বরাদ্দ বাতিল করলো ভারত: সরকারি অর্থায়নেই নির্মাণ হবে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ যশোর, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও পাবনা মেডিকেল কলেজের জন্য ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণে ভারতের ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ ঋণ বাতিল করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চার বছরেও প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়ায় ভারত সরকার বরাদ্দ বাতিল করেছে। ফলে সরকারি অর্থায়নেই এখন থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে যশোর মেডিকেল কলেজ দ্রুত বাস্তবায়নে নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেকে পাস না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনঢ় রয়েছে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি। গত কয়েক মাস ধরে যশোর মেডিকেল কলেজ নির্মাণের দাবিতে এই কমিটির ব্যানারে আন্দোলন করে আসছেন যশোরবাসী। আগামী ৪ মার্চও এই দাবিতে যশোর মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন মহাসড়কের পাশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে সংগ্রাম কমিটি।


স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে যশোর, পাবনা, কক্সবাজার ও নোয়াখালীতে ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ৫০০ বেডেড হাসপাতাল ও এনসিলারি ভবন’ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। ওই বছরের মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেক’র সভায় প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২ হাজার ১০৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থ ৬৬৩ কোটি ৩২ লাখ ও ভারতীয় ঋণ ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিলো। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, পরিমাণে ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অবকাঠামোগত অগ্রগতি একেবারেই শূন্যের কোটায় রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। বিষয়টি স্বীকার করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের উপ-প্রধান ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, যে শর্তে ভারতের ঋণ দেওয়ার কথা, তা পূরণ হয়নি। দেশটি ঋণ বাতিল করায় প্রকল্পটি দেশীয় অর্থায়নে করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাবনা নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি, পিইসি সভায় আলোচনা করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম সংশোধনীতে ২ হাজার ৭৮১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অনুমোদিত প্রাক্কলন ব্যয়ের চেয়ে ৬৭৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বেশি। প্রকল্পটির সময় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের জুনে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানায়, ভারতীয় ঋণ প্রাপ্তি থেকে অনেক আগেই প্রকল্পটি বাদ দেয়া হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব (ভারত) মুহাম্মদ রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, ওই প্রকল্পটি ভারতীয় ঋণ প্রাপ্তির তালিকায় আর নেই। আমি ইআরডিতে আসার আগেই এটা বাদ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বলছে, হাসপাতালের কাজের মানের সঙ্গে কোনো কম্প্রোমাইজ করা হবে না। সিডিউল অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তবে ঠিকাদার যেন চুক্তির চেয়ে কম কাজ না করতে পারেন সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতালগুলোতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে সাশ্রয় হবে জায়গার। এতে ভবন নির্মাণে ব্যয়ও কমে আসবে এবং হাসপাতালের খালি জায়গায় অধিক সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করে সৌন্দর্য বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে ভারসাম্য বাড়বে পরিবেশের।
বিভাগের সংখ্যা বৃদ্ধি : মূল অনুমোদিত প্রকল্পে ২১টি বিভাগের সঙ্গে নতুন করে ১০টি বিভাগ সংযুক্ত করা হয়েছে। বিভাগ বাড়ার সঙ্গে আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অন্য খরচও বেড়েছে। নতুন পদ সৃজন : মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য নতুন নতুন পদ সৃজন করা হয়েছে। এতে বাড়তি অবকাঠামোও নির্মাণ করতে হবে। এসব কারণেও প্রকল্পের সময়-ব্যয় বাড়বে। মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পুনঃনির্ধারণ : বিভাগ বাড়ানোর জন্য মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ খাতেও ব্যয় বাড়ছে বলে জানা গেছে।
আবাসিক চিকিৎসক ও সার্জনের জন্য আবাসন : আবাসিক চিকিৎসক, আবাসিক সার্জনের মতো ফুলটাইম চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়ার লক্ষ্যে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে অবস্থান করা জরুরি। মূল প্রকল্পে আবাসিক চিকিৎসক ও আবাসিক সার্জনের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থা ছিলো না। নতুন সংশোধিত প্রকল্পে এ উদ্দেশ্যে একটি অতিরিক্ত ভবনের জন্য অর্থের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বেজমেন্টের ফোর্স ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা : আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) বেজমেন্টের ফোর্স ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) ছিলো না। এছাড়া প্রকল্পের হাসপাতালের মান ও সেবার মান উন্নয়নে কিছু সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলো হলো-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আগুনে পোড়ানোর প্রক্রিয়া বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর ও যুগপোযোগী নয়, আরডিপিপিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এর বাইরে ওটি, সিসিইউ, আইসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস ইউনিটের জন্য সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। এজন্য আরডিপিপিতে সাব-স্টেশন ও জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যা ডিপিপিতে ছিল না। যশোরসহ চারটি জেলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। আধুনিক চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করা। এক হাজারের বেশি ডাক্তার ও অন্যান্য পেশাজীবীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রতিটি মেডিকেল কলেজে ১০ তলা ভিতের ওপর ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। আয়তন হবে ২৫ লাখ ৭ হাজার ৭৩২ ফুট। ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হবে, যার প্রতিটি হবে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬৬ বর্গফুটের। ২ লাখ ৩৯ হাজার বর্গফুটের ইস্টার্ন ডরমিটরি নির্মাণ করা হবে। এছাড়া চিকিৎসক, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩ লাখ ১৪ হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের জন্য কেনা হবে ৩১ হাজার ৬১০টি আধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি। এছাড়া ১১টি যানবাহন ও ৩২ হাজার ২৫৩টি আসবাবপত্র কেনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটুর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি গতকাল শনিবার রাতে লোকসমাজকে জানান, হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প থেকে ভারত সরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তারা সবিস্তার জানেন। তিনি বলেন, ভারত সরকার অনেক আগেই প্রকল্প থেকে সরে গেলেও সদ্য অনুষ্ঠিত গত ২২ ফেব্রুয়ারি একনেকের সভায় এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত একনেকের সভায় পাস না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যশোরের গণমানুষের এই প্রাণের দাবির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনতে এ অঞ্চলের এমপিরা ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনার পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।

Lab Scan