদ্যোক্তারা, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু আমাদের দেশ উল্টো হাঁটছে। মূলত বাড়তি শুল্ক বসিয়ে উদ্যোক্তাদের বাধা দিয়ে, যারা ফ্রিল্যান্সিং করে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স আনে তাদের বিপদে ফেলে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে যখন যে সেক্টর এগিয়ে যেতে চায়, তার ওপরই চাপ দেয়া হয় এমন অভিযোগও করছেন তারা। তারা এ ক্ষেত্রে ই-কমার্সের উদাহরণ টানছেন। সারা বিশ্ব যেখানে অনলাইন কেনাকাটা সহজ করছে, সেখানে আমরা চাপ প্রয়োগ করছি। যা সত্যিই আত্মঘাতী। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বহু গ্রাহক স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে বসে কাজ করছে। অন্যান্য দেশ গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন, দ্রুত গতির ইন্টারনেট সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাপ্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। সে সময়ে সরকার মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে যখন মোবাইল মাধ্যম হয়ে উঠেছে সব যোগাযোগের মূল চালিকা ও দেশ ডিজিটাল ইকোনমির দিকে এগিয়ে চলছে; ঠিক সে সময় এ ধরনের করের বোঝা কোনোভাবেই জাতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। আয় রোজগারহীন গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত এই করের বোঝা চাপানো কেউই যৌক্তিক মনে করছেন না।করারোপ রাষ্ট্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতা কাম্য নয়, বরং সরকারের দূরদর্শিতা কাম্য। কারণ করারোপের ক্ষেত্রে করদাতার সামর্থ্য ও জাতীয় স্বার্থ উভয়টিই বিবেচনায় আনা উচিত। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
smmjoy@gmail.com
ভাগ