নাগরিক অধিকারের বর্তমান হাল

0
তৈমূর আলম খন্দকার
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজ থেকেই সভ্যতার সৃষ্টি। কৃষ্টি ও সংস্কৃতি একটি সমাজের ধারক ও বাহক। জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক ওতপ্রতোভাবে জড়িত। জীবিকার সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহ পর্যন্ত মানবজাতি পরিভ্রমণ করছে। জীবিকা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হতে পারে। কারো কাছে যে জীবিকা বৈধ, অন্যোর নিকট তা আবার অবৈধ। জীবনের নিরাপত্তা ও জীবিকার স্বচ্ছতা প্রভৃতি মিলিয়ে মানুষকে একটি শৃঙ্খলায় আনার জন্যই একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, যার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানসহ জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করা।
জীবন জীবিকার সার্বিক নিরাপত্তা বলতে একজন নাগরিকের সম্মান নিয়ে বাঁচার নিরাপত্তাসহ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদন, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, মতপ্রকাশসহ চিন্তা, চেতনা, সংগঠন করার, রাজপথে শোভাযাত্রা করাসহ যেকোনো প্রকার ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে জীবন ধারণের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্রের প্রয়োজন। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা নাই। ‘কাজীর গরু কিতাবে থাকার মতো যা প্রকৃতপক্ষে গোয়ালে নাই।’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-২৭ এ বলা হয়েছে যে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ বাস্তবতা কি তাই? বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে সব নাগরিক কি আইনের দৃষ্টিতে সমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে? রাষ্ট্র কি সংবিধানের মর্ম মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে? ভিন্নমতের মানুষ কি ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে তাদের মত প্রকাশ করতে পারছে? বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুফল কি সবার জন্য সমান দৃষ্টিতে ভোগ করার সুযোগ সরকার দিচ্ছে? এসব প্রশ্ন এখন সব স্বাধীনতাকামী মানুষের বিবেকের তাড়না দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য কি শুধুমাত্র একটি শ্রেণীর জন্য প্রাপ্য। মুখভরা বুলি নিয়ে প্রচার হচ্ছে যে, বাংলাদেশের মানুষের মাথা পিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধারণাটি কি সবার জন্য প্রযোজ্য? মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির আওতায় কি সাধারণ গণমানুষের অংশীদারিত্ব রয়েছে? প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে এক শ্রেণীর মানুষ যারা সরকারি ঘরানার মধ্যে রয়েছে তারাই একতরফাভাবে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে। সাধারণ মানুষ হারিয়েছে সাংবিধানিক অধিকার। সরকারি অফিস আদালতে ভিন্ন মতাবলম্বীদের কোনো স্থান নেই বরং সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে শুরু হয় নানাবিধ চাপপ্রয়োগ কৌশল, বলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহী, দেয়া হয় পাকিস্তানি রাজাকার বা দালাল উপাধি।
পাকিস্তান আমলেও নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যেভাবে নাগরিকদের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে, সে অবস্থা স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার আমলেও ছিল না। সরকার যাতে জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে তার জন্য সংবিধানে কিছু রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ‘স্বাধীন’ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু হালে সেই কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারি দলের একটি অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে কলমে ‘স্বাধীন’ হলেও বিবেকের দিক থেকে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে না। ফলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকার শপথ নিয়ে তারাও মানসিক দাসত্ব করে রাষ্ট্রীয় বেতনভাতা, গাড়িবাড়ি ভোগসহ সর্বোপরি ক্ষমতা প্রয়োগ করছে যাতে আপামর জনগণের অধিকার রক্ষার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ভিন্ন মতের নাগরিকরা যদি ক্ষমতাসীনদের দাপটে তটস্থ থাকতে হয় তবে সেখানে স্বাধীনতার চেতনা বা গণতন্ত্রের ‘গ’ পর্যন্ত থাকে না। সংবিধানের ‘প্রস্তাবনা’র তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ কিন্তু সংবিধানের ওই প্রস্তাবনার সফল বাস্তবায়ন কোথায়? প্রস্তাবনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন। ভিন্ন মতের নাগরিকগণ কি আইনের শাসনে সুবিধা ভোগ করতে পারছেন? আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো কি সব নাগরিকদের আইনের দৃষ্টিতে সমান চোখে দেখেন? ক্ষমতাসীনরা ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন করে, মাইর দিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে পুরে রাখে সে অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কি ন্যায়বিচার পায়? সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীনদের সাথে যে মোলায়েম সুরে কথা বলে অনুরূপ ব্যবহার কি বিরোধী দলের সাথে করেন? আমলারা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সাথে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যবহার করে। মোট কথা বেতন খায় ১৮ কোটি আপামর জনগণের উপার্জিত অর্থ থেকে, অথচ পারপাস সার্ভ করে ক্ষমতাসীনদের। কারণ ক্ষমতাসীনদের হাতে রাখতে পারলে টু পাইস ইনকামে নিরাপত্তা থাকে, দুদকও তখন কাছে আসে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতজন দুদকের আওতায় এসেছেন। তবে তারা কি সবাই দুধের ধোয়া তুলসী পাতা। সরকারি সব দফতরেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। এমন কি ট্রান্সফার ও প্রমোশনেও ঘুষ দিতে হয়, যা এখন ওপেন সিক্রেট।
এনবিআর বলে যে, ট্যাক্স আদায়ের টার্গেট পূরণ হয় না। ব্যবসায়ী ও জনগণ ট্যাক্স দিতে চায়, কিন্তু ট্যাক্স অফিসের কর্মচারী ও অফিসারদের একটি অংশের হয়রানির কারণে সাধারণ মানুষ কর প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। ট্যাক্স অফিসে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ না দিলে কর্মকর্তারা করদাতার ওপর মোটা অঙ্কের কর বসিয়ে দেয়। ফলে করদাতা জনগণ কর প্রদানের বিষয়ে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের স্বভাব জাত ধর্ম হচ্ছে ‘ক্ষমতার’ পূজা করা, বিবেকের নয়। অর্থাৎ কোনো বিষয় এখন আর মানুষ বিবেক দিয়ে বিচার করতে চায় না, বরং কোন কথা বললে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি খুশি হবে সেভাবেই নিম্নপদস্থরা প্রতিবেদন প্রদান করে। সত্যকে প্রকাশ করা নয়, বরং কর্তাকে খুশি রাখাটাই যেন এখন প্রশাসনিক সংস্কৃতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে ক্ষমতায় থাকে তার কোনো সমালোচনা নেই, বরং কার চেয়ে কে বেশি কর্তাব্যক্তির প্রশংসা করতে পারে সে প্রতিযোগিতাই এখন চলছে। সরকারি বা রাজনৈতিক সভাগুলোও কর্তাব্যক্তির মনমর্জির ওপর সব দায়িত্ব অর্পণ করে সভা সমাপ্ত করে। বিবেক থেকে এমন কোনো প্রস্তাব বা আলোচনার সূত্রপাত করে না যাতে সভা প্রধান মাইন্ড করতে পারে, সমস্যার সমাধানে কোনো তর্কবিতর্ক নয় বরং প্রধান কর্তাব্যক্তি প্রশংসা করা ও শোনার উদ্দেশ্যেই যেন মিটিং ডাকা হয়। সাদাকে সাদা বলার বা কালোকে কালো বলার মানসিকতা যখন মানুষ হারিয়ে ফেলে তখনই শুরু হয় সামাজিক বিপর্যয়। অন্য দিকে মানসিক রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সন্তানকে খুন করে নিজে আত্মহত্যার ঘটনাও সমাজে আরো বিপর্যয় ডেকে আনছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে, বস্তিবাসীদের সাথে পাল্লা দিয়ে ধনীর দুলাল, দুলালীরা মাদকে আসক্তি হয়ে পড়েছে। সরকার কোনোভাবেই মাদককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একটি অংশ মাদক ব্যবসার কারণে কারাবন্দী রয়েছে। টেকনাফের ওসি প্রদীপ এবং চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ যদি হয় সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উচ্চ পদস্থদের নমুনা, সেখানে মাদকের প্রসার বন্ধ হবে কিভাবে?
রাষ্ট্র একটি শক্তির উৎস। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো চালিকাশক্তি নেই, রাষ্ট্রকে যারা পরিচালনা করে তারাই রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশের জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সংবিধানের ৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “(১) প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তা হলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ সংবিধানে প্রদত্ত নির্দেশনা স্পষ্টই প্রকাশ পেয়েছে যে, রাষ্ট্রকে যারা পরিচালনা করেন তাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কিন্তু বর্তমানে যিনি লঙ্কায় যাচ্ছেন তিনিই রাবণের ভূমিকা পালন করছেন। ফলে সুবিধায় রয়েছে ক্ষমতাসীনরা এবং ভোগান্তিতে রয়েছেন ভিন্ন মতাবলম্বীরা যারা ক্ষমতাসীনদের জি হুজুর জাঁহাপনা বলে চলতে পারে না। সমাজে ও রাষ্ট্রে তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত যারা বিবেক থেকে কথা বলে, চামচামিতে মনোনিবেশ করে না। আর যারা বিত্তশালী তারাও সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। কারণ যারা ক্ষমতায় আসীন হয় তারাই বিত্তশালীদের পকেটস্থ হয়ে পড়ে।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
Lab Scan