বৃষ্টি ও জোয়ারে পর্যদুস্ত উপকূল

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ নিম্নচাপের প্রভাবে টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও পূর্ণিমার জোয়ারে উপকূল অঞ্চল প্লাবিত হয়ে ব্যাপক দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ভারতের দক্ষিণ মধ্যপ্রদেশ এলাকায় অবস্থান করছে। এটি স্থলভাগ দিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মোংলা আবহাওয়া অফিস ইনচার্জ অমরেশ চন্দ্র ঢালী।
তিনি বলেন, স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে মোংলা সমুদ্র বন্দরসহ সংলগ্ন সাগর ও সুন্দরবন উপকূলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫ নটিক্যাল মাইল। গত ২৪ ঘণ্টায় মোংলায় ৩০ মিলিমিটার, আর গতকাল সোমবার ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া আজ ও কাল বিবাজ করবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পূর্ণিমার গোন ও নিম্নচাপের প্রভাবে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ফুট উচ্চতার জ্বলোচ্ছাসে প্লাবিত হবে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা।
বাগেরহাট সংবাদদাতা জানান, টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও পূর্ণিমারে জোয়ারে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিমগ্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন উপজেলার অন্তত শতাধিক গ্রাম। বাদ যায়নি বাগেরহাট, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা পৌর শহরও। পানিমগ্ন হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। বাড়িতে রান্নাও বন্ধ রয়েছে কারও কারও। রোববার ভোর থেকে অবিরাম বৃষ্টি ও পূর্ণিমার জোয়ারে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে রোববার দুপুরের জোয়ার থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বনের করমজল, দুবলার চরসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত দুই-তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বন্য প্রাণির ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই পানিতে বনের কোন প্রাণির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির ।
অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। কোন কোন ট্রলার রোববার রাতেই লোকালয়ে ফিরে এসেছে। তবে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলেরা।
কচুয়া উপজেলার ভান্ডারখোলা, নরেন্দ্রপুর, প্রতাপপুর, সাংদিয়া, আফরাসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিত মোরেলগঞ্জের প্রধান বাজার, উপজেলা পরিষদের অফিস চত্বর, তেলিগাতি, হোগলাপাশা, ফুলহাতাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক মানুষ। এছাড়া রামপাল, মোংলা, শরণখোলা উপজেলার বেশকিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মালোপাড়া এলাকার মো. শহিদ বলেন, প্রতি পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার জোয়ারে স্লুইসগেট থেকে পানি এসে আমাদের এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। এসব স্লুইস গেট নষ্ট থাকায় প্রতিনিয়ত আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া যেসব স্লুইসগেট বন্ধ থাকা প্রয়োজন তা খোলা রাখা হয় জোর করে। এর ফলে আমাদের ছাগল, গরু, হাঁস মুরগি পানিতে ভেসে যায়।
সাগর উত্তাল থাকায় লোকালয়ে ফিরে আসা জেলে নয়ন বলেন, রোববার সকাল থেকেই সাগর উত্তাল ছিল। সময় বৃদ্ধির সাথে সাগর আরও বেশি উত্তাল হতে থাকে। আমরা রাতেই রওনা দিয়ে বাগেরহাট কেবি বাজার এলাকায় চলে আসি। তবে এ যাত্রায় কারও কোন ক্ষতি হয়নি।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, পূর্ণিমার জোয়ার ও টানা বৃষ্টিতে বেশকিছু এলাকায় পানি উঠেছে। তবে এতে কোন মানুষ বা প্রাণির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ এলাকায় খোঁজ খবর রাখছেন। কারও কোন বিপদ হলে বা খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খুলনা ব্যুরো জানিয়েছে, উপকূলীয় জেলা খুলনায় থেমে থেমে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে খুলনার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিম্নচাপের কারণে টানা বর্ষণে থমকে গেছে খুলনা মহানগরীসহ সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার জনজীবন। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পশুর, ভৈরব, কপোতাক্ষ, কাজিবাছা, শিবসা, আড়পাঙ্গাসিয়া, ঢাকীসহ সব নদ-নদীর পানি এক থেকে দেড় ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, জেলার কোথাও বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সোমবার সারাদিন খুলনার আকাশ মেঘে ঢেকে ছিল। সূর্যের দেখা প্রায় প্রায় মেলেনি। গুঁড়িগুঁড়ি ও বৃষ্টির কারণে সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়নি। রাস্তাঘাট ও দোকানপাটে মানুষের উপস্থিতি ছিল কম। দুদিনের অব্যাহত বৃষ্টির কারণে শ্রমজীবী মানুষ পড়েছে বিপাকে।
খুলনা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ বলেন, বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের কারণে খুলনা অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সোমবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের গদাইপুরে খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে।
সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জোয়ারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৭/২ নম্বর পোল্ডারের গদাইপুরের আবদুল মান্নান মাস্টারের ঘের সংলগ্ন এলাকায় ১০ হাত জায়গাজুড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, রোববার (১১ সেপ্টেম্বর) থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। সেইসঙ্গে নিম্নচাপের কারণে নদীতে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। দুপুরের জোয়ারে হঠাৎ করেই আবদুল মান্নান মাস্টারের ঘের সংলগ্ন এলাকায় ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে ২০০ বিঘা জমির ঘের তলিয়ে গেছে।
খাজরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ ডালিম জানান, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যে ভাঙনকবলিত বাঁধ সংস্কার করতে না পারলে খাজরাসহ পাশের কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হবে।
ভাঙনকবলিত বাঁধ মেরামতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের।

 

Lab Scan