বাপের বেটি, মায়ের বেটা

আমীর হামযা
ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ। আলোচিত আইনজীবী। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন সুপরিচিত প্রসিকিউটর। একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে- ট্রাইব্যুনালের এক আসামির সাথে গোপন বৈঠকে বসেছিলেন তিনি। ওই আসামির কাছে নাকি ঘুষও চেয়েছিলেন। সেই কথা জানাজানি হলে তাকে প্রসিকিউশনের সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তিনি এখন গৃহবিবাদে পুড়ছেন। জড়িয়ে পড়েছেন মা-ভাইয়ের সাথে পারিবারিক দ্বন্দ্বে। সহায়-সম্পদ নিয়ে কুরুক্ষেত্র। প্রতিপক্ষে মা-ভাই। তারাই সংখ্যাগুরু। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন চললেও আইন-আদালতে ঘটনাপ্রবাহ ও বাস্তবতা সত্য নির্ণয়ের মানদণ্ড। সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তথ্য-উপাত্তই বিচারালয়ে বিবেচ্য বিষয়।
কেউ বলতে পারেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সব সময় ছেলেদের কদর বেশি আর মেয়েদের দেখা হয় অবহেলার চোখে। সেই মানসিকতার শিকার তুরিন। তার শ্রী বৃদ্ধিতে ভাই পরশ্রীকাতর। বিদেশ বিভুঁইয়ে যেমন-তেমন, দেশে বোনের নামে বিকোতে ভাইয়ের ইজ্জতে লাগে। হাজার হোক পুরুষ মানুষ তো! পৌরুষে আঘাত। এটা হলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে সবাই। এ ক্ষেত্রে মা শামসুন নাহার তসলিম পুত্রস্নেহের কাছে ‘পরাজিত’ বলেই অনেকের মনে হয়। আমাদের মানসিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে। তবু সমাজবাস্তবতায় এখনো অনেক বাবা-মা পুত্রসন্তানের কাঙ্গাল। অথচ স্বপ্নের পশ্চিমা দুনিয়ায় গত শতকের শুরুতেই এ মানসিকতা বাতিল হয়ে গেছে। পাশ্চাত্যে এখন নারী-পুরুষে ভেদাভেদ নেই। সেই পশ্চিমা দুনিয়ায় লেখাপড়া করে বার-এট-ল হয়েছেন তুরিন। উঁচুতলার বাসিন্দা। অভিজাতদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা। মানে, আন্তরিক সম্পর্ক। গর্ভধারিণী তা ‘বাঁকা চোখে’ দেখছেন। সংবাদ সম্মেলনে নিজের গর্ভজাত মেয়ের নামে আনলেন কথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগ। এমন অভিযোগ আনার আগে মা বেমালুম ভুলে গেলেন, মেয়ে পাশ্চাত্যে পড়ালেখার সময়ই দিন-রাতের পার্থক্য ঘুচিয়েছেন। সেখানে দিনের ২৪ ঘণ্টাই সমান। কাজপাগল মানুষের সময়-অসময় বলে কিছু থাকতে নেই। অন্যদের মতো তুরিনের এ পাঠ থাকা স্বাভাবিক। তার জীবনে দিন-রাতের ভেদরেখা মুছে গেলে তাকে কি দোষ দেয়া যায়? পেশাজীবনে রাতবিরাতে কারো সাথে কথা বলা সাধারণ ঘটনা। অবশ্য, রক্ষণশীল মায়ের নৈতিকতায় বাধলে, অনৈতিক মনে হলে ভিন্ন কথা। আসলে নৈতিক-অনৈতিক বিষয়টি আপেক্ষিক এবং দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিকতার ওপর নির্ভরশীল বলেই এ যুগে অনেকের ধারণা।
অনেকে বলছেন- বোনের শনৈঃ শনৈ উন্নতিতে পরশ্রীকাতর ভাই, নিজের নাক কেটে বোনের অগ্রযাত্রায় বাদ সাধতে চান। এ কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। মুশকিল হলো; সম্পদের হিসাব-নিকাশ সরল নয়। বড্ড জটিল হওয়ায় বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। আদালতই এখন ভরসা। তা সত্ত্বেও মা-ভাই সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সহায়তায় জোর করে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ভাইয়ের উত্তরার পাঁচতলা বাড়ি ‘দখল’ করেছেন তুরিন আফরোজ। অসুস্থ মা জানান, তিনি দুই বছর তিন মাস ১৯ দিন নিজের বাড়িতে প্রবেশ করতে পারছেন না। সংবাদ সম্মেলনে মা শামসুন নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ কথা বলেন। মাতৃভক্ত অনেকে এক মায়ের কান্নায় আবেগপ্রবণ হয়ে মেয়েকে অভিশাপ দিতে পারেন। বলতে পারেন, মাকে কাঁদিয়ে কেউ কোনো দিন সুখী হতে পারেনি। তবে এ দিক থেকে তুরিন আফরোজ সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। বিচারাধীন বিষয়ে তিনি মিডিয়াতে কোনো কথা বলেননি। আইনজীবী তো। শুধু ফেসবুক পেজে পরলোকগত বাবাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন দুই পর্বের খোলা চিঠি। এখন সব কিছু পর্বে পর্বে সাজানো। ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখে ‘পর্ব’ শব্দটির প্রতি বেশ দুর্বলতা জন্মেছে আমাদের। বাবার কাছে যে খোলা চিঠি ব্যারিস্টার তুরিন লিখেছেন, এটিকে আমরা তার আত্মপক্ষ সমর্থন বলে ধরে নিতে পারি। চিঠি লিখে মনের দুঃখ হালকা করেছেন। তুরিনের ভাষায়, ‘বিচারাধীন একটি বিষয় নিয়ে আমি তো রাস্তায় বক্তব্য দিতে পারি না। মৃত বাপীর (বাবা) কাছে চিঠি দিয়ে জানালাম।’ ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন- ‘সুপ্রিয় বাপী, তোমার মৃত্যুটা মেনে নেয়া খুব কষ্টকর। তবে তোমার মৃত্যু আমাকে বাস্তবতা শিখিয়েছে। মানুষের আসল রূপ চিনতে বাধ্য করেছে। সেটি যে এত জঘন্য-নোংরা, সেটি আমি আসলেই জানতাম না। তুমি মারা গেলে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি। শোক সামলে উঠতে না উঠতেই একরাশ দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়ল। আমি একা। তোমার ছেলে তোমার মৃত্যুর ১১ দিন পরেই পাড়ি জমালো তার দেশে, পড়ে রইলাম আমি আর মামণি।
মামণিকে সামলানো, শোক ভুলাতে তাকে কাজে ব্যস্ত রাখা, ‘অভিনন্দন’কে (আমাদের সুখের স্বর্গ) দেখে-শুনে রাখাÑ সব দায়িত্ব এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। কিভাবে কী সামলাই! এত দিন তো অনেক কিছুই তুমি সামলিয়েছ। তোমার বড় সন্তান হিসেবে এখন তো স্বাভাবিকভাবেই আমাকে সব দেখতে হবে। তুমি তো আমাকে কোনো দিন মেয়ে হিসেবে বড় করোনি। বড় করেছ একজন মানুষ হিসেবে। আমি দায়িত্ব নিতে ভয় পেলে তো চলবে না, তাই না? ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি, তোমার মৃত্যুর পর তোমার প্রথম জন্মদিন। এমনিতেই মনটা ভীষণ খারাপ সে দিন। মামণিরও নিশ্চয়ই মন খারাপ ছিল সে দিন। তুমি চলে যাওয়ার পর সেও তো একা হয়ে গেছে। অন্তত ঝগড়া করার সাথীটা তো তার আর বেঁচে নেই। হঠাৎ মনে হলো, ফেব্রুয়ারি মাসের ভাড়া তুলতে হবে। ঠিক করলাম, মামণিকে এই দায়িত্ব দিলে কেমন হয়? যেই ভাবা, সেই কাজ। একটা নোটিশ লিখে ফেললাম সব ভাড়াটিয়ার কাছে। লিখলাম- ‘জনাব, আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, আমার বাবা তসলিম উদ্দিন আহমেদ পরলোকগত হয়েছেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাবা আমার পক্ষে ‘অভিনন্দন’, বাড়ি ১৫, রোড ১১, সেক্টর ৩, উত্তরা ঢাকাস্থ বাড়ির সব ভাড়া ও যাবতীয় বিল আপনাদের সবার থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করতেন এবং বিলসমূহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমার নিযুক্ত কর্মচারী ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করতেন। বর্তমানে, আমার বাবার মৃত্যুর পর, আমার বিধবা মা শামসুন নাহার তসলিম, এখন থেকে আমার পক্ষে বাড়ির সব ভাড়া ও যাবতীয় বিল আপনাদের সবার কাছে থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করবেন। তবে উল্লেখ্য যে, আমার মার সাময়িক অনুপস্থিতিতে যেকোনো বিষয়ে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।’
কিন্তু বাপী, আজ সারা দিন ধরে মিডিয়াতে শুনলাম আমি নাকি তোমার মৃত্যুর পর মামণিকে ভাড়া তুলতে বাধা দিয়েছি। বাড়ি দখল করেছি। ভাড়াটিয়াদের বলেছি সব টাকা আমার হাতে তুলে দিতে। মামণি আর শিশিরের, আমার বিরুদ্ধে ডাকা প্রেস কনফারেন্স মিডিয়াতে দেখলাম। মামণি কাঁদছিল। আমি না হয় তার যোগ্য সন্তান হতে পারিনি। আমার সাথে মামণি সম্পর্ক শেষ করেছে তোমার মৃত্যুর কয়েক মাস পরই। আমার অপরাধ? তুমি যখন ধানমন্ডির ল্যাবএইড হসপিটালে লাইফ সাপোর্টে ছিলে, তখন সেই হসপিটালের সব দর্শনার্থীর সামনে মামণি আর তার সৈয়দপুরের বোন-বোন জামাই আমাকে বললেন, ‘তোর বাবা কষ্টে মরবে না ক্যানো? সে একটা বেঈমান।’ বাপী, তোমার অপমান মেনে নিতে পারিনি আমি। প্রতিবাদ করেছিলাম। শিশিরের কথা বলতে পারি না। তোমার তিনবার হার্ট অ্যাটাক হলোÑ কই, একবারও তো শিশির আর মামণি লন্ডন আর কানাডা থেকে এলো না! না বাপী, আমি প্রেস কনফারেন্স করিনি কারো বিরুদ্ধে কষ্টের কথাগুলো বলতে।
বাপী, তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগেই মামণি আর শিশির তোমার কেনা গাড়ি বিক্রি করল। তোমার বিছানা, পড়ার টেবিল, চেয়ার, সোফা, বইয়ের তাক, অফিস টেবিল, অফিস চেয়ার সব বিক্রি করে দিলো। তোমার শখের লাইব্রেরির দেয়াল ভাঙল যাতে সেটি আর লাইব্রেরি না থাকে। তোমার ব্রিফকেসটাও উঠোনে বিক্রির জন্য রাখা ছিল। মামণি প্রেস কনফারেন্স করে কাঁদছে কেন? তার সুপুত্র তো সাথেই রয়েছে। শিশির কি তাহলে তার যতœ নিতে পারছে না? তার দেখাশোনা ঠিকমতো করতে পারছে না? তার সুপুত্র থাকতে তাকে ওষুধ না খেয়ে রাস্তায় ঘুরতে হচ্ছে কেন? বাপী, তুমি আসল ঘটনাই জানো না। আমি কাউকেই বাড়ি থেকে বের করে দেইনি। শিশিরই আমাকে তুমি মারা যাওয়ার ৫৮ দিন পর বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। দিনটি শিশিরের জন্মদিন- তোমার ছেলের জন্মদিন। সে দিনই কানাডা থেকে শিশির আমাকে উচ্ছেদ করার নোটিশ দিলো ই-মেইল করে। বাপী, বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করল কে, আর প্রেস কনফারেন্স করে কাঁদছে কে? বাপী জানো, আমি আবার উপরে এসে শিশিরকে তার ই-মেইলের জবাব দিলাম। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য, বাড়ি ১৫, রোড ১১, সেক্টর ৩, উত্তরার ঠিকানাতে আমি অন্য কারো বাড়ি দখল করিনি। সুতরাং ২০১৭ সালের মার্চের মধ্যে বাড়ি অথবা চাবি ফেরত দেয়ার প্রশ্ন আসে না। উপরন্তু, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। যতক্ষণ না পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমে এ বাড়ির মালিকানা নিরূপিত হচ্ছে, আমি এ বাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য নই। বাপী, আমি কি ভুল কিছু করেছি? কত বড় মিথ্যার সাথে লড়াই করছে তোমার মেয়ে, তুমি ভাবো!” দৃশ্যপটে দেখতে পাচ্ছি, ‘বাবার যোগ্য বেটি’ হয়ে সত্যের সাথে লড়াইয়ে নেমেছেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। আর ‘মায়ের বেটা’ হয়ে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শিশির। তবে একটি বিষয়, তুরিনের অবলম্বন মৃত বাবা। ভাইয়ের পক্ষে জীবিত মা। এখানেই দৃষ্টি আটকে যায়।
camirhamza@yahoo.com

ভাগ