বেতন স্কেলের গ্রেড নির্ধারণে গ্রাম পুলিশের আপিল শুনানি ৮ মার্চ

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ মহল্লাদারদের জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেড এবং দফাদারদের ১৯তম গ্রেডে নির্ধারণ করে চাকরি জাতীয়করণ করতে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। পরবর্তীতে ওই রায় স্থগিত করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ওই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ বাহিনীর আপিল আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বারজজ আদালত মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়ার আর্জি জানানোর পর সেটি গ্রহণ করে বুধবার (২ ফেব্রুয়ারি) শুনানির এ দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগের চেম্বারজজ আদালত।বিবাদী পক্ষের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবং মধু মালতি চৌধুরীর মাধ্যমে আদালতে ওই আবেদন দাখিল করা হয়েছিল। গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের রিট আবেদনের পক্ষে এদিন শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমাযয়ুন কবির পল্লব।
ব্যারিস্টার পল্লব জানান, আপিল বিভাগে গ্রাম পুলিশের চলমান আপিল মামলাটি পরিচালনার জন্য রিট আবেদনকারী-বিবাদী এবং গ্রাম পুলিশ সদস্যদের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি মুনসুরুল হক চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে মহল্লাদারদের জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেড এবং দফাদারদের ১৯তম গ্রেডে নির্ধারণ করে সারাদেশে দায়িত্বরত ৪৭ হাজার গ্রাম পুলিশের চাকরি জাতীয়করণ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি ওই রায় স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে, হাইকোর্টর নির্দেশনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের অনুমতি চেয়ে করা আবেদন (লিভ টু আপিল) শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন আপিল বিভাগ।
পাশাপাশি আট সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্যও পক্ষগণকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে শুনানির জন্য ১৩ জুলাই দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আবেদনের বিষয়ে শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে ভার্চুয়াল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে এদিন গ্রাম পুলিশের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু। তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার কাওসার আহমেদ। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস। এরপর চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ তাদের সারসংক্ষেপ পেপারবুক আকারে আদালতে জমা দেন। ২৭ জানুয়ারি বিবাদীদের পক্ষে সারসংক্ষেপ, অতিরিক্ত পেপারবুক এবং মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দিন নির্ধারণের জন্যেও আবেদন করা হয়েছিল। এর আগে ২০১৯ সালে রায় প্রকাশের পরপরই রাষ্ট্রপক্ষ গ্রাম পুলিশের বিষয়ে দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। সেটির শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করলেন আপিল আদালত। মহল্লাদার এবং দফাদারদেরকে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশনা চেয়ে ২০১৭ সালে রিট করেন ৩৫৫ জন গ্রাম পুলিশ সদস্য। ওই রিটের শুনানি শেষে গ্রাম পুলিশের মধ্যে দফাদার পদধারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা ২০০৯ সালে ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেলের (বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫) ১৯তম গ্রেড এবং মহল্লাদারদের ২০তম গ্রেডে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
২০১৯ সালের ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্বরত ৩৫৫ জন গ্রাম পুলিশের করা এক রিট আবেদনে জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এমন রায় দেন আদালত। যার লিখিত কপি (পূর্ণাঙ্গ রায়) পরে ২০২০ সালের জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় বলে জানান রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব। ১৮ পৃষ্ঠার ওই পূর্ণাঙ্গ রায়ে গ্রাম পুলিশদের ২০১১ সালের ২ জুন থেকে সুবিধা দিতে বলা হয়েছে। সেই রায়ে ২০১১ সালের ২ জুনের পর স্থানীয় সরকার কর্মচারী চাকরি বিধিমালা-২০১১ বহির্ভূতভাবে গ্রাম পুলিশ পদে যেকোনো নিয়োগ অবৈধ ও বাতিল হবে বলে উল্লেখ করা হয়। হাইকোর্টের রায়টি বাস্তবায়ন করে ২০২০ সালের মার্চে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তবে সে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। সরকার ও গ্রাম পুলিশের আলোচনার প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ গ্রাম পুলিশ তথা দফাদার ও মহল্লাদারদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সমস্কেল প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই বছরের আগস্ট মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব কাগজাদি অর্থ বিভাগের সচিব বরাবর পাঠান। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগ সব মহল্লাদার ও দফাদারদেরকে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারী গণ্য করে তাদের নিয়োগ ও পদোন্নতির পদ্ধতি এবং বেতন-ভাতা জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯ এর আলোকে নির্ধারণ করে ২০১১ সালের ২ জুন একটি বিধিমালা জারি করে।
এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১১ জারির মধ্য দিয়ে সব মহল্লাদার ও দফাদাররা ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারী হিসেবে গণ্য হয়ে জাতীয় বেতন স্কেলের আওতাভুক্ত হন। কিন্তু ওই বিধিমালা কার্যকর না করে চার বছর পর গ্রাম বাহিনীর গঠন ও চাকরির শর্তাবলী বিষয়ে আরেকটি বিধিমালা জারি করা হয়। এই বিধিমালাটি কেন জারি করা হয়েছিল তা আদালতের কাছে বোধগম্য নয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালের বিধিমালা কার্যকর না করে ২০১৫ সালের নতুন এই বিধিমালা প্রণয়ন বেআইনি ও এখতিয়ারবহির্ভূত। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নিজের আইন নিজে মেনে চলবে। রাষ্ট্র কখনো নিজের প্রণীত আইন ও বিধি ভঙ্গ করবে না। আইন সবার জন্য সমান। রাষ্ট্র ও নাগরিকের কোনো পার্থক্য নেই। আইন মোতাবেক চলা যেমনি নাগরিকের জন্য কর্তব্য তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও তা সমভাবে প্রযোজ্য। এটাই আইনের শাসন। বর্তমান এই মামলায় গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের তাদের আইনত প্রাপ্যতা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত করে আসছে। রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। এই রিট মামলায় গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ন্যায্য অধিকার হলো বিধিমালা ২০১১ অনুযায়ী বেতন ভাতাদি পাওয়া। কিন্তু তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বেআইনিভাবে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত করা হয়েছে। এতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, তাদের সঙ্গে বিবাদীরা আইনানুযায়ী আচরণ করেননি। বিবাদীদের এমন কর্ম ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।

Lab Scan