বাজেটে কাঠামোগত সংস্কারের কথা নেই

প্রফেসর ড. এম এ মান্নান
গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আমাদের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন। খুবই সুন্দর, সুলিখিত ও গোছালোভাবে উপস্থাপন করা একটি বাজেট। তবে এই বাজেট গতানুগতিক, যোগ-বিয়োগের মহাসমারোহ-মাত্র। আমাদের অর্থমন্ত্রী একজন স্বনামধন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। তার সাথে কয়েকটি কনফারেন্সে আমার দেখা হয়েছে। খুবই অমায়িক ও ভদ্র ব্যক্তিত্ব। বাজেটে কোন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, কোন খাতে কমানো হয়েছে- এগুলো ট্র্যাডিশনাল যোগ-বিয়োগের হিসাব। বরং বাজেটে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা থাকলে খুশি হতাম। কাঠামোগত পরিবর্তন মানে, সম্পূর্ণ বিকল্প চিন্তাধারা। বাজেটের একটি ফিলসফি বা দর্শন থাকতে হবে। কোনো দর্শনের ওপর ভিত্তি করে কখনো এ দেশে বাজেট তৈরি হয়েছে বলে আমাদের চোখে পড়েনি। আপনার অর্থনৈতিক দর্শনটি কী, আর্থিক দর্শনটি কী? আমাদের বাজেট হলো অ্যাকাউন্টিং বাজেট বা ফাইন্যান্সিয়াল বাজেট; কিন্তু এর মধ্যে ইকোনমিক অ্যানালাইসিস বা সোস্যাল অ্যানালাইসিস নেই। বাজেটে অর্থমন্ত্রী সংস্কারের কথা বলেছেন; কিন্তু সংস্কারগুলো কেমন হবে, তা স্পষ্ট নয়। সংস্কার করতে হলে আমি তো চাইবো ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন। বাংলাদেশে ব্রিটিশ আদলে ইউনিট ব্যাংকিং বা ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই ব্যাংকিংয়ের বৈশিষ্ট্য হলো : সব টাকা সারা দেশ থেকে হেডকোয়ার্টারে জমা হবে। এরপর সেখান থেকে বরাদ্দ দেয়া হবে; কিন্তু আমরা যদি জেলাভিত্তিক বরাদ্দের কথা বলতাম, তাহলে কী হতো?
কিছু দিন আগে আমার জন্মস্থান সিরাজগঞ্জে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সাথে জড়িত একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি অনুষ্ঠানে আমাকে অর্থনীতি নিয়ে কিছু কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তখন সিরাজগঞ্জের মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আমি সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলি। এলাকার লোকজনের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করি। তখন মন্ত্রী সাহেবের উপস্থিতিতেই বলেছিলাম, সিরাজগঞ্জ এখন যেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের শৌচাগারে পরিণত হয়েছে। যারা রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায় যান, তারা এখানে কিছুক্ষণের জন্য থামেন বিশ্রামের জন্য। আবার ঢাকামুখী লোকজনও এখানে এসে ক্ষণিক বিশ্রাম করেন। আমাদের সময়ে সিরাজগঞ্জে একটি জংশনসহ চারটি রেলস্টেশন ছিল। এখন একটি ছাড়া বাকিগুলো নেই। যমুনা সেতুর কারণে উত্তরবঙ্গের কোথাও যেতে হলে সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে যেতে হয় না। এই জেলাকে পুরোপুরি বাইপাস করেই যাওয়া যায়। দ্বিতীয় যে কথাটি আমি বলেছিলাম, তা হলো- সিরাজগঞ্জে প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি অনেকগুলো ইসলামী ব্যাংকও রয়েছে। তারা সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছ থেকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত সংগ্রহ করেছেন; কিন্তু কাদের পেছনে এ টাকা খরচ করা হচ্ছে? এই টাকা যাচ্ছে ঢাকায়, হেডকোয়ার্টারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা পরিসংখ্যানে দেখেছি, সারা দেশের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে হেডকোয়ার্টারে যে টাকা আসে, তার প্রায় ৬০ শতাংশ শুধু ঢাকাতেই বিনিয়োগ করা হয়। ২০ শতাংশ যায় চট্টগ্রামে। বাকি ২০ শতাংশ সারা দেশে বিতরণ করা হয়।
তাহলে সারা দেশের উন্নয়ন কিভাবে হবে? তাই সংস্কার করতে হলে আমি বলব, সিরাজগঞ্জের টাকা সিরাজগঞ্জেই থাকতে হবে, তা যমুনা সেতু পার হতে পারবে না। শুনলে মনে হবে এটা ‘বিদ্রোহমূলক’ কথাবার্তা; কিন্তু তা নয়। রাজশাহীর টাকা রাজশাহীতেই থাকতে হবে, রংপুরেরটা রংপুরে। তখন ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক শক্তিকে জোরদার করতে বাধ্য হবে। একেই বলে ‘ব্যাপক সংস্কার’। তা ছাড়া, ব্যাংক তো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। ইংল্যান্ডে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ব্যাংক ব্যবস্থা চলে আসছে। অথচ এর জাতীয়করণ হয়েছে ১৯৪৭ সালে, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের জন্ম হয়েছে। আমেরিকায় এখনো কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতেই হবে, সব কিছু সেখানে নিয়ে কেন্দ্রীভূত করতে হবে, তারপর সেখান থেকে বরাদ্দ করতে হবে- এমনটা না হলেও চলে। আমি মনে করি, ব্যাংকের বরাদ্দগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত, জেলাভিত্তিক হওয়া উচিত। তাহলে জেলাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া হবে। তখন ব্যাংকগুলো দেখবে তার হাতে টাকা আছে, ফলে তাকে কর্মভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এখন গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা ও অন্যান্য এনজিও গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নের কাজে এগিয়ে গেছে। তারা অনেক ভূমিকা রেখেছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি করেছেন; কিন্তু তাদের কারণে সমাজে যে কুফল তৈরি হয়েছে সেগুলো দূর করার কোনো উপাদান বাজেটে নেই। নারীর ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে যা হচ্ছে তাতে পরিবারের ক্ষমতায়ন হচ্ছে না। এটা একধরনের ‘টুইস্ট’। নারীর ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে পুরুষকে বেকার করা হচ্ছে। তখন ওই পুরুষটি শহরে চলে আসছে। সে এখানে এসে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করছে। অন্য দিকে গ্রামে থেকে যাওয়া মেয়েটি একা হয়ে পড়ছে। পরিবারে ভাঙন তৈরি হচ্ছে। বাজেটে এ ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
জেলাভিত্তিক যে বরাদ্দের কথা বলেছি, সেটি একটি বিকল্প চিন্তাধারা। আমরা যে সংস্কারের কথা বলি তা হলো মেরামত। যেমন, কোনো ভাঙা আসবাব আমরা মেরামত করি। কিন্তু আমি যে সংস্কারের কথা বলছি, সেটি হলো আমূল পরিবর্তন। আমাদের দেশে যারা বাজেট তৈরি করছেন তারা হলেন প্রশাসক। আমরা যদি পাকিস্তান আমল থেকেও দেখি তাহলে দেখব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৯০ শতাংশ গভর্নর হলেন আমলা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে রাজস্ব নীতি নির্ধারণ করা হয় সেটি চালাচ্ছেন একজন প্রশাসক, যার কোনো দর্শন নেই। তারা কিন্তু সমাজে স্বনামধন্য লোক, নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ ব্যক্তি। আমাকে যদি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের হেড অব ডিপার্টমেন্ট করা হয় তাহলে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ব। আমি টেবিল-চেয়ার ঠিক করতে পারব, লোকজনের আসা-যাওয়া ‘ফেয়ার’ করতে পারব, কিন্তু গবেষণার অন্তর্নিহিত বিষয়গুলোর ধারেকাছেও যেতে পারব না। কারণ এটা তো টেকনিক্যাল বিষয়। এটা সড়ক নির্মাণের বিষয় নয় যে, কমনসেন্স অনুযায়ী কাজ করে যাবো। এর জন্য অনেক লেখাপড়ার দরকার এবং বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন। সাম্প্রতিক এক লেখায় আমি বলেছি- আমাদের বাজার অর্থনীতি করপোরেট ফাইন্যান্সের ওপর মনোযোগ দিয়েছে; কিন্তু অনেক নন-করপোরেট খাত উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আমাদের বাজেটে স্বেচ্ছাসেবক খাতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এখানে ঘটককে ধরা হচ্ছে, গণককে ধরে তার ওপর কর বসানো হচ্ছে; কিন্তু ক্যাশ ওয়াক্ফ প্রসারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। ক্যাশ ওয়াক্ফের অর্থনৈতিক শক্তি কোনো কল্পকাহিনী নয়, এটা একটি বাস্তবতা। বাংলাদেশে ছয়টি ইসলামী ব্যাংক ক্যাশ ওয়াক্ফ চালু করেছে। ১৯৯৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলাম। তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানান ক্যাশ ওয়াক্ফ সম্পর্কে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। বাংলাদেশের কেউ আমাকে ডাকেননি। যারা গবেষণা করে তারা জানে কোথায় অরিজিনাল ওয়ার্কটি হচ্ছে। ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট আজকে বিশ্বব্যাপী যে সুনাম অর্জন করেছে, তা মূলত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে। তারা জানতে চাইলেন এটা কী? আমি বললাম এটা একটা সোস্যাল প্রোডাক্ট। সেখানে মুসলিম রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশের অনেক জ্ঞানীগুণী উপস্থিত ছিলেন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। এ বিষয়ে পড়ালেখা ও গবেষণা হচ্ছে। এরপর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং তুরস্কসহ অনেক জায়গা থেকে আমি আমন্ত্রণ পেলাম এ বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য। তারা কিন্তু ক্যাশ ওয়াক্ফ চালু করেছেন। বাংলাদেশে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ১৯৯৮ সালে ক্যাশ ওয়াক্ফ প্রবর্তন করে। এর পাঁচ বছর পর ২০০৩ সালে ইসলামীক ব্যাংক এটি চালু করে। এখন সব ইসলামী ব্যাংক এটা চালু করেছে, ইসলামিক উইন্ডোগুলো করেছে; বিশ্বের অনেক দেশ করেছে। কিন্তু আমাদের বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। এটা হতো কাঠামোগত সংস্কার। আমি খুশি হতাম বাজেটে যদি আমাদের বিদেশনির্ভরতা কমানোর ব্যবস্থা থাকত। আমাদের বাজেটে দেখছি ‘ডেট সার্ভিসিং’ বিশাল সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। কাঠামোগত সংস্কার হতো সেটিই যদি বলা হতো যে, পাঁচ বছর পর আমাদের বিদেশনির্ভরতা ৫০ শতাংশ কমে আসবে। কিভাবে কমাব? এখানে ক্যাশ ওয়াক্ফ সার্টিফিকেট চালু করব, ওয়াক্ফ সম্পত্তি ডেভেলপ করব। বাংলাদেশে ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে আমি অনেক জায়গায় কথা বলেছি। এখানে ৯৫ হাজার নিবন্ধিত ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। হিসাব করে দেখেছি, শুধু ওয়াক্ফ সম্পত্তি ডেভেলপ করে সরকার ২৫ শতাংশ রাজস্ব আয় করতে পারে। ওয়াক্ফ প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট বন্ড ছাড়া যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, উত্তরবঙ্গসহ সবখানে ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তা সবচেয়ে কম। এ ব্যাপারে আমার পড়ালেখা রয়েছে। যখন ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকে ছিলাম, তখন আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে গবেষণা করার জন্য।
আমি এই গবেষণাটি করার সুযোগ পেয়েছিলাম। গবেষণার কাজ আসলে খুবই ব্যয়বহুল একটি বিষয়। আল্লাহ তা’লার কৃতজ্ঞতা আদায় করছি। অদ্ভুত বিষয় হলো, কয়েকজন অর্থমন্ত্রী আমার সেক্রেটারি ছিলেন। তুরস্কের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আমার সেক্রেটারি ছিলেন। তাকে অটোমান আর্কাইভে পাঠাই অটোমানরা ওয়াক্ফ নিয়ে কী করেছে তা দেখার জন্য। আরবির এক অধ্যাপককে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাই। তারা দেখে এসে বলল যে, হ্যাঁ, ওয়াক্ফ শরিয়াহসম্মত একটি খাত। আমি তখন ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে কাজ শুরু করি। দেখা গেল, একমাত্র আফ্রিকার একটি অংশ- পশ্চিম আফ্রিকায় ওয়াক্ফ সম্পত্তি নেই। ওয়াক্ফ তারা বোঝেনি। অথচ সোকোতোর সুলতানরা সেখানে চার শ’ বছর রাজত্ব করেছে। কিন্তু মিসর, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো- এই বেল্টে ওয়াক্ফ সম্পত্তি আছে। এমনকি তুরস্কে একটি সময়ে, ১৯২৫ সালেও তিন-চতুর্থাংশ কৃষিজমি ছিল ওয়াক্ফ সম্পত্তি। এই উপমহাদেশেও অনেক ছিল এ ধরনের সম্পত্তি।
বাংলাদেশে ওয়াক্ফ সম্পত্তির ওপর সমীক্ষাটি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমাদের প্রায় দেড় লাখ মসজিদ রয়েছে। এগুলো ওয়াক্ফ সম্পত্তি। কেউ লিখে দিয়েছেন, আর কেউ মৌখিকভাবে ওয়াক্ফ করেছেন। তাই যখন জমি পাওয়া গেল না, তখন নতুন ধারণা হিসেবে ক্যাশ ওয়াক্ফ বা নগদ অর্থ ওয়াক্ফ করার ধারণা সৃষ্টি হলো। তাহলে অর্থমন্ত্রী কেন এ খাতটি গ্রহণ করছেন না? একে বলে ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’। ওয়াক্ফের সৌন্দর্য হলো- এর সুবিধাভোগী সব ধর্মের মানুষ হতে পারেন। আবার ট্রাস্ট করে দেবোত্তর সম্পত্তির উন্নয়ন করা যেতে পারে। সেখান থেকে সরকারের রাজস্ব আসতে পারে। খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধদের এ ধরনের সম্পত্তি উন্নয়ন করা যেতে পারে। এতে সরকারের ওপর রাজস্ব আদায়ের চাপ কমবে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের মতো এলাকায় বেশ কয়েক বিঘা ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। এগুলোকে ‘স্বর্ণখনি’ বললে ও কম বলা হবে, হীরক খনি বলতে হবে। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সোস্যাল ভিশন থাকা দরকার। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কথা বলছি; কিন্তু এই আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করছেন কে? কোনটা আয়, আর কোনটা ব্যয়, এটা আমরা শিখছি পশ্চিমা অর্থনৈতিক মডেল থেকে। ‘আয়’ কাকে বলে, আর ‘ব্যয়’ কাকে বলে এটা ঠিক করে দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। আমরা বোকার মতো তাদের কথা অনুসরণ করে চলছি। আগেও বলেছি, আমাদের মতো মুসলিম দেশে এমন অনেক খাত আছে জিডিপিতে, যার হিসাব করা হয় না; কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে সেটা করা হয়। পশ্চিমা অর্থব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে অংশটুকু বাজারের মধ্য দিয়ে যায়, তার ভিত্তিতে জিএনপি বা Gross National Product হিসাব করা হয়; কিন্তু এ থেকে মাথাপিছু উৎপাদনের প্রকৃত বণ্টন ও বিন্যাস সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। আবার বাজারবহির্ভূত লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কেও জিএনপি নীরব। আমি প্রায়ই একটি উদাহরণ দিয়ে থাকি, আমেরিকাতে মারা যাওয়াও ব্যয়বহুল একটি ব্যাপার।
কবরের ব্যবসা সেখানে কম লাভজনক নয়। কিন্তু আমাদের গ্রামগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে আমাদের দাদা-নানারা যখন মারা গেছেন তাদেরকে কিভাবে কবর দেয়া হয়েছে? প্রতিবেশীরাই এ কাজে এগিয়ে আসেন। তারা দাফন-কাফনের সব কাজ শেষ করে দোয়া-মুনাজাত করে বিদায় নেন। হয়তো কয়েক দিন পর দোয়ার অনুষ্ঠানে তাদের দাওয়াত দেয়া হয়া। কিছু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়, ব্যাস। এটা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেশে দেখা হয়, তুমি প্রতিবেশীকে সাহায্য করেছ। এই কাজের জন্য গ্রামের কেউ কিন্তু কোনো পয়সা