বিদ্যুৎব্যয় নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেই, এক যুগে ভর্তুকি ত্রিশগুণ

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বছর-বছর বেড়ে চলেছে এই খাতের ব্যয়ও। আর এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে গত একযুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারির ভর্তুকি বেড়েছে তিন হাজার গুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভর্তুকির হার কমিয়ে আনলে এই অর্থ অন্যখাতে বিনিয়োগ করা যেতো। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, শুধু ভর্তুকিই নয়, উৎপাদন খরচ বাড়ানোর অজুহাত দিয়ে বছর বছর খুচরা মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। ফলে একদিকে বর্ধিত মূল্যের কারণে গ্রাহকের ওপর চাপে বেড়েছে, অন্যদিকে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় চাপও বেড়েছে সরকারের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খরচ না কমালে কিংবা স্বল্পমূল্যে জ্বালানির ব্যবস্থা না হলে ভর্তুকি বাড়তেই থাকবে। কমাতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে গত ১২ বছরে ৩০গুণ ভর্তুকি বেড়েছে। এরমধ্যে ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩০০ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছর ভর্তুকির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অঙ্ক ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, ভর্তুকি বাড়ার হার ত্রিশগুণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে একটি ভর্তুকি ধরা থাকে। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, এই ভর্তুকির চেয়েও উৎপাদনে আরও বেশি ব্যয় হয়। তখন তা সমন্বয় করে অর্থ বিভাগ। এবারও বাজেটে উৎপাদন ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বছর ভিত্তিক ভর্তুকির হিসাব বলছে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ছিল ৬০০ কোটি, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে এক হাজার ৭ কোটি, ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৯৯৪ কোটি, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে তা তিনগুণ বেড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে আবার একটু কমে ৪ হাজার ৪৮৬ কোটি, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে আবার তা বেড়ে ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এরপর ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে তা ৮ হাজার ৯৭৮ কোটি, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে আবার কমে ৪ হাজার ৩৬৫ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমে ৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা, এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় হয় সাত হাজার ৯৭০ কোটি। সব মিলিয়ে ১২টি অর্থবছরে মোট ৫৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
উৎপাদন চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, গত নয় বছর ধরে চেষ্টার পরও কোনও কয়লাচালিত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসেনি। যদিও চলতি বছরের শেষনাগাদ পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রর উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। এই নয় বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তে গিয়ে শুধু তরল জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।এখন ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রর ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ পড়ছে ১৩ টাকা ৬২ পয়সা। অন্যদিকে ডিজেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ পড়ছে ২৭ টাকা ২১ পয়সা। দেশে এখন তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রর পরিমাণ ৬ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ ৩৭ দশমিক ২২ ভাগ। পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানে বলা হয়েছে, তরল জ্বালানিতে সর্বোচ্চ ১০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। একযুগ ধরেই মিশ্র জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দিয়ে বাড়ানো হয়েছে তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি, বিদ্যুৎ খাতের অযৌক্তিক ব্যয় চিহ্নিত করা দরকার। সেটি চিহ্নিত করে ব্যয় কমানোও জরুরি। উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালনে এই ধরনের ব্যয় বাড়ানোর বহু উদাহরণ আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে বিদ্যুৎব্যয় সাশ্রয় করা যায়, সেজন্য আমরা এরইমধ্যে সরকারকে একটি পরিকল্পনাও দিয়েছি। সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য কমাতে চায় না। যদি চাইতো, তাহলে সরকারের পরিকল্পনাগুলোও সেভাবে তৈরি করা হতো।’ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাঝখানে কিছুদিন তেলের মূল্য কমে যাওয়ায় ভর্তুকিও কিছুটা কমেছিল। কিন্তু আবার তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়া ভর্তুকিও বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে আছে, এতেও ভর্তুকি বাড়বে। তেল দিয়ে যদি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চলতে থাকে তাহলে ভর্তুকিও বাড়বে।’ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আরও একটি বিষয় হলো—এলএনজি (লিকুফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস)। এলএনজি আমদানি করতেই হবে। তেলের চেয়ে এলএনজির মূল্য কম। এখন যদি দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক (ডুয়েল ফুয়েল) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এলএনজিতে কনভার্ট করা যায়, তাহলে খরচ অনেক কমে যাবে।’ তবে দেশীয় গ্যাস পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভাগ