নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার অভিযোগ এনে ২৪ ঘণ্টায় যশোরে সরে দাঁড়ালেন তিনজন প্রার্থী

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাত্র দুদিন আগেই সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার অভিযোগ এনে যশোরে একে একে তিন জন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এসব প্রার্থী শেষ মুহূর্তে ভোটের পরিবেশ না থাকার অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দেন। এ প্রার্থীরা সকলে আলোচিত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন।
সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়া প্রার্থীরা হলেন- যশোর-৬ কেশবপুর আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হালিম, যশোর-৫ মনিরামপুর আসনের তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) আ.ন.ম. মোস্তফা বনি ও যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের বিএনএম-এর প্রার্থী সুকৃতি কুমার ম-ল।
আর বাকি যেসব স্বতন্ত্রপ্রার্থী বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মাঠে আছেন তাদের অনেকেই সরকার দলের মনোনীত নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলছেন।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এমন প্রার্থীদের অভিযোগ, ভোটে সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব, ক্ষমতাসীনদের পেশীশক্তির প্রভাব, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, হুমকি, টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটছে ইত্যাদি।
শুক্রবার দলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনের তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) আ.ন.ম. মোস্তফা বনি। দুপুরে প্রেস ক্লাব যশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তৃনমূল বিএনপি থেকে মনোনীত প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার শুরু থেকেই অত্যন্ত হীনমন্যতায় ভুগছি এবং আত্মদহনে দগ্ধ হচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে দেশে বর্তমানে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। তৃণমূল বিএনপি একটি অত্যন্ত কৃষকায়, তলাবিহীন ঝুড়ির মতো দল। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার জন্য সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে এমন একটি দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অত্যন্ত বেমানান এবং অমর্যাদাকর। তাছাড়া দেশের বিরাজমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা কতটুকু সমীচীন হবে, একজন বিবেকবান মানুষ হিসাবে সে বিষয়ে আমি যথেষ্ঠ সন্দিহান। দেরিতে হলেও এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তৃণমূল বিএনপির সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন ও যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি
সংবাদ সম্মেলনে তার সাথে ছেলে আবদুল ইয়াসিন, মেহেদী ইমরান নামে তার ব্যক্তিগত সহকারী উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়া ও ভোটারদের ভোটে অংশগ্রহণে আগ্রহ না থাকা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের রহস্যজনক ভূমিকার অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন একই আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এমএ হালিম। রাত আটটার দিকে উপজেলার গোপালপুর এলাকায় নিজ বাসভবনে তিনি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে এ ঘোষণা দেন।
এর একদিন আগে বুধবার প্রেস ক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের বিএনএম-এর প্রার্থী সুকৃতি কুমার মন্ডল। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে নোঙর মার্কার প্রার্থী সুকৃতি কুমার মন্ড বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগের ছেলে-মেয়ে আর নাতিপুতি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। তারা ওই মেজবানে আমাকে দাওয়াত দিয়েছিল। আমিও সাদরে গ্রহণ করি। কিন্তু এসে দেখি খাওয়া-দাওয়া শেষ। ভদ্রলোক হিসেবে কাউকে কিছুু বলতে পারি না। তাই নীরবে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। এসময় তিনি বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেন।
এদিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত দলের যেসব নেতা স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মাঠে এখনো আছেন তারাও নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে দাবি করছেন। যশোর সদর-৩ আসনের স্বতন্ত্রপ্রার্থী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ঈগল প্রতীকের প্রার্থী মোহিত কুমার নাথ প্রচারণার শেষ সময়ে এসে সাংবাদিকদের জানান, যশোর সদর আসনে ১০ থেকে ১৫টি আসন প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ। এসব আসনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী কাজী নাবিল আহমেদের লোকজন ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের ওপর বলপ্রয়োগ করতে পারে। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা রিটার্নিং অফিসারকে জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান। একই দিন মোহিত নাথের প্রচারণা সভায় সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আরবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহারুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আছে ভোটে প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য নাবিল সাহেবের লোকজন হকিস্টিক বানাচ্ছে, তবে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে হকিস্টিক দিয়ে কোনো কিছু করতে দেওয়া হবে না’।
অন্যদিকে কর্মী সমর্থকদের মারধর, হুমকি ধামকির অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম লিটন। তিনি দাবি করেছেন নৌকার প্রার্থী ও তার সমর্থকদের কারণে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। নির্বাচনের দিন যত নিকটবর্তী হচ্ছে ততই হুমকি ধামকির পরিমাণ বাড়ছে। শুক্রবার বিকেল ৪টায় প্রেস ক্লাব যশোরে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গোগা ইউনিয়নের নৌকা প্রার্থীর সমর্থক তরিকুল মেম্বার পুটখালী ইউনিয়নের জসিমের নেতৃত্বে এবং উলাশী ইউনিয়নে সন্ত্রাসী আয়নাল ও মিলন বাহিনীর লোকজন আমার পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেবে না বলে হুমকি দিচ্ছে। এছাড়া লক্ষণপুর ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান কামাল ও সামছুর রহমানের নেতৃত্বে আমার সমর্থক ইসমাইল হেসেন খোকন, শাহাজানসহ অনেক কর্মীকে মারধর করা হয়েছে। পোলিং এজেন্টদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, বেনাপোল পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে আমার নেতাকর্মীদের নানাভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। এ অবস্থায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তার সাথে উপস্থিত ছিলেন শার্শার সাবেক উপজেলা চেয়াম্যান আব্দুল মান্নান মিনু, আওয়ামী লীগ নেতা মাস্টার আহসান উল্লাহ, শহিদুল ইসলাম, ইলিয়াস আজম।
নির্বাচন থেকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিত সরকারের আশীর্বাদপূষ্ট এসব প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর ঘোষণায় সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
অন্যদিকে শুক্রবার সকালে প্রেস ক্লাব যশোরে পৃথক আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করেন যশোর-৩ আসনের ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি মনোনীত আম প্রতীকের প্রার্থী সুমন কুমার রায়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় চলমান নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরও আমরা সরকারের কাছে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি নির্যাতন হয়েছে। এর একটি ঘটনারও বিচার করেনি বর্তমান সরকার। তাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনদের বর্তমান সরকারের প্রতি কোনো আস্থা নেই। আশা করি ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজর এর দাঁতভাঙা জবাব দেবে।

 

 

Lab Scan