দাবি করছেন না, তারা কিন্তু পরিশ্রম করেছেন। শ্রমের একটি মূল্য আছে। তবে শ্রমের এই মূল্যটি আমাদের জিএনপির হিসাবে আসছে না। একইভাবে আমাদের দেশে সত্যিকারের বেকারত্ব ২৫ শতাংশের কম হবে না। প্রায় প্রত্যেক পরিবারে দু-একজন নির্ভরশীল রয়েছে। আমাদের এখানে গ্রাম থেকে অনেকে বেড়াতে আসেন। তারা থাকেন, খান। কিন্তু আমেরিকাতে এটা অসম্ভব। তারা কল্পনা করতে পারে না যে অতিথি বেড়াতে গিয়ে কেন জামাই, ছেলে বা মেয়ের বাড়িতে থাকবেন? তারা বেড়াতে এসে হোটেলে কেন থাকবেন না? বাড়িতে থাকলেই কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। তাদের সমাজ যতটা নিউক্লিয়ার হয়ে গেছে, যতটা স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, আমাদের সমাজ আজো ততটা হয়নি। অথচ আমাদের বাজেটে এর প্রতিফলন নেই। এখানে আমাদের পরিবারগুলোতে মেয়েরা যে কাজ করে, তার হিসাবও বাজেটে আসে না।
তাই আমি বলছি, শুধু মধ্য কেন, উচ্চ আয়ের দেশ হতে চাইলেও আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন হওয়া দরকার। এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। আমাদের অর্থমন্ত্রী চাইলে এটা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন প্রস্তাব গেলে তিনি নিশ্চয়ই রাজি হবেন। তখন প্রকৃত আয় ও হিসাবের আয়ের মধ্যে পার্থক্য কতটা, তা বোঝা যাবে। যে কাজের বিনিময়ে পয়সা নেয়া হচ্ছে না তার কি মূল্য নেই? এগুলো আমাদের সমাজের মূল্যবোধ। এগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন। আবার আমি এ কথাও বলব না যে, আমাদের সব ভালো, আর পশ্চিমাদের সব খারাপ। তাদের ভালো দিকগুলো অনুসরণ করতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়; কিন্তু বাজেটে যদি এসব বিষয়ের দিকনির্দেশনা থাকতÑ তাহলে মানুষ এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে পারত। প্রতি বছর জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করার পর নানা কমেন্ট আসে। কেউ নিন্দা করে, কেউ সাধুবাদ জানায়। আমি একটানা ৩৩ বছর বিদেশে কাটিয়ে ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আসি। তখন থেকে বাজেট দেখছি, কিন্তু কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। এতে একই কথার পুনরাবৃত্তি। আমাদের অর্থমন্ত্রীদের মধ্যে প্রশাসক এসেছেন, ইতিহাসবিদ এসেছেন, ইংরেজি সাহিত্যের লোক এসেছেন, ফিজিসিস্ট এসেছেন, হিসাবরক্ষক এসেছেন; কিন্তু অর্থনীতিবিদ ছিলেন হাতেগোনা এক-দুইজন। আমি কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছি না। তাদের প্রত্যেকেই সম্মানিত এবং অনেকে আমার বয়সে বড় ও শ্রদ্ধেয়। এটা হলো কাঠামোগত সমস্যা। আপনি প্রশাসক রাখেন। পাশাপাশি একজন দার্শনিককেও রাখেন। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন কবি আল্লামা ইকবাল। ‘মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র হওয়া দরকার’ বলে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি ১৯৪০ সালে লাহোরে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর বহু আগে ১৯০৬ সালে নিখিলভারত মুসলিম লীগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই প্রস্তাব উত্থাপনের পথ সুগম হয়। অর্থাৎ একজন দর্শন দেন, আরেকজন পরে তা বাস্তবায়ন করেন। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতে পারেন। মনে হয়, এ মুহূর্তে শুধু একজনের কাছে আমার কথাগুলো পৌঁছানো গেলে, তাকে বোঝানো গেলে আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো দূরীভূত হয়ে সমৃদ্ধি আসবে। তিনি চাইলে অন্যরা এর বিরোধিতা করবে বলে মনে করি না।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
hmct2004@yahoo.com

ভাগ