মনিরামপুরে আমন সংগ্রহে চাষিদের পরিবর্তে লাভবান মধ্যস্বত্বভোগীরা

স্টাফ রিপোর্টার, মনিরামপুর (যশোর) ॥ যশোরের মনিরামপুরে ন্যায্যমূল্যে আমন সংগ্রহে চাষিদের পরিবর্তে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। আমনের মৌসুম বেশ আগেই শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে বোরো আবাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বর্তমানে চাষির ঘরে আমনধান নেই বললেই চলে। ফলে আমন সংগ্রহের তালিকাভূক্ত চাষিদের কাছ থেকে এলাকার মধ্যস্বত্বভোগীরা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করে বাজার থেকে কম মূল্যে ধান ক্রয়ের পর সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আর এ কাজে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে এলাকার বেশ কয়েকজন উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের বিরুদ্ধে।
উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত অফিসার (ওসিএলএসডি) মনিরুজ্জামান মুন্না জানান, মনিরামপুরে এবার আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৫৩১ মেট্রিকটন। কৃষি অফিসের প্রস্তুতকৃত ৪৫ হাজার চাষির মধ্যে লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছে দুই হাজার ১৫০ জনকে। এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে প্রতি চাষির কাছ থেকে এক থেকে দেড় মেট্রিকটন ধান সংগ্রহের উদ্বোধন করা হয় ১২ ডিসেম্বর। নিয়ম রয়েছে কার্ডধারী যেসব চাষি চলতি মৌসুমে আমন চাষ করেছেন শুধুমাত্র সেই সব চাষির নাম ক্রয় তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্তরা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে গোজামিল দিয়ে তড়িঘড়ি করে তালিকা প্রস্তুত করায় ভুয়া নামের ছড়াছড়ি রয়েছে। তার ওপর প্রকৃত চাষির নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অন্যদিকে আমন মৌসুম বেশ আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ চাষির ঘরে ধান নেই। তার ওপর আমন চাষির তালিকায় রয়েছে ভুয়া নামের ছড়াছড়ি। আর এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাঠে নেমে পড়েছেন চাষিদের কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, ইতিমধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী একটি সিন্ডিকেট এলাকার অধিকাংশ উপ-সহকারী কৃষি অফিসারকে ব্যবহার করে চাষিদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষিকার্ড সংগ্রহের পর নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর আদায় করছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার কোড়ামারা, পাঁচবাড়িয়া, পাঁচকাটিয়া, চান্দুয়া, বাহাদুরপুর, মাহমুদকাটি, রঘুনাথপুর, কদমবাড়িয়া, শেখপাড়া রোহিতা, সরণপুর, শ্যামকুড়, লাউড়ি, হেলাঞ্চী, কৃঞ্চবাটি, ভোজগাতী, জয়পুর, ঢাকুরিয়া, জুড়ানপুর, গাংড়াসহ অধিকাংশ গ্রামে তালিকাভূক্ত আমন চাষির কাছ থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কৃষি কার্ড সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোড়ামারা গ্রামের তালিকাভূক্ত চাষি সুনিল সরকার, নিরোধ সরকার, সুভাষ সরকার, অরুণ বিশ্বাস, সুকৃতি বিশ্বাস, দেবপ্রসাদ সরকারের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের সাধারণ উপকারভোগী (সিআইজি) দলের দলনেত্রী রমা সরকার এবং শংকর সরকার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া নির্ধারিত ফরমে ওই সব চাষির স্বাক্ষর আদায় করা হয়েছে। সুনিল সরকার অথবা নিরোধ সরকারই নন, এমন অভিযোগ করেন ওই গ্রামের নারায়ন সরকার, অভিমান্য সরকার, অনিমেষ সরকার, দুলাল সরকার, প্রভাষ সরকার, শংকর সরকার, সুফল সরকার, অমর সরকার, তারাপদ বিশ্বাসসহ অর্ধশতাধিক চাষি। সিআইজির দলনেত্রী রমা সরকার এসব চাষির কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ এবং ফরমে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি অফিসার ভবেন্দ্র নাথ মল্লিকের নির্দেশনা মোতাবেক তিনি কার্ড সংগ্রহের পর তার (ভবেন্দ্র নাথ) কাছে জমা দিয়েছেন। আর ভবেন্দ্র নাথ মল্লিক ওই কার্ড তুলে দিয়েছেন মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে। পরবর্তীতে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাজার থেকে কম মূল্যে (ছয়’শ টাকা মণ প্রতি) ধান ক্রয়ের পর ওই সব কৃষিকার্ড এবং স্বাক্ষর করা ফরম নিয়ে সরকারি খদ্যগুদামে এক হাজার চল্লিশ টাকা মণপ্রতি ধান সরবরাহ করছেন। তবে ভবেন্দ্র নাথ মল্লিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কোন চাষির কাছ থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করেননি। একই অভিযোগ উঠেছে হরিদাসকাটির উপ-সহকারী কৃষি অফিসার দেবব্রত বিশ্বাস, খেদাপাড়ার উপ-সহকারী কৃষি অফিসার বিল্লাল হোসেন ও তুহিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। তবে তারাও এ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিসার হীরক কুমার সরকার এবং আমন ক্রয় কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান উল্লাহ শরিফী জানান, অভিযোগের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

ভাগ