বিচারের বাণীও যেখানে কাঁদে না

0

জসিম উদ্দিন॥ ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর লোকের কাছে রাজধানী ঢাকা শুধুই চাঁদাবাজি দখলদারি ও মাদক ব্যবসার জায়গা। এ শহরের ফুটপাথ মার্কেট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে এক বিশাল কালো অর্থনীতির স্রোত বহমান। তার সাথে রয়েছে ক্লাবকেন্দ্রিক জুয়া ও নানা অসামাজিক কার্যক্রমের এক রমরমা ব্যবসা। পুরো শহরকেই তারা ভাগ করে নিয়েছে। অন্তরালের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে সরকার এক কৌত‚হলোদ্দীপক অভিযান পরিচালনা করে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেশ কয়েকজন সম্রাটকে তখন ধরা হয়। শহরের অন্ধকার দিকটি উদোম হওয়ার পর যখন অপরাধীদের চেহারা দেখা গেল, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সরকার সেই অভিযানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বাড়ির পাশে অবৈধ কারবারের জমজমাট খবর তখন রাজধানীবাসী জানতে পারে। ঢাকার এই চিত্র দেখে মানুষ তখন হতবাক। এসব চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। হঠাৎ মনে হলো, এ শহরে পুরোটাই একটি ক্যাসিনো বোর্ড। বিদেশীরাও এখানকার জুয়া ও মাদকের কারবারে অংশ নিয়েছে। নতুন নতুন অবৈধ কর্মকাণ্ড এ দেশে চালু করতে আন্ডারগ্রাউন্ডের কারবারিরা তাদের হায়ার করে এনেছে। যা হোক, সরকার প্রয়োজন মনে করেনি, তাই তাদের বিরুদ্ধে আর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে কয়েকজনকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী সম্ভবত এখনো আটক কারাগারে। তারা সেখানে রাজার হালতে থাকেন। সরকার তাদের আটক রাখতে চান শুধু। শাস্তি দিতে চান না। আর বাকিদের ধরারও আগ্রহ নেই।
রাজধানীর কিছু কিছু এলাকা আন্ডারগ্রাউন্ড চক্রের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল অন্যতম। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত বিরতিতে লাশ পড়ছে। সর্বশেষ দেখা গেল মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক টিপুকে প্রকাশ্যে রাস্তায় হত্যা করা হলো। তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে গিয়ে তারা হত্যা করে বসল আরো এক পথচারীকে। জোড়া খুনের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে আমরা বর্তমান সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থাকে বুঝতে পারব। টিপু খুনের ঘটনাটি প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার স্ত্রী ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সুতরাং র‌্যাব নিয়মিত টিপুর খুনিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান নিয়ে প্রেস ব্রিফিং দিচ্ছে। মিডিয়ায় এর ধারাবাহিক উত্তেজনাকর ফলোআপ থাকছে। অন্য দিকে তার সাথে খেসারতে যাওয়া বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফনান প্রীতি নিয়মানুযায়ী বিচার পাওয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। বাংলাদেশে বিচার পাওয়ার অধিকার সবার জন্য সমান নয়। সেটি সরকারের মন্ত্রীদের কথায় বোঝা যায়। তারা প্রায়ই বলেন, ‘উপযুক্ত’ বিচার হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অর্থাৎ বিচার পাওয়া একটি নির্বাচনী (সিলেকটিভ) বিষয় হয়ে গেছে। তাদের কথার ব্যাখ্যা করলে সহজে বোঝা যায়, সব ক্ষেত্রে ‘উপযুক্ত’ বিচার হচ্ছে না। এমনকি অপরাধ করে ব্যক্তিবিশেষ ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনো ঘটনার পর তাদের এসব মন্তব্যই বিচারের করুন অবস্থা বোঝার জন্য যথেষ্ট। নিয়মানুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিটি অপরাধের বিরুদ্ধে সমানগতিতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। সরকারের মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে তাগিদ দিয়ে জোর প্রয়োগ করার এখানে কোনো অপশন থাকার কথা ছিল না। আমরা প্রায় দেখি, বিচার পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকে। তারা বলতে চাইছেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী চাইলেই বিচার হবে। বিগত বছরগুলোতে এমন বহু ঘটনা দেখা গেছে। একটি স্বাধীন দেশে বিচারের এমন দুরবস্থা লজ্জার বিষয়। এরই মধ্যে প্রীতির বাবা সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন, তিনি বিচার চান না। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত, এ ব্যাপারে তার বক্তব্য ছিল, ‘বিচার চাই না। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রাখলাম। কার শাস্তি চাইব? বিচার নাই, বিচার কার কাছে চাইব?’ রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় বিচার পাওয়ার অধিকার যে, সঙ্কুচিত নিম্নমধ্যবিত্ত প্রীতির বাবা জানেন। মর্গ থেকে মেয়ের লাশ নিয়ে কবর দিতে পারলে হৃদয়ে পুঞ্জীভূত বেদনা নিয়েও আপাতত তিনি খুশি ও নিজেকে সফল ভাবছেন। কারণ তিনি দেখেছেন, বহু মানুষ গুম হয়ে গেছে। তাদের পরিবার জানে না তারা মৃত কী জীবিত; তাদের আর কখনো ফিরে আসা হবে কি না। অন্তত তিনি মেয়ের লাশটির ঠিকানা জানেন। পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সদস্যের সন্ধান চাইতে গিয়ে কত মানুষ খোদ সরকারের শত্রু হয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের সহযোগিতার বদলে অপমানিত লাঞ্ছিত করেছেন। তাদের অসহায়ত্ব নিয়ে তামাশা করা হয়েছে।
খবরে জানা যাচ্ছে, প্রীতি বান্ধবীর বাসা থেকে ফেরার পথে খবর পান, বাসায় মামা এসেছেন। মাত্র দু’টি রুমের বাসায় চাপাচাপি করে তারা থাকেন। মামা আসায় সেখানে থাকতে অসুবিধা হবে। তাই তিনি আবার পথ থেকেই বান্ধবীর বাসায় ফিরে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় খুনি বাহিনীর গুলি তার দেহ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। যতক্ষণে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় ততক্ষণে তিনি আর পৃথিবীতে নেই। পরিবারের দুরবস্থার কারণে মেয়েটি একটি চাকরি খুঁজে নিয়েছিল। সামান্য বেতনের ওই চাকরিতে তার যোগ দেয়ার কথা ছিল। সেটি আর হলো না। সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য দিন দিন কেবল কমছেই। একজন সাধারণ মানুষ যখন একটি অব্যবস্থার কারণে প্রাণ হারান নিকটাত্মীয়দের সেটি মুখ বুঁজে মেনে নেয়াই এখন একমাত্র নিয়তি। কোনো দিক থেকে টুঁশব্দ করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারের কাছে এগুলো সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর জন্য সরকারের কোনো ধরনের দায় নেই। সুতরাং কেউ কিছু বলতে পারবে না। কোনো ধরনের প্রতিবাদ করতে পারবে না। ক্ষোভ প্রকাশ করলে এর ‘মেডিসিন’ কী সেটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এতটাই ভালো আয়ত্ত করেছে, কেউ আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটু হাঁচি কাশিও দেয় না। কারণ তাকে কোন বিপদে পড়তে হয়। কোন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ হেফাজত মানে এক চরম অনিশ্চয়তা। সেখান থেকে সুস্থ না ফেরার আশঙ্কাই বেশি। হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এ দেশে একটি সাধারণ ঘটনা। এর কোনো তদন্ত হয় না। এর জন্য কাউকে দায় নিতে হয় না। রাজধানীতে সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় দু’জন প্রাণ হারান। এক মা তার শিশুকন্যাকে নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলেন। একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের ওপর উঠে যায়। চাকায় পিষ্ট হয়ে মা প্রাণ হারান। শিশুটির সামনে এ বীভৎস ঘটনা ঘটে। বাসটি ছিল পুরনো লক্কড়ঝক্কড়। এ বাসটির মেয়াদ থাকার কথা নয়। সঠিকভাবে তদরকি হলে রাজধানীর রাস্তায় যমদূত হয়ে এটি থাকার কথা ছিল না। একই ধরনের অন্য একটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাইশা মমতাজ। তিনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একজন কর্মী ছিলেন। স্কুটিতে করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় আসছিলেন। রাস্তায় একটি কাভার্ডভ্যান তাকে চাপা দেয়। চালকের ভারী যান চালানোর লাইসেন্স ছিল না। লাইসেন্স না থাকার কারণে ভ্যানটি নিয়ে চালকের রাস্তায় নামারই কথা নয়। অথচ ওই আন্দোলনের পর প্রণীত সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন হলে হয়তো এ দুটি মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটার সুযোগই থাকত না।
এখন সংঘটিত এ দুটো খুনের ঘটনার দায় কার? রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কি এ দায় এড়াতে পারে? এজন্য দায়িত্বশীল সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি অবশ্যই রয়েছেন। তারা সরকারের মধ্যেই রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় চিন্তাও করা যায় না। বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা তার কর্ণধারদের সব কিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। সব ধরনের ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা। আইন যে, তাদের নাগাল পাবে সেটি কল্পনা করা যায় না। এসব দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করবেন, তারও সুযোগ নেই। রাস্তায় কোনো ধরনের বিক্ষোভ ও দাবি দাওয়ার আন্দোলনকে সরকার প্রথমত সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে দমন করে। এ কাজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ মানের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখে। তার সাথে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন ধরনের বাহিনী যাদের কোনো ধরনের দায়দায়িত্ব থাকে না। বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, শাস্তি পেতে হবে, এমন শঙ্কা তাদের মধ্যে থাকে না। মানুষকে বেপরোয়া মারধর হামলা করতে তাই তারা কোনো পরোয়া করে না। অনেক সময় তাদের হেলমেট বাহিনী নামে ডাকা হয়।
টিপুদের ভালো মর্যাদা রয়েছে। যেমন তাদের কাছে একই কায়দায় মারা যাওয়া মিল্কীর মর্যাদা ছিল। এর পরেও খুনের বিচার কিন্তু হচ্ছে না। ফলে তাদের নিজেদের লোকেরাই নিজেদের লোকদের দ্বারা পালাক্রমে খুন হচ্ছেন। এখানে এক প্রহসন সবসময় মঞ্চস্থ হয়। মিল্কী হত্যার পর দেখা গেল, মতিঝিলের পাড়া মহল্লায় শোকের ছায়া। কালো ব্যানারে ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবাসিক এলাকা সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনের দরজায়, সব জায়গায় কালো ব্যানার টানিয়ে শোক প্রকাশ করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও বাদ যায় না এ ধরনের ব্যানার টাঙানো থেকে। ব্যানারে মৃত ব্যক্তির গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়, তিনি কতটা ভালো জনদরদি ছিলেন সেসব। এখন টিপু হত্যার পরও পুরো মতিঝিল একই ধরনের শোকের ব্যানারে ছেয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গায়ে সাঁটানো ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘মতিঝিলের সাধারণ সম্পাদক’। কিন্তু তিনি কিসের সাধারণ সম্পাদক, অনেক জায়গায় উল্লেখ নেই। তার যোগ্যতা হচ্ছে তিনি স্কুলের গভর্নিং বডির নির্বাচিত মেম্বার। ক্ষমতা আধিপত্য ও অর্থের মোহ আমাদের এমনই কলুষিত করেছে লাশ রাজনীতির আইটেম। মিল্কী একসময় মতিঝিল এলাকার কর্ণধার ছিল। সেটি অনেকে মানতে পারেনি। তাই তার হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। তাকে হত্যা করার পর সবাই শোকসন্তপ্ত হয়ে যায়। টিপু ছিলেন মিল্কী হত্যা মামলার আসামি। বর্তমান সময়ের স্বেচ্ছাচারী শাসনের মধ্যে প্রতারণা ছলনা নিষ্ঠুরতা বদ্ধমূল হয়ে গেছে। সরকারের উপরের দিক থেকে এই শঠতার চর্চাকে আনুক‚ল্য দেয়া হচ্ছে। যেখানে ব্যক্তিগুলো একেকটি খেলার পুতুল হয়ে যাচ্ছে, অন্ততপক্ষে তারা যখন হত্যার শিকার হচ্ছেন। এখন প্রভাবশালী টিপুর খুব একটা মূল্য নেই। যেমন মিল্কীর মূল্যও এখন আর নেই। এদের জন্য এখন শোকের বাণী প্রচার করাই লাভজনক। বিচারটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। কতটা অসহায় ও ক্ষমতাহীন ভাবলে মানুষ আর সন্তানের হত্যার বিচারও চায় না আমরা তার সাক্ষী। বিচার না চাওয়ার এ মিছিলে ক্ষমতা-বিত্তের বাইরে ছিটকে পড়া অভিজাত শ্রেণীও এখন শামিল হয়েছে। যেমন : প্রকাশক আরেফিনের বাবা, নারায়ণগঞ্জের ত্বকীর বাবা। তারাও এখন একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করছেন। এই হতাশা কোনোভাবে দেশের কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং দিন দিন আরো বেশি মানুষের জীবনকে চক্রবৃদ্ধিহারে অনিরাপদ করবে। অন্য দিকে একশ্রেণীর মানুষকে করবে বেপরোয়া। অরাজকতা ও নৈরাজ্য আমাদের ওপর এখন চেপে বসেছে। এর আরো চূড়ান্ত পতনের আগে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো উচিত। রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক হতে হলে নাগরিকদের সমান মর্যাদর স্বীকৃতি দিতে হবে। ক্ষমতার জোরে বিচার পাওয়ার অধিকারকে লুণ্ঠিত করে রাখা যাবে না। জনসাধারণকে এ দাবি রাষ্ট্রের কাছে থেকে আদায় করে নিতে হবে। সরকারকে করতে হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিতামূলক।

Lab Scan