ভাইরাসে বিপর্যস্ত শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী

ড. আবদুল লতিফ মাসুম
সর্বগ্রাসী ভাইরাসে বিপর্যস্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এখন ভাইরাসের কারণে অবশিষ্ট অংশটুকু প্রান্তিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। প্রকৃত শিক্ষা তো আমাদের নেই। আছে যা তা কাঠামো। এই কাঠামোর দুটো দিক। একটি হলো ঘরবাড়ি দালানকোঠা। স্বাধীনতার বিগত ৫০ বছরে এই কাঠামোর উন্নতি হয়নি, এটা বললে অসত্য বলা হবে। অনেক জায়গায় গ্রামগঞ্জে চোখ ধাঁধানো অবকাঠামো আছে। বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে রাজাবাড়ির মতো প্রাসাদোপম বিল্ডিং আছে। যদি কাঠামো অথবা অবকাঠামো শিক্ষার মান নির্ণয়ক হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ‘উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছি’। আর যদি লেখাপড়ার অর্থ হয় জ্ঞান-গরিমা তাহলে তা কী অবস্থায় আছে, সচেতন মানুষমাত্রই জানেন। শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি উপরি কাঠামো হলো সার্টিফিকেট বা সনদভিত্তিক অর্জন।
বিজ্ঞজনরা বলছেন শিক্ষাব্যবস্থা সার্টিফিকেটনির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি নিবন্ধনে শুধুই সার্টিফিকেট বিতরণ করছে। রাজধানীতে, রাস্তাঘাটে এমনকি গ্রামগঞ্জে এরকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড আপনার চোখে পড়বে। সে আরেক গল্প। আজকে আমরা সর্বনাশা করোনাভাইরাসকবলিত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্দশা নিয়ে কথা বলব। আগেই বলেছি, প্রকৃত শিক্ষা অনুপস্থিত। উপস্থিত অবকাঠামো এই দুই মাসে বিপর্যস্ত হয়েছে এটা বলার অবকাশ নেই। বড় জোর এসব অবকাঠামো অবহেলিত হয়েছে মাত্র। বিপর্যস্ত যা হয়েছে তা সেই সার্টিফিকেটের উপরি কাঠামোর ক্ষেত্রে। একটা সার্টিফিকেট একজন বেকার যুবকের চাকরির সুযোগ করে দিতে পারে। কম্পিউটারের সহজলভ্য সার্টিফিকেট কর্মসংস্থানের কারণ হতে পারে। যুব উন্নয়নের মাছের চাষ, গাছের চাষ ও পশুপরিচর্যার সার্টিফিকেট আওয়ামী যুবকের লোনপ্রাপ্তির শর্ত হতে পারে। কিন্তু এখন তা স্থগিত। ঢালাওভাবে সার্টিফিকেট সর্বস্বতার কথা বললে থুতু নিজের গায়ে আসবে। তার কারণ আমি একটি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়িয়ে আসছি। বাস্তবতা এই যে, শিক্ষাব্যবস্থার যৎ সামান্য যদি এখনো বর্তমান থাকে তা হচ্ছে পাবলিক ইউনিভার্সিটি বা সরকারি বিশ^বিদ্যালয়। লকডাউনের আগে সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো যে খুব ভালো ছিল, তা নয়। কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ে নানা অভিযোগে ছাত্র আন্দোলন চলছিল। সরকারি লীগের সন্ত্রাসে সন্ত্রস্ত ছিল আরো কিছু বিশ^বিদ্যালয়। এসব বিশ^বিদ্যালয় চলছিল একরকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। হুইল চেয়ারে রোগী নেয়ার মতো করে ঠেলে ঠেলে। গত ২৬ মার্চ থেকে তাও চলছে না। এমনিতেই এসব বিশ^বিদ্যালয়ে সেশনজট ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে ২০১৯ সালের পরীক্ষা নিচ্ছিলাম ২০২০ সালে। সরকারি তুঘলকি কাণ্ডে রাজধানীর কলেজগুলো এবং জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে আরো বেশি সেশনজট চলছিল। এখন সর্বগ্রাসী, সর্বনাশা করোনাভাইরাসের হৃদয়হীন আবর্তে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উচ্চশিক্ষা। তবে বাণিজ্যিক বদনামের শিকার বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো তথাকথিত অনলাইনে তাদের ক্লাস ও কার্যক্রম চালু করেছে। এই অনলাইনের ক্লাস নিয়েও কথা উঠেছে। সুবিধাভোগী শ্রেণীর এসব প্রতিষ্ঠানে সবাই সুবিধা পাচ্ছেনÑ এরকম নয়। সব ছাত্র অনলাইনে ক্লাস করতে পারছে কি? কোনো কোনো বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তির বিজ্ঞাপন দেখলাম টিভি চ্যানেলে। যখন সব বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ, তখন অনলাইন বা