নুসরাত ক্ষমা করে দিস, মা আমার

প্রভাষ আমিন
৮৫ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে, এভাবে সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে মমির মতো কষ্টকর বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। নুসরাত প্রিয় বোন আমার, প্রিয় কন্যা আমার, তোমার এমন বেঁচে থাকাটাই আমার জন্য কষ্টকর ছিল। নুসরাত তুমি আমার কন্যারই মতো, কন্যারই বয়সী। প্রতিবার পানি খেতে গেলে আমার মনে হতো, আহারে আমার মেয়েটা পানি খেতে চেয়েও পায়নি। আমি যখন হাত পা ছুড়ে প্রতিবাদ করি, মনে হয়, ইশ, আমার মেয়েটা হাতের ব্যান্ডেজটা খুলে দিতে বলেছিল। কিন্তু উপায় ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তোমাকে সিঙ্গাপুর পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগও তুমি দাওনি। আমি জানি তুমি বড্ড কষ্ট নিয়ে গেছো। তবে শরীরের কষ্টের চেয়েও নিশ্চয়ই অপমানের জ্বালা অনেক বেশি ছিল, গোটা পৃথিবীর প্রতি অভিমান অনেক তীব্র ছিল। নুসরাত মা আমার, আমি জানি তোমার কোনও অপরাধ ছিল না। তোমার একটাই অপরাধ, তুমি সাহসী, তুমি প্রতিবাদী। সিরাজ-উদ-দৌলার লালসার কাছে, প্রলোভনের কাছে তুমি ধরা দাওনি। তোমার অপরাধ তুমি আরও অনেক মেয়ের মতো নারীত্বের অপমানটা তুমি মুখ বুজে সয়ে যাওনি। তুমি প্রতিবাদ করেছিলে, মামলা করেছিলে। সে মামলায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাতেই তুমি আঁতে ঘা দিয়েছিল, এই নোংরা সমাজের। তারা মেনে নিতে পারেনি, চমকে গেছে; পুঁচকে একটা মেয়ের কত বড় সাহস একজন পুরুষের বিরুদ্ধে মামলা করে; কত বড় বেয়াদব, একজন সম্মানিত অধ্যক্ষের চরিত্রে কালিমা লেপন করে। এই মেয়ে জানে না, পুরুষদের স্বভাব একটু এমনই। একটু ছোক ছোক করবে, লোভ দেখাবে, ‘চান্স’ নিতে চাইবে। সতীপনা দেখিয়ে ‘চান্স’ দিবি না ভালো কথা; তাই বলে এই কথা রাষ্ট্র করে সবার মান-সম্মান ডোবাতে হবে।
ধর্ষকামিতাকে যারা পুরুষের স্বভাব বলে আড়াল করতে চায়, তোমার প্রতিবাদ তাদের মুখে প্রবল চপেটাঘাত। পুরুষদের ধোয়া তুলসি পাতা বানিয়ে যারা দিনের পর দিন মেয়েদের মুখ বন্ধ রাখতে চায়– তোমার মামলা তাদের বুকে প্রচণ্ড লাথি। আমরা যারা প্রতিদিন আপস করে করে কোনোরকমে জীবনটাকে বয়ে বেড়াচ্ছি; তোমার রুখে দাঁড়ানো, তাদের টনটনে বিবেকে উপর্যুপরি উষ্ঠা। তোমার সাহস দেখে যৌন নিপীড়ক সিরাজ-উদ-দৌলার লোকেরা চমকে গেলেও দুর্বল হয়নি। একটি যৌন নিপীড়কের মুক্তির দাবিতে সোনাগাজীতে মানববন্ধন হয়েছে; এ গ্লানি সোনাগাজীর মানুষ ঘুচাবে কী দিয়ে? তারা মানববন্ধন করে, ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে তোমাকে মচকাতে চেয়েছিল; কিন্তু পারেনি। মচকাতে না পেরে তারা পরিকল্পনা করে তোমাকে ভেঙে ফেলার। ঝুঁকিটা তুমি জানতে, তবুও ভয় পাওনি। তোমার বন্ধুকে ছাদের ওপর মারছে শুনেই তুমি ছুটে গেছো। গিয়েই আটকেছো চার হায়েনার ফাঁদে। বোরকায় শরীর ঢেকে, মুখোশে পরিচয় আড়াল করে চার হায়েনা তোমাকে মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তুমি একচুলও সরে আসোনি। তারা যখন বুঝে গেলো তুমি কিছুতেই টলবে না, তখনই চূড়ান্ত আক্রমণ। তোমার হাত বেঁধে, তোমার শরীরে কেরোসিন ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে তোমাকে পালাতে বলে। এখানে এসে পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়, সভ্যতা আটকে যায়, মানবতা লুণ্ঠিত হয়। আমার কল্পনা বারবার হোঁচট খায় এখানে এসে। ডাইং ডিক্লারেশনে তুমি শম্পা নামে একজনের নাম বলেছো। নারী হোক আর পুরুষ, মানুষের মতো দেখতে চারটি প্রাণী; একটা বাচ্চা মেয়ের হাত বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবে; এই নিষ্ঠুরতা আমার কল্পনায় কাভার করে না। নিষ্ঠুরতা বোঝাতে আমরা পশু লিখি, হায়েনা লিখি, প্রেত লিখি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, মানুষের চেয়ে নিষ্ঠুর কোনও প্রাণী নেই। কোনোদিন দেখেছেন, হায়েনা দূরে থাক; চারটি বানর মিলে আরেকটি বানরকে পুড়িয়ে মারছে? এ নিষ্ঠুরতা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
