নীতিমালা হোক উৎপাদকের স্বার্থরক্ষায়

এবার সরকারী ক্রয়নীতি অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত করতে খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে সারাদেশের কৃষকদের ডিজিটাল ডাটাবেজ। অতঃপর ধান-চাল-পাট কেনার ব্যবস্থা করা হবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে। খাদ্যমন্ত্রীর প্রত্যাশা, এতে অন্তত ৬০ ভাগ দুর্নীতি কমবে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে দেশে প্রচলিত সরকারী খাদ্য সংগ্রহ ও বিপণন নীতিমালা ত্রুটিপূর্ণ। যে কারণে এেেত্র ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অনুপ্রবেশ ঘটে। দেশে এবার গত দশ বছরের মধ্যে ধান-চালের বাম্পার উৎপাদন হওয়ায় সামনে এসেছে বিষয়টি। খুচরা বাজারে ধান-চালের ন্যায্য দাম না পেয়ে একদিকে কৃষকের মাথায় হাত দিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে এর ব্যাপক সুযোগ নিয়েছে ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী, চাতাল ও মিল মালিকরা। এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে এক শ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী। সরকার দরিদ্র কৃষকের স্বার্থে প্রতি বছর ধান-চাল-পাট চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও উৎপাদক শ্রেণী এই দাম কখনই পান না ফড়িয়াদের কারণে। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কখনই মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল-পাট কেনেন না নানা অজুহাতে। ফলে তাদের পথে বসার উপক্রম ঘটে প্রায়ই। সরকার তথা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের কৃষক প্রায়ই এর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। কেননা সরকার ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য বেঁধে দিলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের লোকজন কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনে না। বরং তাদের সমধিক আগ্রহ মধ্যস্বত্বভোগী ও চাতাল মালিকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনায়। ুদ্র কৃষকদের ধানে নাকি আর্দ্রতা বেশি, যেটি থাকা স্বাভাবিক। শুকানোর জন্য তারা ধান সংগ্রহে রাখতে পারে না। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে বিক্রি করে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাতালের মালিক এবং মোকামে। ফলে সরকার নির্ধারিত ধান-চালের নায্য সংগ্রহ মূল্যও তারা পান না কখনই। বাস্তবতা হলো, দেশে গত কয়েক বছরে ধান-পাট-ফলমূল-শাক-সবজি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, চা, চামড়া ইত্যাদির উৎপাদন বাড়লেও ত্রুটিপূর্ণ মার্কেটিংয়ের কারণে কৃষক ও উৎপাদক শ্রেণী প্রায়ই বঞ্চিত হয় ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে। গত বছর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘ফুড এ্যান্ড এগ্রিকালচার ইকোসিস্টেম’ শীর্ষক এক সেমিনারে কৃষি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে এই তথ্য। এটি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক যে, স্বাধীনতার ৪৮ বছর হতে চললেও অদ্যাবধি আমরা একটি সমন্বিত ও আধুনিক কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে একদিকে উৎপাদিত ফসল ও পণ্যদ্রব্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক, অন্যদিকে সে সব পণ্য উচ্চমূল্যে কিনতে হয় ভোক্তা তথা ক্রেতাসাধারণকে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আরও উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। এর পাশাপাশি নজর দেয়া উচিত বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরণে। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদেরও উচিত হবে, জনসাধারণ ও সরকারকে জিম্মি কিংবা না কারসাজি করে আস্থায় নিয়েই ব্যবসা করা। তদুপরি দেশে ধান-চাল পাট-চামড়াসহ কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত একটি আধুনিক ও সমন্বিত মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরী ও অপরিহার্য। আমরা চাই নতুন, খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালায় যেন এর প্রতিফলন যেন স্পষ্ট থাকে এবং নীতিমালা যেন হয় উৎপাদকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে।

ভাগ