বাবা-দাদার স্মৃতি ধরে রেখে মুচির কাজ করে সংসার চলে

0

বিশেষ সংবাদদাতা॥ কালো রঙের একটি কাঠের বাক্স। বক্সটির ভিতরে তিনভাগে ভাগ করা। উপরের সারিতে ডানদিকে চামড়া, বহু ব্যবহারে ক্ষয়ে আসা কাঠের আয়তাকার ছোট তক্তা। নিচের সারিতে বাঁ দিকে রাখা পেরেক, সুতো, সুঁচ, চিমটে ও ছুরি। জুতায় ব্যবহার করার জন্য কৌটায় রঙ। বাক্সের একটি অংশে আছে চামড়ার কাজ করার জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম। বাক্সটি রাস্তার পাশে রেখে উপরে সরঞ্জামগুলো সাজিয়ে রাখেন। আবার কখনও কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেন অলি-গলিতে।
কাজ শেষে সবকিছু ফের বাক্সবন্দি হয়। এ যেন এক বিচিত্র পেশা। এই পেশার লোকেরা মুচি নামেই পরিচিত। যুগ যুগ ধরে মানুষের পায়ের জুতা সৌন্দর্যবর্ধক, মেরামত ও তৈরি করার কাজে নিয়োজিত এই পেশার মানুষ। বাপ-দাদার স্মৃতি ধরে রাখতে অনেকে এই পেশায় আসেন। রাস্তা-ঘাটে অনেক মানুষ মুচির কাজ করে সংসার চালান। তাদেরই একজন সুমন চন্দ্র দাস। তার বাবা শ্যাম চন্দ্র দাস ২২ বছর মুচির কাজ করেছেন। একবছর আগে তিনি মারা যান। কাঁধে বাক্স নিয়ে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় কাজ করেছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলে তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তার ব্যবহৃত বাক্স আর সরঞ্জামাদি দিয়ে কাজ শুরু করেন। এই কাজের মাধ্যমেই তিনি হাল ধরেন সংসারের। সুমন চন্দ্র দাস জানান, ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ার প্রতি খুব একটা মনোযোগ ছিল না। বাবা ২২ বছর ধরে এই কাজ করে সংসার চালাতেন। অভাবের কারণে লেখাপড়া শিখতে পারিনি। ঘরে মা, স্ত্রী, চার বোন ও দুই ছেলেমেয়ে আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমিও এই কাজ শুরু করি। বাবার স্মৃতির কথা মনে রেখে এই পেশা চালিয়ে যেতে চাই। আমার দাদাও এই কাজ করতেন। কিশোরগঞ্জে ছোট একটি বাড়ি আছে। এই আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। তিনি বলেন, মা বৃদ্ধ। বয়সের কারণে তার অনেক রোগ দেখা দিয়েছে। প্রতিমাসে তার ওষুধের পিছনে অনেক খরচ হয়। ছেলেটাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। কোনোদিন আয় হয় আবার কোনোদিন হয় না। আজ নব্বই টাকার মতো আয় হয়েছে। অভাবের কারণে মাঝে- মধ্যে অন্য পেশায় যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পারি না। মনে হয় এই কাজের মধ্যে স্বাধীনতা আছে। পরের কাজ করতে ভালো লাগে না। এই কাজই ভালো লাগে। সংসার চালাতে কষ্ট হলেও বাবার স্মৃতি ধরে রাখি। মায়ের চোখের অপারেশন করাতে হবে কিন্তু করোনা ও অর্থ সংকটে ঢাকায় আনতে পারছি না। বৃষ্টি হলে ওইদিন আয় একদমই কম হয়।
পল্টন মোড়ে জুতা সেলাইয়ের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রে শান দিচ্ছিলেন অতীশ মণ্ডল। তিনি জানান, আয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। কাজ একদম নেই। সারাদিনে মাত্র ত্রিশ টাকা আয় করেছি। দু’বেলা খাওয়াটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারে স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে আছে। দশ বছর ধরে মুচির কাজ করে সংসার চালাই। কোনোমতে পেটেভাতে বেঁচে আছি।
শুক্রাবাদ কাঁচা বাজারের পাশে মলিন মুখে বসে থাকতে দেখা যায় প্রতাপকে। অনেকটা অলস সময় পার করছেন। তিনি বলেন, করোনার আগে মোটামুটি আয় হতো। এখন একদম কম। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যায়। করোনার আগে প্রতিদিন অন্য কাজ করতে ভালো লাগে না। বংশীয়ভাবে এই পেশায় আসা। আমার বংশের অনেকে এই কাজ করে সংসার চালান। অনিমেশ চন্দ্র বলেন, বাপ-দাদার পেশাটাকে অনেক কষ্ট করে ধরে রেখেছি। পরিবারে স্ত্রী, মা-সহ চার ছেলেমেয়ে আছে। এই কাজ করে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এক ছেলে ও এক মেয়ে পড়াশোনা করে। রবি দাস জানান, জন্মের পর বাবাকে দেখিনি। বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। আমার দাদা এই কাজ করেন খুলনায়। ছোটবেলা থেকে দাদার কাছ থেকে এই কাজ শিখে বড় হয়েছি। এরপর এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে। কষ্ট কম। করোনা আসার পর আয় কমে গেছে। দিনে ৭০-৮০ টাকার মতো আয় হয়। এতে সংসার চলে না। স্ত্রী মা নিয়ে আমার সংসার। অন্য কাজও করতে ভালো লাগে না।

Lab Scan