পাটকল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক

“রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকছে না”-এই শিরোনামে একটি সংবাদ গত সোমবার দৈনিক লোকসমাজসহ দেশের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটির সূত্র স্বয়ং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। রোববার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর। এক ভার্চুয়াল সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো পাটকল রাখা হবে না। বর্তমানে যারা কর্মরত আছেন তাদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করা হবে। পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় চালানো হবে। মন্ত্রী এমন এক সময় এই বন্ধের ঘোষণা দিলেন যখন রাজপথে আন্দোলনরত শ্রমিকরা করোনার কারণে নিজেদের সংযত রেখে কর্মসূচি পালন করছেন। তারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে নিয়েছেন তা অবশ্য জানা যায়নি। অপরদিকে ,দেশে বিরাজমান করোনা পরিস্থিতির আতঙ্কিত সময়ে সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলো তাও পরিষ্কার হওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতার পর গত ৪৮ বছর ধরে পাটকল লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। ৪৮ বছরে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এভাবে বছর বছর লোকসান দেয়া সরকারের পে সম্ভব নয়। আমরা জানি না সরকারের এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহল কীভাবে নেবে। তবে এটুকু বলতে পারি সরকারের বেসরকারিকরণের এই সিদ্ধান্ত ডান বাম সব মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে এবং তা আন্দোলনের নতুন মাত্রা পেতে পারে। আর শ্রমিকরা এ সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এটা তাদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা এনে দিতে পারে। যার আলামত গতকালই দেখা গেছে পাটকল এলাকার রাজপথে। শ্রমিকরা সপরিবারে রাস্তায় নেমে এসেছে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। মন্ত্রী অবশ্য আন্দোলনরত শ্রমিকদের রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যেতে বলেছেন। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সংখ্যা ২৫টি এবং এতে স্থায়ী শ্রমিক আছে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন, আরো কিছু শ্রমিক আছে দৈনিক ও অন্যান্য চুক্তিভিত্তিক। তিনি শ্রমিকদের আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে পাওনা পরিশোধের কথা জানিয়েছেন। একই সাথে গত ২০১৪ সাল থেকে অবসরে যাওয়া ৮৯৫৪ জন শ্রমিকের পাওনাও পরিশোধ করা হবে এজন্য বাজেট থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি রয়েছে। অর্থাৎ ধরে নেয়া যায় এটিই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নীতির সাথে এই সিদ্ধান্ত সঙ্গতিপূর্ণ কি-না। তারা জাতীয়করণের পইে ছিলেন। অতীতে বিএনপি সরকার আদমজী জুটমিল ও বিএডিসিতে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক চালু করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তাদের বর্তমান মিত্ররা যে আন্দোলন করছিল তা তারা ভোলেনি। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত তারা কখনোই বেসরকারিকরনের কথা বলেনি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও রাখেনি। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চয় প্রশ্ন তুলতে পারে। অপরদিকে, এমন একটি সময় সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যখন দেশের গবেষকরা পাটের জীবাশ্ম আবিস্কারের পর সোনালী আশের বহুমাত্রিক ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত করেছেন। এ নিয়ে সরকারের প থেকে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। অধিক মুনাফার সরকারি পরামর্শে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়ে অধিকহারে পাটচাষে আগ্রহী হয়েছে। মাঠের পর মাঠ পাটের দোলায় কৃষকের স্বপ্ন দোল খাচ্ছে। মানুষ পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার ছেড়ে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছে। এমন একটি সময়ে হঠাৎ সরকারি পাটকল বন্ধের খবর তাদের জন্য, বিশেষ করে চাষি ও ব্যবসায়িদের জন্য মারাত্মক দুর্ঘটনার মতই হয়েছে। তারা মনে করছেন সরকারের সিদ্ধান্তটি পাট-শিল্পের জন্য চরম বিপর্যয়ের কারণ হবে। পাটচাষি, পাট ব্যবসায়ি ও পাট শ্রমিক সবাই মারাত্মক তিগ্রস্ত হবে। তির শিকার হবে পাটজাত পণ্যের উৎপাদকরা। আর নিঃস্ব হয়ে যাবে পাট শ্রমিকরা। তাদের আন্দোলন করোনা স্বাস্থ্য বিধি ভেঙে নতুন বিপদের জন্ম দিতে পারে। আমরা মনে করি, সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সময় ও সুযোগ রয়েছে। সব কিছু পর্যালোচনা করেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেযা সঠিক হবে। পাটকল বেসরকারি করার জন্য বরাদ্দের পাঁচ হাজার কোটি টাকা সরকারি বহাল রাখার কাজেই ব্যবহার করা হোক।

ভাগ