পাকিস্তানে বর্বরোচিত বোমা হামলা

আগামী ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী জনসভায় একের পর এক বোমা হামলায় মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে গত শুক্রবার দেশটির বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুন প্রদেশে। এতে বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির প্রার্থী নবাবজাদা সিরাজ রাইসানিসহ ১৩২ জন নিহত এবং ১২০ জন আহত হয়েছেন। সিরাজ রাইসানি নির্বাচনে পিবি-৩৫ (মাস্তুং) আসনের প্রার্থী ছিলেন। তিনি বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বোমা বিস্ফোরণের পরপর বেলুচিস্তানের হাসপাতালগুলোতে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়। হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে আইএস। বেলুচিস্তান বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড জানিয়েছে, সেখানে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। হামলায় প্রায় ২০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শহর বান্নুতে নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত অপর এক জনসভায় বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়েছেন। ধর্মভিত্তিক দল জেইউআই-এফ আয়োজিত এক জনসভা শেষে এ হামলা চালানো হয়। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমাবেশস্থলে একটি মোটর সাইকেলে স্বয়ংক্রিয় বিস্ফোরক ডিভাইসের মাধ্যমে দূর থেকে বিস্ফোরণটি ঘটানো হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার পেশওয়ারে এক জনসভায় আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় বিখ্যাত রাজনীতিবিদ হারুন বিলৌর নিহত হন। এতে আরো ২০ জন এবং ৬৯ জন আহত হন। হামলার দায় স্বীকার করেছে তেহরিক-ই-তালেবান।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পাকিস্তানে নির্বাচনী জনসভায় ধারাবাহিকভাবে বোমা হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা এবং আহত করা নৃশংসতম ঘটনা। এ ধরনের হামলার ঘটনাকে নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমরা নিহত ও আহতদের পরিবারকে সমবেদনা ও সান্ত¦না জানাই। যারাই এ ধরনের হামলা চালিয়েছে তাদের মধ্যে মানবিকতা ও মনুষত্ববোধ বলে কিছু নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন যেন দেশটির জনগণের ওপর এক ধরনের মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়েছে। নির্বাচনী জনসভাগুলো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি যদি চলমান থাকে তবে নির্বাচন পর্যন্ত তা কী ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তা বোধ করি ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। নির্বাচনে প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করার জন্য জনসভা করবে, প্রচারণা চালাবে-এটাই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে, জনসভাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে জনসাধারণ নির্বিঘে ও নিশ্চন্তে জনসভায় অংশগ্রহণ করতে পারে। পাকিস্তানে যেভাবে একের পর এক জনসভায় বোমা হামলা হয়েছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রæটি ও দুর্বলতা রয়েছে। তারা যদি সতর্ক ও অধিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হতো, তবে এ ধরনের বোমা হামালার ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যারা এ ধরনের নৃশংস হামলা চালিয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষকে হত্যা ও আহত করছে, তারা একবারও ভেবে দেখছে না, এ হামলায় কারা মারা যাচ্ছে। মতামতের বিরোধ থাকতেই পারে। তার মানে এই নয়, বোমা মেরে মানুষ মেরে ফেলতে হবে। এতে তাদের কি লাভ হচ্ছে? তারা কি একবারও ভেবে দেখছে না, যাদের হত্যা করা হচ্ছে, তারা মুসলমান। যেখানে সারাবিশ্বেই মুসলমানদের টার্গেট করা হচ্ছে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলমান নিশ্চিহ্ন করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছে, সেখানে যদি মুসলমান হয়ে মুসলমানকে হত্যা করা হয়, তবে তা তো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নীলনকশাকেই সমর্থন করা হয়। মুসলমান কর্তৃক মুসলমান হত্যার ঘটনায় তারাই তো খুশি হচ্ছে। তাছাড়া ইসলাম কি মানুষ হত্যা সমর্থন করে? এ বোধটুকু কি তাদের নেই? বর্বরোচিত হামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষ হত্যা করা, বিকৃত মনোবৃত্তির প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ইসলামের নামেই হোক কিংবা অন্য কোনো অজুহাতেই হোক, নির্দোষ, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামে এসব হত্যাকান্ড নিষিদ্ধ। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এরকম অন্যায় হত্যাকান্ড পাকিস্তানে হরহামেশাই ঘটছে। সেখানে প্রায়ই বোমা হামলা হয়ে থাকে। মসজিদ ও মাজার থেকে শুরু করে লোক সমাগমপূর্ণ এলাকায় বোমা হামলা চালানো হয়। এতে কেবল নিরীহ মানুষই মারা যায়। এ ধরনের ধারাবাহিক ঘটনা কোনো সভ্য দেশে ঘটতে পারে না।
পাকিস্তানকে এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা থেকে মুক্ত করতে না পারার ব্যর্থতা দেশটির সরকার ও প্রশাসনের উপরই বর্তায়। যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা যে নিজ দেশের জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা এসব নৃশংস বোমা হামলা ঠেকাতে না পারা থেকেই বোঝা যায়। দেশটির সরকার সন্ত্রাসীদের নির্মূলে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভয়াবহ হামলা, যাতে সাধারণ মানুষ নিহত হয় ও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না, পরিস্থিতি হিসাবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ থেকে উত্তরণে পাকিস্তান সরকারের উচিত দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক ঐক্যমতে পৌঁছানো। প্রশাসনকে এমনভাবে কার্যকর ও সক্ষম করে তোলা যাতে হামলার আগেই তা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, হামলাকারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এরূপ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যাতে কেউ বা কোনো গোষ্ঠী এরকম হামলা ও হত্যাকান্ড ঘটাতে সাহস না পায়। আমরা বোমা হামলায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

ভাগ