বাকড়ী বিদ্যালয়ের পিকনিকের বাস দুর্ঘটনা শোকে স্তব্ধ এগারোখান

0

বাঘারপাড়া (যশোর) সংবাদদাতা॥ পিকনিকের বাস দুর্ঘটনায় হতাহতে বদলে গেছে যশোরের বাঘারপাড়া ও নড়াইলের ১১খান অঞ্চলের চিরচেনা প্রতিদিনের পরিবেশ। শুক্রবার পুরো এলাকা ছিল শোকে স্তব্ধ। দুর্ঘটনায় নিহত সুদীপ্ত বিশ্বাস ও বিদ্যুৎ বিশ্বাসের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এদিন সারাদিন এলাকার চায়ের দোকানগুলোতে ছিল না তাসখেলা অথবা কোন আড্ডা। সেখানে ছিল নিহত ও আহতদের নিয়ে বিশ্লেষণ। আবার কেউ কেউ জলভরা চোখে অন্যদের শোনাচ্ছিলেন দুর্ঘটনার করুন কাহিনী। এলাকার দোগাছি, বাকড়ী, হাতিয়াড়া, মালিয়াট, বেনাহাটি ও কমলাপুর বাজারের দোকানগুলোতে সারাদিন এরকমই চিত্রই দেখা গেছে। চালকের বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংই এ দুর্ঘটনার কারণ বলে মনে করেন বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার সকাল ৯টায় দোগাছি গ্রামের সুদীপ্ত বিশ্বাসের বাড়িতে যেয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে শোকের মাতম। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বাড়ির দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ হলেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিলো ছেলেটির। এসব নিয়েই বিলাপ করছিলেন নিহতের মা মিনতি রানি ভৌমিক। সুদীপ্ত চাড়াভিটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিনতি ও সদরের ঘুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কুমারেশ বিশ্বাসের সন্তান।
অন্যদিকে নিহত অভিভাবক সদস্য বিদ্যুৎ বিশ্বাসের বাড়িতে এসময় চলছিলো সুনসান নিরবতা। কিছুক্ষণ আগে তাঁর মরদেহ স্থানীয় শ্মশানে সমাহিত করা হয়েছে। এসময় পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা নিহতের স্ত্রী ও সন্তানদের সান্তনা দিতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ বিশ্বাস বাকড়ী গ্রামের ও বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা মৃত গোকুল বিশ্বাসের ছোট সন্তান।
দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা ও সামান্য আহত ৮ম শ্রেণি ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজদীপ বিশ্বাস ও সীমান্ত বিশ্বাস জানায়, আমরা সন্ধ্যায় বাস নিয়ে রওনা হই। ভাটিয়াপাড়ায় আসলে আমাদের বাসটি সামনের বাসের চাকার সাথে ঘষা খেয়ে সড়কের পাশের গাছের সাথে ধাক্কা খায়। দুমড়ে মুচড়ে যায় বাসটি। বাঁচাও বাঁচাও বলে কান্নাকাটি করতে থাকে সবাই। এসময় যাদের হুস ছিলো তারা কেউ কেউ বাসের দরজা বা জানালা দিয়ে বাইরে লাফ দেয়। বাসের পিছনে বসা যাত্রীরা সামনের যাত্রীদের ঘাড়ের উপর এসে পড়ে। এসময় জানালার কাচে অনেকের শরীরের বিভিন্ন স্থান কেটে যায়। তারা আরও বলে, শুনেছিলাম দুই চালক বন্ধু। তারা একে অপরকে টেক্কা দিতে গিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাদের মায়েরা বলেন, এরা সবাই প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। কারও সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না।
শিক্ষকদের মাধ্যমে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল আটটায় উপজেলার বাকড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তিনটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ে শিক্ষা সফরে বের হন। তিনটি বাসে ১শ’ ৬৩ জন যাত্রী ছিল। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ১৩২ জন, অভিভাবক সদস্য ৪জন, শিক্ষক ১২জন, কর্মচারী ৭জন এবং শিক্ষকদের ছেলে-মেয়ে ৮জন। এদিন তারা বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল টুঙ্গিপাড়ার বিভিন্ন ঘুরে দেখে ও দুপুরের খাবার শেষে সন্ধ্যা ছয়টায় বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। আগে পিছে চলা তিনটি বাস সন্ধ্যা ৭টায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার ভাটইপাড়া এলাকায় পৌঁছালে মাঝখানের বাসটি সামনের বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে। এসময় সামনের বাসের পিছনের চাকার সাথে পিছনের বাসের সামনের চাকার সংঘর্ষ হয়। পিছনের বাসে দ্রুত গতি থাকার কারণে চালক বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং সড়কের পাশের গাছের সাথে ধাক্কা খায়। মুহূর্তেই বাসটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় বাসের হেলপার। এরপর হাসপাতালে নেওয়ার পথে অভিভাবক সদস্য বিদ্যুৎ বিশ্বাস ও ল্যাব সহকারী সুদিপ্ত বিশ্বাস মৃত্যুবরণ করেন।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি রায় বলেন, দুর্ঘটনায় ৩জন মারা গেছেন এবং ৪৩জন আহত হয়েছেন। আহত শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত। অনেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও কারও হাত বা পা ভেঙেছে। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ২০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা ঢাকা, খুলনা ও যশোরে চিকিৎসাধীন আছে।
আরও জানা গেছে, আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইডিএফ (এগারোখান ডেভেলপমেন্ট ফোরাম) উদ্যোগ গ্রহন করেছে। তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গতকাল বিকেল চারটায় বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে এক জরুরি সভা করেছে।
এছাড়াও আহতদের চিকিৎসায় নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়র বিপুল ফারাজি। তিনি এদিন এগারোখানের আহত নিহতদের বাড়িতে যেয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্তনা দেন ও খোজ খবর নেন। এসময় তিনি ইডিএফ সংগঠনকেও আর্থিক সহায়তার ঘোষনা দেন। এদিন বাঘারপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ভিক্টোরিয়া পারভিন সাথীও আহত নিহত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে বাড়িতে খোজ খবর নেন ও সমবেদনা জানান।

Lab Scan