‘নুসরাত হত্যা মিশনে অংশ নেয় ৫ জন’

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা মিশনে অংশ নেয় পাঁচজন।
সোমবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পদির্শক (ওসি) মো. শাহ আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে মামলার অন্যতম আসামি মুকছুদ আলমকে ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ আদেশ দেন।
কোর্ট ইনসপেক্টর গোলাম জিলানী জানান, নুসরাত হত্যা মামলার ৪ নম্বর আসামি পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলমকে আদালতে তুলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পদির্শক (ওসি) মো. শাহ আলম ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত তাকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
আলোচিত এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। তার মধ্যে ৯ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালত নূর হোসেন, কেফায়াত উল্যাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামের পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পরদিন ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদদৌলাকে সাতদিন, আবছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক। ১১ এপ্রিল উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ। ১৩ এপ্রিল শনিবার মামলার আরেক আসামি জাবেদ হোসেনকে সাতদিনের রিমান্ড দিয়েছেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন।
এদিকে রোববার রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে মামলার অন্যতম আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামিম। জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নির্দেশে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে বলে স্বীকার করেছে।
হত্যা মিশনে অংশ নেয় পাঁচজন
নুসরাত জাহান রাফিকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অংশ নেয় ৫ জন, এদের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজনকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পিবিআই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পদির্শক (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, সরাসরি ক্লিলিং মিশনে অংশ নেয় ৫ জন, অন্যরা তাদের সহযোগিতা করে। এদের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি একজনকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পিবিআই।
অপরদিকে নুসরাত হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফেনীতে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে। সোমবার বিকেলে ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা শাখা।
সুজনের ফেনী জেলা সভাপতি এডভোকেট লক্ষণ চন্দ্র বনিকের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রহমান বিকম, ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বিমল কান্তি পাল, ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজী আলাউদ্দিন, ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজুল ইসলাম হাজারী, ফেনী চেম্বারের পরিচালক গোলাম ফারুক বাচ্চু, শিক্ষক নেতা মহিউদ্দিন খোন্দকার, কবি ইকবাল চৌধুরী, ফিরোজ আলম, অধ্যক্ষ এম মামুনুর রশিদ, বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ প্রমুখ।
এসব মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুল সংখ্যক লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
সকালে শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে। এসময় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হানিফ ভূঞা মহসিন, স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত উল্যাহ, সিনিয়র শিক্ষক জিন্নাতুর নাহার, শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন এলমা প্রমুখ।
এছাড়া দুপুরে জেলা জজ আদালত চত্বরে মানববন্ধন করে জেলা আইনজীবী সমিতি। এসময় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্যাহ চৌধুরী স্বপন, বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু প্রমুখ বক্তব্য দেন।
মানববন্ধনে আইনজীবীরা বিবাদী পক্ষে মামলা পরিচালনায় কেউ অংশ না নেয়ার অনুরোধ জানান।
টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ১০ এপ্রিল বুধবার রাত ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যায় অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে বিকেলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
উল্লেখ্য, ৬ এপ্রিল শনিবার সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠী নিশাতকে ছাদের উপর কেই মারধর করেছে এমন সংবাদ দিলে সে ওই বিল্ডিংয়ের তিন তলায় যায়। সেখানে মুখোশপরা ৪/৫ জন ছাত্রী তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। সে অস্বীকৃতি জানালে তারা গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ ৮ জনের মান উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামালা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।
এর আগে ২৭ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নীপিড়নের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে আটক করে পুলিশ। এর পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

ভাগ