প্রধানমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন

আমাদের সমাজে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গ্রাস করেছে। প্রতিটা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট একশ্রেণীর কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের মাদরাসাগুলো অবশ্যই ব্যতিক্রমী ভ‚মিকা পালন করছে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি-বেসরকারি আমলাসহ উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা ঘুষ- দুর্নীতি ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়লেও দেশের আলেম সমাজ তথা মাদরাসা শিক্ষিত মানুষ এসব অবক্ষয়-দুর্নীতি থেকে নিজেরাই শুধু মুক্ত থাকছেন না, সীমিত আয়ে অতি সাধারণ জীবন যাপনের পাশাপাশি অবক্ষয়, কুসংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ভ‚মিকা পালনে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকেও উদ্বুদ্ধ করছেন। শত শত বছর ধরে আমাদের সমাজে ইসলামের সুমহান আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রাখতে আলেম সমাজের এই অবদানের স্বীকৃতি রাষ্ট্রপক্ষ দেয়নি। আলেম সমাজের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভ‚মিকার ঐতিহ্যও ইতিহাসে অহবান থাকবে। স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী অতিবাহিত হলেও দেশের আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষার প্রতি এক ধরনের অবহেলা ও পিছিয়ে রাখার মনোভাবই দেখা গেছে। এদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যতিক্রমী ভ‚মিকায় দেখা যায়। শত বছরের দাবি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন থেকে শুরু করে মাদরাসা শিক্ষার প্রতি বিশেষ নজর এবং আলেম সমাজের ভ‚মিকার স্বীকৃতি তার উজ্জ্বল প্রমান।
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে দাঁড়িয়ে সংসদনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলাম ধর্ম ও দেশের আলেম সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে যে সব কথা বলেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। গত বুধবার সংসদে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, দেশের আলেম সমাজ তরুন শিক্ষার্থীদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের অপব্যাখ্যা করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী কর্মকান্ডে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে আলেম সমাজ অনন্য ভ’মিকা রাখছেন। তারা মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়তে সহযোগিতা করছেন। সরকার প্রধানের কণ্ঠে এই প্রশংসা ও স্বীকৃতি দেশের আলেম সমাজের ভুমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের মুখে একটি বড় চপেটাঘাত। দেশী-বিদেশী চক্র দেশের মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজের ভ‚মিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি ও মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছে। কওমী মাদরাসাগুলোকে জঙ্গিবাদের আখড়া বলে প্রচার চালানোর পাশাপাশি এসব বন্ধের জোরালো দাবি তুলেছিল চক্রটি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তাদের সে অপচেষ্ঠার মূলে কুঠারাঘাত। দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের সপক্ষে এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে সংঘটিত রহস্যজনক জঙ্গিবাদী ঘটনাগুলোর অভিযোগে দন্ডিত বা অভিযুক্ত কেউই মাদরাসা শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নয়। অথচ জঙ্গিবাদ প্রসারের কল্পিত অভিযোগ তুলে অনেকটা ঢালাওভাবেই কওমী মাদরাসাগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছিল। টেররিজম বা জঙ্গিবাদ একটি আন্তজার্তিক সমস্যা। আমাদের সমাজে এ সমস্যা ঢুকিয়ে দিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আলেম সমাজ, মাদরাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সে ফাঁদে পা দেননি। এটা দেশের জন্য অনেক বড় সাফল্য। তবে দেশের মানুষ এখন এক সর্বগ্রাসি সামাজিক অবক্ষয়, যুব সমাজের মাদকাসক্তি, নারী নিগ্রহ ও শিশু ধর্ষণের মত পাশবিক প্রবণতার শিকার হয়ে পড়েছে। দেশের আলেম সমাজ সারাদেশে ব্যাপক ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান শিক্ষা, কোরআনের অনুশাসন ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এ কাজে দেশের আলেম সমাজকে সম্পৃক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকেও নানা উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। বগুড়ায় আলেম সমাজের সাথে মতবিনিময় করতে গিয়ে এলিটফোর্স র‌্যাবের মহাপরিচালক কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। তথাকথিত জঙ্গিবাদকে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। সেই সাথে দেশের যুব সমাজের মাদকাসক্তির ভয়ানক চিত্রও তিনি তুলে ধরে বলেছেন, দেশের ৮০লাখ মাদকসেবী প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকার মাদক সেবন করছে। এ হিসেবে মাদকের খরচ দাড়ায় বছরে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি। মাদকের ভয়াল চিত্র এটি। তবে শুধুমাত্র আর্থিক খরচ দিয়ে মাদকের ক্ষতির হিসাব করা যায় না। সমাজে ক্রমবর্ধমান অপরাধ, খুন-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও মাফিয়া চক্রের সংঘবদ্ধ অপরাধী কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে রয়েছে মাদক। ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ মাদকের বিরুদ্ধে অনেক বড় প্রতিরোধমূলক ভ‚মিকা পালন করছে। সামাজিক অবক্ষয়, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং শিক্ষার মানহীনতা ও নৈতিকতার অবনমন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মাদরাসা শিক্ষাকে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের আলেম সমাজকে অবশ্যই সময়োপযোগি, দলনিরপেক্ষ ও ইতিবাচক ভ‚মিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শান্তি, সৌহার্দ্য, কল্যান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় অনুসাশন ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার আলোকে সমাজ গঠনের আলেম সমাজকে অধিকতর জনসম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেম সমাজের প্রতি উপযুক্ত সম্মান, প্রণোদনা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সরকারকে দিতে হবে।

ভাগ