পাঁচদিন যমে-মানুষে টানাটানিতে মানুষ আবার হারলো। চলে গেলে তুমি। এ পাঁচদিন আমি সবই করেছি- খেয়েছি, ঘুমিয়েছি, অফিস করেছি টকশো’তে তোমাকে নিয়ে কথা বলেছি, তোমাকে নিয়ে লিখেছি। স্বাভাবিকের মতো আচরণ করেছি বটে,তবে আমি পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিলাম না। যখনই ভেবেছি, চারটা দোপেয়ে পরীর মতো একটা মেয়ের হাত বেঁধে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। আমার পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়। যখনই জানি, মেয়েটা পানি খেতে চায়, আমার গলা দিয়ে পানি নামে না। যখনই শুনি, মেয়েটা হাতের ব্যান্ডেজ খুলতে চায়, আমি আরো কুঁকড়ে যাই। আহারে মেয়েটা আমার, শেষ সময় চোখের সামনে পৃথিবীর কুৎসিৎ রূপটা দেখে গেলো। তোমার শেষ সময়ের স্মৃতি, পিতার আসনে বসানো শিক্ষকের অশ্লীল হাত তোমার দিকে আসছে। তুমি দেখে গেলে শিক্ষক নামের সেই কলঙ্কটার মুক্তির দাবিতে তোমার এলাকায় মানববন্ধন হয়। তোমার শেষ স্মৃতি চার ভয়ঙ্কর কালো প্রাণী তোমার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। তুমি জেনে গেলে, এ দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা পাপ। করলে আগুনে পুড়ে মরতে হয়।
তোমাকে একটা বাসযোগ্য পৃথিবী দিতে পারিনি, এটা অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা। নারী হিসেবে তোমার চলাফেরা নিরাপদ করতে না পারাটা অবশ্যই আমাদের দায়। যে মাদ্রাসায় তুমি শিখতে গিয়েছিলে পড়া, নৈতিকতা আর ধর্মীয় মূল্যবোধ; সে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের লালসার আগুন থেকে বাঁচাতে না পারাটা অবশ্যই আমাদের জন্য গ্লানির। কিন্তু মা বিশ্বাস কর, তুই যতটা খারাপ ভেবে গেছিস, পৃথিবীটা তত খারাপ নয়। সিরাজ-উদ-দৌলা আর অনুসারীদের নিষ্ঠুরতা যেমন সত্যি, কোটি মানুষের ভালোবাসাটাও মিথ্যা নয়। তুই কি ওপার থেকে দেখতে পাচ্ছিস না, গোটা বাংলাদেশ আজ তোর জন্য কাঁদছে। ঘৃণা নয়, ভালোবাসাই পৃথিবীর শেষ কথা। তোকে বাঁচাতে পারিনি। আসলে চাইইনি ৮৫ ভাগ পোড়ার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে তুই বেঁচে থাক। মৃত্যু তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তবে তোকে কথা দিচ্ছি, তোকে হারানোর শোককে আমরা শক্তিতে পরিণত করবো। তোর কাছ থেকে সাহস ধার নিয়ে আমরা সাহসী হবো। আরো বেশি করে প্রতিবাদ করে বুঝিয়ে দেবো, এ বিশ্বে প্রতিবাদ করা অন্যায় নয়। প্রতিবাদ করলেই পুড়ে মরতে হবে, এ ধারণা বদলে দেবো আমরা। তোর প্রতি হওয়া প্রতিটি অন্যায়ের, প্রতিটি নিষ্ঠুরতার বিচার চাইবো আমরা। যে সিরাজ-উদ-দৌলার নোংরা হাত তোকে ছুঁয়েছে, তার বিচার চাইবো। যারা সিরাজ-উদ-দৌলার মুক্তি চেয়ে মানববন্ধন করেছে,তাদের প্রত্যেকের বিচার চাইবো। যারা তোর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, তাদের নিষ্ঠুরতম শাস্তি চাইবো। যে পুলিশ তোর অগ্নিদগ্ধ হওয়াকে আত্মহত্যা বলে সন্দেহ করেছে, তার বিচার চাইবো। বিশ্বটাকে সবার জন্য আরও বাসযোগ্য করার চেষ্টা করে যাবো। সব মানুষের জন্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য বিশ্বটাকে আরও নিরাপদ করার চেষ্টা করে যাবোই। বিশ্বাস করো, এর কিছুই আমরা তোর জন্য করবো না। এখন আর এসবে তোর কিছু যায় আসেও না। আমরা করবো, আমাদের প্রতিবাদহীন জীবনকে একটু গ্লানিমুক্ত করতে, রাতের বেলা বিবেক এসে খোঁচাখুঁচি করে যেন আমাদের ঘুম নষ্ট করতে না পারে; সেজন্যই এত চেষ্টা। প্লিজ নুসরাত লক্ষ্মী মা আমার, ওপারে তুই ভালো থাকিস। আর পারলে আমাদের অক্ষমতাকে ক্ষমা করে দিস।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

ভাগ