‘পচা’ নর্দার্ন জুটের শেয়ার দাম ১১৭১ টাকা!

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্সের ওপর ভিত্তি করে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘জেড’ গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে ‘এ’ গ্রুপে স্থান পায় সব থেকে ভালো কোম্পানি। মধ্যম সারির কোম্পানিগুলো থাকে ‘বি’ গ্রুপে। আর সব থেকে খারাপ কোম্পানিগুলোকে নিয়ে করা হয় ‘জেড’ গ্রুপ। ‘জেড’ গ্রুপে থাকা কোম্পানিগুলোকে ‘পচা’ কোম্পানি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে না পারা কোম্পানিগুলোর ঠিকানা হয় জেড গ্রুপে। একটি কোম্পানিকে জেড গ্রুপে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের একটি সতর্কবার্তাও দেয়া হয়। তা হলো ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই জেড গ্রুপের কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম থাকার কথা। ফলে শেয়ারের দামও কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তালিকাভুক্ত পাট খাতের কোম্পানি নর্দার্ন জুট সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে মোটা অঙ্কের লোকসানে পড়ে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারা কোম্পানিটির শেয়ার দাম এখন আকাশচুম্বী। এমনকি শেয়ারের দামের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায়ও স্থান করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে (৯ সেপ্টেম্বরের লেনদেন শেষে) কোম্পানিটির শেয়ার দাম দাঁড়িয়েছে ১১৭১ টাকায়।
পচা কোম্পানির শেয়ারের এমন দামে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে না পারা একটি কোম্পানির শেয়ার দাম হাজার টাকার ওপরে থাকা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। এর পেছনে কোনো চক্র আছে কি না তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। কারণ নর্দার্ন জুটের শেয়ার সংখ্যা খুবই কম। কয়েকজন সিন্ডিকেট করে সহজেই এ কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ানো সম্ভব। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, লোকসানের কবলে পড়ে সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারলেও ২০১৮-২০১৯ হিসাব বছরের ব্যবসায় নর্দার্ন জুট চমক দেখিয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১৮ টাকা ১২ পয়সা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছিল ১০ টাকা ৩৮ পয়সা।
গত ১৭ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোম্পানি এই আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দাম গত বছরের অক্টোবর থেকেই বাড়ছে। অক্টোবরের শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৩২৫ টাকায়। যা টানা বেড়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ১৪৬০ টাকায় পৌঁছে যায়। তবে এরপর শেয়ারের দাম কিছুটা কমতে থাকে। একপর্যায়ে ২৩ জুলাই শেয়ার দাম কমে ৯১৭ টাকায় চলে আসে। অবশ্য এরপর আবার শেয়ারের দাম বাড়া শুরু হয়। অনেকটা টানা বেড়ে ৫ সেপ্টেম্বর শেয়ারের দাম ১২৬৮ টাকায় চলে আসে। তবে সোমবার আবার দাম কিছুটা কমে ১১৭১ টাকায় নেমে এসেছে। এরপরও কোম্পানিটির শেয়ার এখনও দামের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। এমনকি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর মতো ভালো কোম্পানির শেয়ারের থেকেও নর্দার্ন জুটের শেয়ার দাম বেশি।
দামের দিক থেকে নর্দার্ন জুটের নিচে থাকলেও শেষ চার বছরে একবারের জন্যও পাঁচশ শতাংশের নিচে লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো। অপরদিকে সর্বশেষ বছরে কোনো লভ্যাংশ না দিয়ে নর্দার্ন জুট জেড গ্রুপে স্থান করে নিয়েছে। শুধু শেষ হিসাব বছরেই নয় কোম্পানির লভ্যাংশের অতীত ইতিহাসও খুব একটা ভালো না। নর্দান জুট এযাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ লভ্যাংশ দিয়েছে ২০১৭ সালে। বছরটিতে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ২০ শতাংশ নগদ ও ২০ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দেয়। কোম্পানিটি থেকে তার আগের বছর ২০১৬ সালে ৫ শতাংশ নগদ, ২০১৫ সালে ২০ শতাংশ নগদ এবং ২০১৪ সালে ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ পায় শেয়ারহোল্ডাররা।
এদিকে শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম হলেও গত ছয় মাসে কোম্পানিটির বিষয়ে সতর্কতামূলক কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। তবে চলতি বছরের ২৪ মার্চ কোম্পানিটির বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে ডিএসই। ওই সময় কোম্পানির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিএসই জানায়, নর্দার্ন জুটের শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ছে। এর জন্য কোম্পানিটির অপ্রকাশিত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, নর্দার্ন জুটের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ মাত্র দুই কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ২১ লাখ ৪২ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ১৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। বাকি ৮৪ দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ারই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশিদের কাছে কোম্পানিটির কোনো শেয়ার নেই।

ভাগ