নতুনের ভাবনা হোক নতুন

তুষার আবদুল্লাহ
ভোট কেমন হলো? এই প্রশ্নটি ৩০ ডিসেম্বর থেকে শুনে আসতে হচ্ছে। শুক্রবার বাজারে গিয়েও এই প্রশ্নের মুখে পড়েছি। কারও প্রশ্নের উত্তর দেইনি। প্রশ্নকর্তারা নিজেরাই মুচকি হেসে সরে গেছেন। আমার কাছ থেকে তারা হয়তো কোনও উত্তরও প্রত্যাশা করেননি। প্রশ্ন যারা করেছেন, তাদের অনেকেই পরিচিত। অপরিচিতরাও পথ আটকে জানতে চেয়েছেন। পরিচিত যারা, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কট্টর সমর্থক আছেন। আওয়ামী লীগের যারা, তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন– একটু বেশি হয়ে গেলো। এতটা ভাবিনি। বিএনপির কেউ বলেছেন ভোট দিতেতো যাওয়াই গেলো না। আবার এমন কথাও তারা বলেছেন–নেতারা মাঠে নাই, আমরা গিয়ে মরবো নাকি। পরিচিত শিক্ষকরা প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন। তাদের কাছে ৮০ ভাগ ভোট পড়ার গাণিতিক সমাধান জানতে চাইলাম। শিক্ষক হয়েও তাঁরা ওই অঙ্কের সমাধান দিতে পারেননি।
ফলাফল কী হলো, কিভাবে হলো আমি এনিয়ে ভাবছি না। আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করলো, বিএনপিও সরকার গঠন করতে পারতো। জাতীয় পার্টির বদলে বিএনপি বসতে পারতো বিরোধী দলের ভূমিকায়। এতে রাজনীতির জলবায়ুতে খুব পরিবর্তন আসতো বলে আমি মনে করি না। আমরা যদি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ এর সংসদ দেখি। সেখানে বিরোধী দলকে কতটা সময় অধিবেশন কক্ষে পেয়েছি আমরা? সরকারি দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত আইন, বাজেট নিয়ে কত সময় ব্যয় করেছেন? সকল পক্ষই অধিবেশন কক্ষে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত ছিল। সংসদ সদস্যরা প্রতিপাদ্য বিষয়ে কথা না বলে প্রতিপক্ষকে বিষোদগার করা এবং নেতা তোষনে ব্যস্ত ছিলেন। নিজেদের স্বার্থের লাভ-লোকসান নিয়ে সুবিধা মতো আবার এক সুরে কথাও বলেছেন। জনস্বার্থ কতটা সময় সংসদ সদস্যদের কণ্ঠে ছিল? ফলাফল যখন ভারসাম্য হারায়, তখন ক্ষমতায় আধিপত্য আসে। অধিবেশন কক্ষও এর বাইরে থাকেনি। বিরোধীপক্ষের মাইক বন্ধ হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকার সময়ে। এবার ভারসাম্য আরও নাজুক রূপ নিলো। জাতীয় পার্টি যদিও বলছে তারা সরকারে যাবে না, বিরোধী দলেই থাকবে। তাদের বিরোধী দলীয় আচরণ নিয়ে তারা নিজেরাই সন্দেহ প্রকাশ করেছে দশম সংসদে। সুতরাং তাদের এবারের পারফরমেন্স নিয়ে হাসির খোরাক পাওয়া গেলো, জনগণের লাভ এতটুকুই।
আওয়ামী লীগের এবারের মূল ইশতেহার ছিল উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা। এই মুহূর্তে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা বন্দর, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ অনেক উন্নয়ন দৃশ্যমান রয়েছে। নতুন মেয়াদে আরও অনেক প্রকল্পেই যোগ হবে। সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এটি। আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা থাকায় প্রকল্পগুলোর নির্বিঘ্নে চলতে পারছে। তবে এবার সরকারের ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রথম ইশতেহার হতে হবে সুশাসন। উন্নয়নের কথাই যদি বলি, তাহলে বলা দরকার হিসেবি হতে হবে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে। প্রকল্পের খরচ যেন না বাড়ে সেদিকে কঠোর হওয়া দরকার। বিগত সরকারকে একাধিকবার বিব্রত করেছে সড়কের বিশৃঙ্খলা। সড়কের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। পরিবহনের মালিক-চালক-শ্রমিকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল সরকার ও জনগণ। এবার সেই জিম্মি দশা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জিপিএ ফাইভমুখী শিক্ষা দক্ষ জনবল তৈরি করছে না। সেজন্য শিক্ষকের মান বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শৃঙ্খলা আনতে হবে আর্থিক খাতেও। কৃষক তার উৎপাদনের যথাযথ মূল্য যেন পান।
সব রাজনৈতিক সরকারকে তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বেসামাল আচরণের জন্য সমালোচিত হতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে সরকার বা দল হজম করে নেয় সেই বিব্রত বিষয়গুলো। ছাত্রলীগ আগের মেয়াদে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। এবারও ভোটের সময়েই অতি উৎসাহী ও নষ্ট কর্মী দলের বিজয়কে ম্লান করেছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। অভিযুক্ত আটক হয়েছে। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সামনের দিনগুলোতে অনেককেই উদ্ধত হতে নিবৃত্ত করবে।
সাধারণ জনগণ এমনকি আওয়ামী লীগের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষি ভোটাররাও একটি দাবি করার অধিকার নিশ্চয়ই রাখতে পারেন। সেটি হলো ভুল-ভ্রান্তির সমালোচনা সইয়ে নেওয়া সহিষ্ণুতা থাকুক নতুন সরকারের। এটি আওয়ামী লীগের জন্য এখন খুবই অনিবার্য হয়ে পড়েছে। কারণ দলে অনেক ছদ্মবেশির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যারা দলে এসেছেন তাদের অনেকেই কেবল ক্ষমতা স্বাদ নেওয়ার জন্য। এ প্রজাতি থেকে দলকে বিশুদ্ধ ও বিপদমুক্ত রাখতে অনেকেই দল বা সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। যেহেতু সংসদে উষ্ণ বিরোধী দল থাকছে না। সেখানে জনগণ ও তাদের মাধ্যম গণমাধ্যমকে সইয়ে নেওয়ার উদারতা বাড়ুক নতুন সরকারের। প্রকৃত সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র, প্রপাগান্ডা বুঝবার মতো স্বাক্ষরতা জনগণের হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন সরকারের অহেতুক নার্ভাস হওয়ার দরকার নেই।
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

ভাগ