ভর্তির যৌক্তিকতা আছে কি? এক দেশে দুই আইন কী করে চলে? যদি সক্ষমতার প্রশ্ন আসে, তাহলে পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলো এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে কোনো উদযোগ নেই। ইউজিসির কোনো সাড়াশব্দ নেই। প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে লকডাউন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী সময়টা আরেকটু কমিয়ে দিয়েছিলেনÑ জুন পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে লকডাউনের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই উদ্বিগ্ন। প্রতিদিন ছাত্ররা ফোন করছে, কবে খুলবে তাদের বিশ^বিদ্যালয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর যেমন কারো হাত নেই, তেমনি এই ভাইরাস মহামারীর ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবুও এই অনুভূতি প্রবল ‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে’। আবেদন একটিই ‘শুভশ্য শীঘ্রম’। যত শিগগির সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হোক।
বাংলাদেশে শিক্ষা স্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিন্নতা নিয়ে অনেক কথাবার্তা। এই স্তর ও ভিন্নতা ব্যতিরেকে এই করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবাই। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো- সরকারি অথবা বেসরকারি সবই বন্ধ। তবে ব্যতিক্রম আছে, ওই বিশ^বিদ্যালয়ের মতো। এখানেও সেই তথাকথিত অভিজাত স্কুল কলেজগুলোতে অনলাইনে ক্লাস চলছে। একজন বললেন, ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা বেশ ভালো। সেখানে বড় ভালো স্কুলগুলোতে বড়লোকের ছেলেমেয়েরা অনেকটা সফলভাবেই অনলাইনে ক্লাস করছে। কারণ ঘরে ও প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উৎকর্ষ। এতে করে সামাজিক বৈষম্য বা শ্রেণীগত বৈষম্য স্পষ্ট হচ্ছে না ? আবারো সেই একই কথা এক দেশে দুই আইন ? কথায় বলে, ‘এক নায়ে দুই গীত, শুনতে শোনায় বিপরীত’। দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্কুল থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত সবমিলে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় দিন গুনছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের নির্মম হানায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো সেক্টরে তছনছ অবস্থা। স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত সব শ্রেণী বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ। স্কুল পর্যায়ের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি। চার দফায় সরকারি নির্দেশে ৩০ মে পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিকে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে বিকল্প পন্থায় সংসদ টিভিতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শ্রেণীভেদে নিয়মিত ক্লাস চালু রাখা হয়েছে। তবে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত নয়। তাই এসব ক্লাস বাস্তবে কোনো ফল দেয়নি। এছাড়া এভাবে ক্লাস করতে অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আগ্রহী নন। সংসদ টিভির পরিবেশনায়ও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এসএসসির পরীক্ষা নেয়া হয়েছে বেশ আগে। এখন পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছেন, বিশেষ ব্যবস্থাধীনে শিগগিরই ফলাফল বের হবে। ইতোমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষাসচিব জানিয়েছেন, এসএসসির ফল ঘোষণার পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ১৫ দিনের মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা নেয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান আগে হরতাল-অবরোধসহ নানা কারণে দিনের পর দিন বন্ধ থেকেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু বন্ধ থাকেনি তাদের