বই নেই কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট!

0

তহীদ মনি ॥ নতুন শিক্ষাবর্ষের দু’মাস শেষ হতে চললেও যশোরে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখনো বই পায়নি, হচ্ছে না ক্লাস- অথচ তাদের চারটি বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২টি বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্ট জমা হলেও প্রক্রিয়াধীন আছে ২টি। মাধ্যমিক জীবনের শুরুতেই তাদেরকে মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট থেকে অনৈতিকভাবে কপি করে কাজ শেষ করতে হচ্ছে।
শিক্ষা বিভাগের সূত্র মতে, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সরকারি বিনামূল্যের বই পাবে ১৪টি। বছরের শুরুতে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক একটি বই পেয়েছিল তারা। প্রায় দু’মাস হতে চললেও অবশিষ্ট ১৩টি বই হাতে পায়নি তারা। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে মাধ্যমিক স্তরের সূচনাতেই এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বইবিহীন কাটলো প্রায় দু’মাস। বাংলা, ইংরেজি, অংক, পরিবেশ পরিচিতি, বিজ্ঞান, ধর্ম বা অন্য কোন বই হাতে না পেয়ে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর নতুনত্ব থেকে বঞ্চিত তারা। বছর শুরুর পর সপ্তাহে একদিন হিসেবে দু’একটি ক্লাসে যেয়ে নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচিত হওয়ার আগেই আবার বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। করোনা থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সরকার। গত ২২ ফেব্রুয়ারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হলেও দুই ডোজ টিকা গ্রহণ ব্যতীত কাউকে বিদ্যালয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ষষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ১২ বছরের কম বয়সী। ফলে, তাদেরকে করোনা প্রতিরোধী টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনা যায়নি। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ে চালু হলেও ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে না তারা। এ অবস্থায় শিক্ষক-অভিভাবক সকলেই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা পরামর্শ দিয়েছেন পুরাতন বই সংগ্রহ করতে। প্রাথমিকের গ-ি পেরিয়ে সবে মাধ্যমিকে পা রাখা শিক্ষার্থীদের জন্যে এটা কতটুকু সম্ভব। অবশ্য, বই বা ক্লাস না পেলেও ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দফায় ৪টি বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে ষষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। প্রথমে দেওয়া হয়েছিল বাংলা ও সাধারণ গণিত। ইতোমধ্যে সে দু’টি জমা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে দেওয়া হয়েছে ইংরেজি ও পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) থেকে। সে দু’টি এখনো জমা নেওয়া হয়নি। বই না পাওয়া, ক্লাস না থাকার পরও অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বিপাকে সবাই। সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অভিভাবক জানালেন, কোনো পড়াশুনা নেই। মোবাইল ফোন দেখে ছেলে-মেয়েরা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনের শুরুতেই না পড়ে, দেখে লেখার শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। তাদের মতে, একসময় বছরের প্রথমে শিক্ষার্থীরা নতুন ও রঙিন বই পেয়ে সেগুলো নাড়াচাড়া করতো, কবিতা মুখস্ত করতো, গল্প ও ইতিহাস পড়তো। এখন আর সেটা হচ্ছে না। কয়েকজন শিক্ষক এই বাস্তবতা স্বীকার করে জানালেন, তারা দু’একটা পুরনো বই সংগ্রহ করে এক একজনকে দিচ্ছেন। সেটা দেখার পর অন্যজনকে দিতে বলছেন। এভাবে চলতে পারে না। একজন প্রধান শিক্ষক বললেন, তার স্কুলের শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র। মোবাইল স্মার্ট ফোন বেশিরভাগেরই নেই। ক্লাস হচ্ছে না যে, সেখানে বসিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝানো যাবে।
যশোর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লায়লা শিরিন সুলতানা জানান, ইতিপূর্বে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেয়েছে। করোনার কারণে এ বছর একটু সমস্যা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটির বেশি বই পায়নি। আবার যাদের বয়স ১২ বছরের কম তারা টিকা পায়নি। ফলে, ইচ্ছে করলেও ক্লাসে বসানো যাচ্ছে, না। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার একেএম গোলাম আযম বলেন, এ মাসের মধ্যে বই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অ্যাসাইনমেন্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাহায্য করবেন। ক্লাস নেই। বই নেই শিক্ষার্থীরা কীভাবে সহায়তা পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যোগাযোগ করে নেবে, শিক্ষকরাও খোঁজ নেবে।

Lab Scan