বাজারে তদারকি নেই, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ি করছে ক্রেতারা আমদানি অব্যাহত, তবুও যশোরের বাজারে ফের বাড়লো কাঁচা মরিচের দাম

0

 

আকরামুজ্জামান ও কামাল হোসেন ॥ আমদানি অব্যাহত থাকলেও মঙ্গলবার (৪ জুলাই) ফের যশোরের বাজারে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় কাঁচা মরিচের দাম। সোমবার যশোরের বাজারে কাঁচা মরিচের দাম নেমেছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে। অথচ একদিন পর গতকাল ফের সেই কাঁচা মরিচে কেজিতে বেড়েছে ২০০ টাকা। এদিন যশোরের বাজারে প্রতিকেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ৪শ থেকে ৪শ ৫০ টাকা দরে।
এদিকে মঙ্গলবার বেনাপোল বন্দরে ৫টি ট্রাকে ৩৩ টন কাঁচা মরিচ আমদানি হয়েছে। এনিয়ে এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে গত তিনদিনে আমদানি করা হয়েছে ১২৩ টন কাঁচা মরিচ। ঢাকা ও খুলনার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব কাঁচা মরিচ আমদানি করে নিয়ে আসে। কাঁচা মরিচের চালানগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আমদানি হওয়া কাঁচা মরিচ পর্যাপ্ত নয়, তাছাড়া বৃষ্টির কারণে দেশি মরিচের উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় সরবরাহ কমেছে। সরবরাহ কমের কারণে দাম বেড়েছে।
তবে ক্রেতারা বলছেন, সরকারিভাবে বাজার তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটছে।
মঙ্গলবার যশোরের বড়বাজার এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। আর এক কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে আড়ত থেকে তারা ৩০৫ ও ৩২০ টাকা কেজি দরে কাঁচা মরিচ কিনেছেন। খুচরা বিক্রিতে তারা বাজারের আনুষাঙ্গিক খরচ তুলতে কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করেছেন।
মশিয়ার রহমান নামে এক সবজি ব্যবসায়ী বলেন, সোমবার বাড়তি দামে কাঁচা মরিচ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ তাদের ধারনা ছিলো মঙ্গলবার যশোরের বাজারে পর্যাপ্ত আমদানি হওয়া মরিচ ঢুকবে। সরবরাহ বেড়ে গেলে তারা কম দামে বিক্রি করতে পারবেন। তবে মঙ্গলবার বাজারে সেই পরিস্থিতি না দেখা দেওয়ায় বাড়তি দামে কাঁচা মরিচ কিনতে হয়েছে তাদের।
একই কথা বলেন ইসমাইল হোসেন নামে আরেক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আমরা বেশি দামে কিনে তো আর কম দামে বিক্রি করতে পারি না। পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০৫ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে। ফলে আমাদের বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, ভারত থেকে আমদানি হওয়া কাঁচা মরিচের সরবরাহ না বাড়লে আমাদেরকে এভাবেই বিক্রি করতে হবে।
এ বিষয়ে আড়তদার দিপু সিকদার বলেন, বাজারে দেশে উৎপাদিত কাঁচা মরিচের সরবরাহ খুবই সীমিত। তাছাড়া আমদানি হওয়া মরিচ রোববার থেকে যেগুলো বাজারে ঢুকেছিলো সেগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। গতকাল খুলনা থেকে আমদানি যে মরিচ এসেছে সেগুলো কেজি ২৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, বেনাপোল দিয়ে মঙ্গলবারও মরিচ ঢুকেছে। এসব মরিচের সরবরাহ বেড়ে গেলেই দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবে খুচরা ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের এসব কথার সাথে দ্বিমতপোষণ করেছেন ক্রেতারা। তাদের দাবি বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত মরিচ আমদানির পরও ব্যবসায়ীরা সেগুলো বাজারে না তুলে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাড়তি মুনাফা লুঠে নিচ্ছে। সরকারিভাবে বাজার তদারকি জোরদার হলে এমন পরিস্থিতি হতোনা।
এ বিষয়ে যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, গত রোববার ও সোমবার কাঁচা মরিচের দাম নিয়ন্ত্রণে আমরা যশোরের বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করার পর দাম নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু মঙ্গলবার আবার তা বাড়তি বিক্রি হয়েছে বলে আমাদের কাছে খবর এসেছে।  বুধবার এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে গত তিনদিনে আমদানি হয়েছে ১২৩ টন কাঁচা মরিচ। মঙ্গলবার বিকেলে ৫টি ট্রাকে ৩৩ টন কাঁচা মরিচ বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। রোববার ৪৫ টন ও সোমবার ৪৫ টন কাঁচা মরিচ বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়।
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল বলেন, মঙ্গলবার ভারত থেকে ৫টি ট্রাকে ৩৩ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ বেনাপোল বন্দরে পৌঁছেছে। এগুলো দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সীমান্তের ওপারে আরও কয়েক ট্রাক কাঁচা মরিচ এপারে ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। গত তিনদিনে এ বন্দর দিয়ে ১২৩ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ আমদানি হয়েছে।
এ বন্দর দিয়ে বেনাপোলের মেসার্স ঊষা ট্রেডিং ঢাকার এনএস এন্টারপ্রাইজ ও খুলনার এস এম করপোরেশনসহ আরও কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাঁচা মরিচ আমদানি করছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের রাজস্ব কর্মকর্তা কলিমুল্লাহ্ জানান, জরুরি ও পচনশীল পণ্য হওয়ায় কাঁচা মরিচের চালানগুলো ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত খালাসে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও জানান, প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের আমদানি মূল্য দশমিক ২১৫ মার্কিন ডলার (২২ সেন্ট)। টাকার অঙ্কে ২৩ টাকা ৯৩ পয়সা। আর প্রতি কেজির বিপরীতে কাস্টম শুল্ক দিতে হয়েছে দশমিক ৫ মার্কিন ডলার (৫০ সেন্ট), যা টাকার অঙ্কে ৩৮ টাকা ৮২ পয়সা।
বেনাপোলের আমদানিকারক ঊষা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম রয়েল জানান, আমদানি হওয়া কাঁচামরিচ তাদের রফতানিকারকরা বনগাঁসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করেন। আমদানি মূল্য ও কাস্টম শুল্ক ছাড়াও পরিবহনসহ দুই দেশের অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের আরও অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়। সব মিলিয়ে ঢাকার পাইকারের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আমদানি করা ভারতীয় কাঁচা মরিচের দাম পড়ে যায় ১৫০-১৬০ টাকার মতো। এর সঙ্গে বাজারের টোল ও সামান্য লাভ যোগ করে পণ্য বিক্রি করবেন।
সীমান্তের ওপারের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁর রফতানিকারক ফিরোজ বিশ্বাস জানান, মঙ্গলবার বনগাঁর স্থানীয় বাজারে কাঁচা মরিচের পাইকারি দর ছিল ১৬০ থেকে ২৮০ রুপি কেজি। আর খুচরা বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৩০০ রুপিতে। এদিন ভারতের নাগপুরে কেজি প্রতি পাইকারি দর ছিল ৭০ রুপি।
দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ভারত থেকে মরিচ আমদানি করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য ঠেকাতে ভারত থেকে এ পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৮৩০ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার।

Lab Scan