পড়াশোনা। তখন তারা প্রাইভেট ও কোচিং এ পড়ত। এখনকার এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কে ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। কিছু ক্ষেত্রে অনলাইনে পড়শোনার কথা আগেই বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ লেখাপড়া থেকে দূরে, বহু দূরে অবস্থান করছে। স্বাভাবিক সময়ে আত্মীয়স্বজন যেভাবে পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারত, তারও উপায় নেই। যে স্বজনের আশা-যাওয়া ছিল আনন্দের, এখন তা হতে পারে রীতিমতো আতঙ্কের। করোনাভাইরাসের এই দীর্ঘ সময়টি ছিল, যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য অফুরন্ত সময় ও সুযোগ। সতর্ক অভিভাবকরা কেউ কেউ হয়তো সময়কে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শিশুরা অমনোযোগী। কিশোররা অস্থির। যুবকেরা নেটে ব্যতিব্যস্ত। সুতরাং ‘নিষ্ফলা কৃষকের চাষ’। সবাই অপেক্ষায় আছে কবে খুলবে স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়। প্রাণচাঞ্চলে ভরে উঠবে দেহমন। শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় অংশজুড়ে আছে মাদরাসা শিক্ষা। এর মধ্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষা নিজস্ব গুণে ও মানে স্বতন্ত্র। একই পত্রিকার অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে দেশের কওমি মাদরাসার ২২ লাখ শিক্ষার্থী। ঈদের ছুটির শেষে সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণ করে নতুন বছরের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করতে না পারলে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবাই জানেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষাধারা ও পদ্ধতি প্রচলিত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একেবারেই ভিন্ন। শতভাগ আবাশিক হওয়ার কারণে ভাইরাস পরিস্থিতিতে তারা সম্পূর্ণ কোয়ারেন্টিন মেনে নিতে সক্ষম। কেউ তাদের আদেশ ছাড়া যেতে আসতে পারে না। লকডাউনের সময় এই স্বাতন্ত্র্যের যুক্তি তারা দিয়েছিল। সরকার তা মানেনি। এখন তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে আগ্রহী। সংবাদপত্রে প্রদত্ত বিবৃতিতে ৭২ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ঈদের পরপরই খুলে দেয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার এই সামগ্রিক সঙ্কটে সবচেয়ে শঙ্কাগ্রস্ত আছেন দেশের বেসরকারি পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। করোনার এই সময়ে দিন যাচ্ছে তাদের সীমাহীন কষ্টে। শিক্ষক মর্যাদার কারণে অনেকে মুখ ফুটে নিজের দুরবস্থার কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বেতনভাতা দিতে পারছেন না অথবা দিচ্ছেন না। অনেকে অর্ধেক বেতনে অথবা বিলম্বিত বেতনে কাজ করছেন। করোনার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমস্যায় রয়েছে। আবার কোথাও মালিকপক্ষের মানসিকতার কারণে অসুবিধায় পড়েছেন শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। করোনা দুর্যোগকালীন বেতনের বিষয়টিকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে মানবিকভাবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক সংগঠনগুলো। এদের সাথে সাথে বেশ কিছু শিক্ষার্থী যারা আমাদের কাছে ‘হাউজ টিউটর’ বা গৃহশিক্ষক বলে পরিচিত তারাও তাদের সুযোগ হারিয়েছেন। এ ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অবসরভাতা না পেয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছেন। এরা দ্রুততম সময়ে অবসরভাতা দাবি করেছেন। বাংলাদেশ তথা বিশে^ এই করোনাভাইরাসের অভিজ্ঞতা সভ্যতার ইতিহাসে বিরল। প্রতিবারেই মানুষ তার স্বাভাবিক সংগ্রামশীল বৈশিষ্ট্য দিয়ে এই বিরূপতার মোকাবেলা করেছে। সুতরাং ‘উত্তেজনার মধ্যে ধৈর্য, ভয়ের মধ্যে সাহস, বিপর্যয়ের মধ্যে বিজ্ঞতা’ই আজকের সময় ও সঙ্কটের দাবি।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com
ভাগ