ভারত থেকে আমদানি করা ২০০ কেজি ‘ভায়াগ্রা পাউডারের’ চালান আটক

প্রথমবারের মতো অবৈধভাবে ভারত থেকে আমদানি করা ২০০ কেজি ‘ভায়াগ্রা পাউডারের’ চালানসহ ফ্লেভার, সিরিঞ্জ, ইমিটেশন জুয়েলারি, শাড়ি, ওড়না, কামিজ, সালোয়ার, থ্রি-পিস ও শার্ট-প্যান্ট আটক করেছেন বেনাপোল শুল্ক কর্মকর্তারা। এসব পণ্যের বাজারমূল্য কোটি টাকার অধিক। বিশ্ব কাস্টমস সংস্থা ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) ১৮২ সদস্য দেশকে মাদক, বিস্ফোরক ও এ ধরনের ক্ষতিকর পণ্য চোরাচালানের বিষয়ে দীর্ঘদিন সর্তকবার্তা দিলেও বাংলাদেশে প্রথম ‘ভায়াগ্রা পাউডার’ পাওয়া গেল। এ ঘটনায় বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আহাদ এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য বেনাপোল কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে বেনাপোল কাস্টমস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী। তিনি বলেন, ঢাকার ১৫৩/৩ কাঁঠালবাগান (কলাবাগান) এলাকার রেডগ্রিন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ৫০০ কেজি ফ্লেভার আমদানির জন্য চলতি বছরের ২ এপ্রিল শাহাজালাল ইসলামী ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় একটি ঋণপত্র খোলেন (এলসি নম্বর ২৯৬৬১৯০১০০৩৬)। পণ্য চালানটি ভারত থেকে ১০ এপ্রিল বেনাপোল বন্দরে আসে। যার মেনিফেস্ট নম্বর ১৩৬১৩-বিবি।

পণ্যচালানটি খালাস নিতে ১৩ এপ্রিল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আহাদ এন্টারপ্রাইজ বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-২৫৫৭৭। পণ্য চালানটি ধরা পড়ার কিছুদিন আগে অসাধু একটি চক্র আমদানিযোগ্য পণ্যের আড়ালে ভারত থেকে বেনাপোল বন্দরে ভায়াগ্রা নিয়ে যাবে মর্মে আমাদের কাছে গোপন সংবাদ আসে। সে আলোকে সন্দেহজনক পণ্য চালানটি নজরদারিতে রাখা হয়। এরপর কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের একটি দল দিয়ে চালানটির আমদানি দলিল ও কায়িক পরীক্ষায় ৫০০ কেজি ফ্লেভারের সঙ্গে ২০০ কেজি সাদা পাউডার, এক লাখ ৯৪ হাজার পিস সিরিঞ্জ, ১১০ কেজি ইমিটেশন জুয়েলারি, ৩০৩ পিস শাড়ি, ১৪ পিস ওড়না, ১০ পিস কামিজ, ৯ পিস সালোয়ার, ৩৮ পিস থ্রি-পিস, ১৯ পিস শার্ট ও ১২২ পিস প্যান্ট পাওয়া যায়। প্রাপ্ত পণ্য তালিকা পর্যালাচনা ও যাচাই করা হয়।
পরে ওই প্রতিবেদন নিয়ে কমিশনারের কক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পর্যালাচনা করা হয়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য তোলা হয় ফ্লেভার ও সাদা পাউডার জাতীয় পণ্যের প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা। অধিক সতর্কতার জন্য কাস্টমস হাউসের নিজস্ব অত্যাধুনিক ল্যাবে রমন স্পেক্টোমিটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষা শেষে ফ্লেভার সঠিক পাওয়া গেলেও ২০০ কেজি সাদা পাউডার পরীক্ষায় ভায়াগ্রার উপাদান আছে বলে সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক একাধিকবার পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেন। ডব্লিউসিও প্রদত্ত রমন স্পেক্টোমিটারের পরীক্ষায় জানা যায়, ভারত থেকে খাবারের ফ্লেভারের আড়ালে আমদানিকৃত জিনিস ভায়াগ্রা পাউডার। অত্যন্ত স্পর্শকাতর পণ্য বিবেচনায় অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে নমুনা খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) পাঠানো হয়। দীর্ঘ আড়াই মাস পর কুয়েট পরীক্ষা করে পণ্যটিকে সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রার মূল উপাদান) হিসেবে প্রতিবেদন দেয়। কুয়েটের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অপঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। মূলত বৈধ পণ্যের আড়ালে আমদানিযোগ্য পণ্য অপঘোষণা দিয়ে অপঘোষণার জরিমানা ও শুল্ককর পরিশোধের দোহাই দিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের বোকা বানিয়ে ভায়াগ্রা পাউডার পাচারের অপচেষ্টা করে। চালানটির আমদানিকারক ও খালাসের কাজে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আহাদ এন্টারপ্রাইজ এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
কাস্টমস কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী মানবসমাজের নীরব ঘাতক ভায়াগ্রা পণ্য উদঘাটনে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের বিরল প্রাপ্তি ও গৌরবের। একইভাবে এমন চোরাচালান প্রতিহতকরণ বেনাপোল স্থলবন্দর ও বেনাপোলবাসীর জন্য কৃতিত্বের। ডব্লিউসিও এ নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে জানানো হবে। ডব্লিউসিও সদস্য দেশসমূহকে এ পাচারের ধর ও কৌশল সম্পর্কে জানাবে। প্রয়োজনে অধিকতর তদন্ত করবে। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার দিপা রাণী হালদার বলেন, আমদানিকারক কোনো ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়। তবুও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ব্যতীত আমদানিনীতি আদেশ ২০১৫-২০১৮-এর শর্ত ভঙ্গ করে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভায়াগ্রা আমদানি করেছে। চালানটি আটক করা হয়েছে। বর্তমানে আমদানিকারক কেবল ৫০০ কেজি ফ্লেভার ব্যতীত অন্য পণ্য দাবি করছে না। ২৫ প্যাকেজ (৫০০ কেজি) ফ্লেভার ব্যতীত অন্যান্য পণ্যের বিষয়ে জানা নেই মর্মে পণ্যচালান খালাসের কাজে নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আহাদ এন্টারপ্রাইজ লিখিতভাবে জানিয়েছে। এরপর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আহাদ এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। জালিয়াতি ও অবৈধ পণ্য সুকৌশলে আমদানির অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাবার পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভাগ