ভারতে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ভারতের বাজারে প্রতি মাসেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি পণ্যটির দাম বাড়ানো কিংবা কমানো হয়। তবে কিছুদিন ধরে ভারতের বাজারে এলপিজির দাম টানা বাড়তির দিকে। এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ভর্তুকিযুক্ত ও ভর্তুকিবিহীন দুই ধরনের এলপিজি সিলিন্ডারের দামই বাড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর জ্বালানি পণ্যের দাম তুলনামূলক কমে এলেও ভারতে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে এর প্রভাব পড়েনি। খবর বিজনেস লাইন।
ভারতে দুই ধরনের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। ভর্তুকিযুক্ত ও ভর্তুকিবিহীন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় বছরজুড়ে প্রতিটি পরিবার ১৪ দশমিক ২ কেজির ১২টি এলপিজি সিলিন্ডার তুলনামূলক কম (ভর্তুকিযুক্ত) দামে কিনতে পারেন। এর বেশি সিলিন্ডারের প্রয়োজন হলে তুলনামূলক বেশি দামে ভর্তুকিবিহীন এলপিজি সিলিন্ডার কেনার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ভারতে এলপিজি সিলিন্ডারের দুই ধরনের দাম দেখা যায়।
সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভর্তুকিবিহীন একেকটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৫৮ দশমিক ৫০ রুপি (ভারতীয় মুদ্রা)। এক মাস আগে ভর্তুকিবিহীন একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৭১৪ রুপি। সেই হিসাবে দিল্লিতে ভর্তুকিবিহীন একেকটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ১৪৪ দশমিক ৫০ রুপি। অন্যদিকে দিল্লির বাজারে ভর্তুকিযুক্ত একেকটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ২৯১ দশমিক ৪৮ রুপি। আগের মাসে ভর্তুকিবিহীন এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১৫৩ দশমিক ৮৬ রুপি।
দিল্লির মতো ভারতের অন্যান্য বড় শহরেও এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে। কলকাতায় একেকটি সিলিন্ডারের দাম ১৪৯ রুপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯৬ রুপিতে। বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে একেকটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৮২৯ দশমিক ৫০ রুপিতে। দাম বেড়েছে সিলিন্ডারপ্রতি ১৪৫ রুপি। একইভাবে চেন্নাইয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম ১৪৭ রুপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮১ রুপিতে। ২০১৪ সালের জানুয়ারির পর এবারই ভারতের বিভিন্ন শহরে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামের ভিত্তিতে ভারতে এলপিজির ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস (আইপিপি) নির্ধারণ করা হয়। এ আলোকেই প্রতি মাসে একবার জ্বালানি পণ্যটির দাম পুনর্মূল্যায়ন করে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। আর সৌদি আরামকোর এলপিজি বেঞ্চমার্ক দামের ওপর ভিত্তি করে ভারতে জ্বালানি পণ্যটির আইপিপি নির্ধারিত হয়। ফলে ভারতের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে ওঠা-নামার পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সৌদি আরবের বৃহত্তম জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকো।
গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৬৮ ডলারে উঠেছিল। বছরের প্রথম মাসে গড় দাম আরো বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৮ ডলার ৯১ সেন্টে দাঁড়ায়। এর জের ধরে সৌদি আরামকো জানুয়ারিতে প্রতি টন প্রোপেনের দাম ৫৬৫ ডলার নির্ধারণ করে দেয়। ডিসেম্বরে পণ্যটির দাম টনপ্রতি ৪৪০ ডলার ছিল। প্রাকৃতিক গ্যাস পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ এ উপাদানটির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এশিয়ার বাজারে এলপিজির দামও বাড়তে শুরু করে।
তবে পরিস্থিতি বদলেছে। চীনসহ বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় চাহিদা কমার আশঙ্কা থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে এসেছে। সর্বশেষ সপ্তাহে জ্বালানি পণ্যটির গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৫৭ ডলার ৩২ সেন্টে। এর জের ধরে সৌদি আরামকো প্রতি টন প্রোপেনের দাম আগের তুলনায় কমিয়ে ৫০৫ ডলার পুনর্নির্ধারণ করেছে। এরপরও ভারতের বাজারে এলপিজির দাম কমেনি, উল্টো বাড়ানো হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের অর্থনীতি আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এখন নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি শ্লথ হয়ে এলে ভারতের ওপর চাপ আরো বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের সুবিধার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারে ভর্তুকি বাড়ানো ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এতে দেশটির অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

ভাগ