মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

সুন্দর সাহা ॥ আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি। স্বাধীনতার ৪৯ তম বার্ষিকীতে জাতি মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। তবে, এবার ভয়াবহ করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সরকারি-বেসরকারিভাবে গৃহীত স্বাধীনতার সকল কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। মরণব্যধি করোনাভাইরাসে ছোবলে ইতিমধ্যে ৫ জনের প্রান কেড়ে নিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে সরকারি হিসাবে ৩৯ জন। যার কারেন, জাতীয় স্মৃতি সৌধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোসহ রাজধানী, বিভাগ, জেলা ও উপজেলাসহ সকল পর্যায়ে জাতীয় কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিও এবার স্বাধীনতা দিবসের সকল কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেছে।
এদেশের মানুষের স্বাধীনতার আন্দোলন দমন করতে একাত্তরের ২৫ মার্চ দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ঢাকাসহ গোটা দেশে মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ওইদিন সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার নির্দেশে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র ছাত্র, জনতা, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যদের ওপর দখলদার বাহিনী নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত মানুষের ওপর। গুলির গগনবিদারী শব্দ ও চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা। এই রাতে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘকালের পরাধীনতার শৃঙ্খল, শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-অনাচারের নাগপাশ ছিন্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ জনপদে জ্বলে উঠে স্বাধীনতার অনির্বাণ শিখা। একাত্তরের মার্চ মাস শুরু হতেই স্বাধীনতাকামী জাতি শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম। একাত্তরের মার্চে দেশজুড়ে বিােভ, উত্তাল রাজপথ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সংলাপ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে একেকটি দিন। মুক্তিকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। সারাদেশে বেজে ওঠে রণদামামা। সবাই চাচ্ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চে অপারেশন সার্চলাইটে পৈশাচিক গণহত্যার পর ওই দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এ ধরনের এক শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে চট্টগ্রামের ষোলো শহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলে বাংলাদেশী সৈনিকদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন তৎ্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান। এরপর তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের এই দিন থেকে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল মহান বিজয়। সে বিজয়ে বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এ স্বাধীনতা। তবে সময়ের আবর্তে ৪৯ বছর পেরিয়ে এবার এমন একসময় দিবসটি পালন করা হচ্ছে, যখন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল ভিত্তিগুলো অস্তিত্ব হারাচ্ছে। গণতন্ত্র মৃত প্রায়। মতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অব্যাহত রেখেছে রাজনৈতিক প্রহসন। ভোটের নামে রাতেই বাক্স বোঝাই করা হচ্ছে ব্যালটে। ভোটের আগেই নির্ধারিত হচ্ছে ফলাফল। কুক্ষিগত করার সব মিশন সফল হয়েছে গায়েবি মামলায়। জননিরাপত্তায় ক্ষমতা প্রয়োগের নামে পুলিশ প্রশাসন নির্বিচারে হত্যা, গুম, অপহরণ, নির্যাতনে অভিযুক্ত হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থা আস্থা হারাচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের সব শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হচ্ছে চরম নির্যাতন। আধিপত্য বিস্তারের ল্েয দেশের আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে। সত্য বলার ‘অপরাধে’ টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে গণমাধ্যমের। আইন উপো করে অমানবিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে সাংবাদিকদের। মানবাধিকার হারাচ্ছে অস্তিত্ব। সারাদেশে চলছে লাগামহীন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সব মিলিয়ে এক সীমাহীন নৈরাজ্য এবং চরম অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণীপেশার মানুষকে। অথচ লাখ লাখ শহীদ আর লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের সার্বিক মুক্তি। ৪৯ বছর আগের এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় জাতিকে এনে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের একমাত্র ঠিকানা। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মার্চ মাসের অসহযোগ আন্দোলন ও ২৫ মার্চ ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যার পর ২৬ মার্চের সূর্যোদয় বয়ে এনেছিল বহু প্রতীতি স্বাধীনতা। এই দিনই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহিমান্বিত বিজয়। মহান স্বাধীনতার এই দিনে আমরা স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা নিগৃহীত দুই লাখ মা-বোনকে। একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে দেশ গত ৪৯ বছরে যতটুকু এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হয়েছিল তা সম্ভব হয়নি জাতীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে। স্বাধীনতার সুফল দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার এখনো পূরণ হয়নি।

ভাগ