ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই : ৬৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কমিশনের অনুসন্ধানে ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ ও তার ছোট ভাই রুবেলের বিরুদ্ধে আয় বর্হিভূত প্রায় সাড়ে ৬৬ কোটি টাকা উপার্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে দুইভাইকে তাদের সম্পদ বিবরণী দিতে নোটিশ জারি করেছে দুদক। গত ১১ই ডিসেম্বর তারা দুদকে হাজির হয়ে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে ২১ দিনের সময় নিয়েছেন। সেই হিসেবে আগামী ১লা জানুয়ারি তাদের সম্পদের বিবরনী দাখিল করতে হবে। এর মধ্যে অন্যকোনো কারণে নির্ধারিত তারিখে না আসতে পারলে আবেদন করে আরো ১৫ দিন সময় বাড়িয়ে নিতে পারবে বলে নিশ্চিত করেছে দুদক সূত্র। এর আগে এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন এক ব্যক্তি। গত ১লা মে দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের এক চিঠিতে দুদকের ফরিদপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। একই মাসে অনুসন্ধানী কর্মকর্তা চিঠি দিয়ে বরকত ও রুবেলকে দুদকে তলব করেন। ২২ মে তারা ফরিদপুর দুদক কার্যালয়ে হাজির হন।
ফরিদপুর দুদক অফিসের কর্মকর্তা দুদকের অভিযোগ রহস্যজনক কারণে আড়াল করে রাখেন। ওই কর্মকর্তা রুবেল-বরকতের আমন্ত্রিত অতিথি হওয়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তাকে ফরিদপুর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর দুদক সদর কার্যালয় থেকে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদকে অব্যাহতি দিয়ে অনুসন্ধান কাজ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আলী আকবরকে। এরপরই ২০শে আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এই প্রতিবেদকে তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দুদকের ফরিদপুর কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে দুই ভাইয়ের সখ্যতার অভিযোগ আসার পর অনুসন্ধানে নামে মানবজমিন। গত ১৭ ই অক্টোবর‘ ফরিদপুরে দুই ভাইয়ের ত্রাসের রাজত্ব ’ শিরোনামে একটি সরজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সেখানে জমি দখল, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন, টেন্ডারবাজি, আওয়ামী লীগের কর্মীদের ও সাংবাদিকদের নির্যাতন এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, জেলার সব জায়গায় খবরদারির চিত্র ওঠে আসে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। জানা যায়, প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর দুদকের তদন্তে গতি পায়।
এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, সরেজমিন অনুসন্ধানে ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে দুই ভাইয়ের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফরিদপুর স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশলী অধিদপ্তরে নির্বাহী কার্যালয়ের ২০১০-১১ থেকে ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত চুক্তিকৃত কাজের সংখ্যা ১৯৬টি। তার মধ্যে এস.বি ট্রেডার্স শূন্য ও মেসার্স রাফিয়া কনষ্ট্রাকশন ১ (০.৫১%) কাজ করেছে। দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক আলোচিত এই দুই ভাই। এই দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছেন। জানা যায়,সাজ্জাদ হোসেন বরকত ২০১২-১৩ করবর্ষে প্রথম আয়কর নথি খুলেন। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী ২০১২-১৩ সাল থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন। দুদক তাদের অনুসন্ধানে সাজ্জাদ হোসেন বরকতের রেকর্ডপত্র, আয়কর নথি ও আনুসাঙ্গিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখেছে, ২০১২-২০১৩ থেকে ২০১৯-২০২০ সাল পর্যন্ত নিজ নামে, তার স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৬২ কোটি ১৮ লাখ নয় হাজার ৪৪৩ টাকা মুল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। যার মধ্যে বরকতের নিজের, স্ত্রীর এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ২৯ কোটি ৯৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৩ টাকা আয়ের উৎস পাওয়া গেছে।
যার মধ্যে ৩২ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৮০ টাকা আয় বর্হিভুত উপার্জন করেছেন। এর বাইরেও বরকত, তার স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে আর কোন সম্পদ আছে কিনা জানতে নোটিশ জারি করা হয়েছে। এদিকে দুদক বরকতের ছোট ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিষয়ে তদন্তে জানতে পেরেছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ করবর্ষে প্রথম তিনি আয়কর নথি খুলেছেন এবং প্রতিবছর তিনি আয়কর দাখিল করছেন। অনুসন্ধানে রুবেলের রেকর্ডপত্র, আয়কর নথি ও আনুসাঙ্গিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে নিজের, স্ত্রী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৮কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা মুল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। যার মধ্যে রুবেলের নিজের, স্ত্রীর এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার ৭৬৭ টাকা আয়ের উৎস পাওয়া গেছে। বাকি ৩৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ২৩৩ টাকা আয়ের সঙ্গে অসামজ্ঞস্যপূর্ণ পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের বাইরেও তাদের নামে আর কোন সম্পদ আছে কিনা জানতে নোটিশ জারি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে চলাকালে ২০ আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে চায় তদন্তকারী কর্মকর্তা। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক তদন্তকারী কর্মকর্তা আলী আকবর এই প্রতিবেদকে বলেন, আমি সুপারিশ করেছিলাম সম্পদের হিসেব বিবরণী দাখিল করার জন্য। তাদেরকে যত কার্যদিবস সময় দেয়া হয়েছে এর মধ্যে তারা সম্পদের বিবরণী দাখিল না করলে তাদের বিরুদ্ধে নন সাবমিশন মামলা দায়ের করা হবে। আর দাখিল করার পর যদি কোনো সম্পদ গোপন করেন এবং সেটা পরে অনুসন্ধান করে পাওয়া যায়, সেটাই অবৈধ সম্পদ হবে।

ভাগ