ধানের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক

এখন চলছে আমন ধান ঘরে তোলার মওসুম। মাঠভরা সোনালী ধান তুলে এনে মাড়াই চলছে উঠান খলেনে। খুব স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের ঘরে নবান্নের আনন্দ উৎসব চলার কথা। ধান বিক্রি করে আনন্দে হাট থেকে মাংস আর মিষ্টি নিয়ে ঘরে ফেরার কথা চাষির। আবহমানকাল থেকে এমনটিই হয়ে আসছে এই দেশে। স্বাধীনতাপূর্ব সেই দুই ফসলির অভাবী যুগেও ধান ওঠা মওসুমে এই আনন্দ চলতো ঘরে ঘরে। কৃষি প্রধান দেশের মানুষের ফসলী মওসুমে আনন্দের প্রধান উৎসই মূলত নতুন ধান কাটা, মাড়াই, বিক্রি আর নবান্নের উৎসব করে গোলায় তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্য কৃষকের বাম্পার ফলন ফলিয়েও আনন্দ উৎসব দূরে থাক, প্রাণ খুলে হাসতেও পারছে না। লাভের বদলে লোকসানের ঘানি টেনে চোখের পাতা ঝাঁপসা করে হাট থেকে ফিরছে সবাই। মাংস-মিষ্টি ছেড়ে নিত্যদিনের সদায় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকছে তারা। বেদনার সুর তোলা এমনি একটি খবর ছাপা হয়েছে লোকসমাজে। গত রবিবার পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘আমনের বাম্পার ফলনেও মণপ্রতি ৪০০ টাকা লোকসানে কৃষক হতাশ’। আমাদের মনিরামপুরের স্টাফ রিপোর্টার এসএম মজনুর রহমান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ৮০ ভাগ ধান ঘরে উঠেছে। নতুন ধান উপজেলার হাটে আনছে কৃষক। কিন্তু দাম শুনেই হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। কৃষক বলছেন, ধান উৎপাদনে এবার ব্যয় বেশি হয়েছে। স্বর্ণা, ব্রি-৪৯, ব্রি-৭৫, ব্রি-৮৭ ধান উৎপাদনে মণপ্রতি খরচ পড়েছে প্রায় ১১শ’ টাকা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। ফলে প্রতিমণে লোকসান হচ্ছে ৪ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত। এতো বড় লোকসান দিয়ে তারা ঋণ ও মজুরির টাকা শোধ করতে পারছেন না। হতাশ ও ুব্ধ কিছু চাষী বলছেন, এভাবে লোকসান চলতে থাকলে তারা ধান চাষ ছেড়ে সব্জি বা অন্য কোন ফসল চাষ করবেন। ঠিক এ রকমই একটি সংবাদ গত সপ্তাহে ছাপা হয়েছিল লোকসমাজে। প্রতিবেদক আকরামুজ্জামান লিখেছিলেন ধান চাষিরা এবারও লোকসানের কবলে। গত বছরও ধান চাষিরা মণপ্রতি ৪/৫শ টাকা লোকসান দিয়ে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়েছিল। এবারও একই অবস্থা। ওই প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয় কৃষকের হতাশা ও ধান চাষে অনাগ্রহের কথা। দেনার দায়ে তারা ধান চাষ ছেড়ে লাভজনক ফসল চাষে যাবার পথ খুঁজছেন বলেও জানান।
আমরা জানি, এ অবস্থা শুধু এ বছর ও বছরের নয়, গত ৬/৭ বছর ধরেই চলছে। চাষি শুধু আমন ধান নয়, বোরো, আউশ সব ধানেই লোকসানের ঘানি টানছে। ধান তোলার মুহূর্তেই সারাদেশে ধানের দাম কমাতে শুরু করে। ধান বাজারে নেওয়ার পর দাম চলে আসে খরচের অর্ধেকে। এ নিয়ে চাষিরা হৈ-চৈ করলেও শোনার কেউ থাকে না। কৃষক বা চাষি অসংগঠিত এবং অরাজনৈতিক গোষ্ঠী হওয়ায় তাদের কথা সরকারের কাছে পৌঁছায় না। সংবাদ মাধ্যমগুলো এ নিয়ে ক’দিন লেখালেখি করলেও তেমন কাজে আসে না। সরকার ধান, চাল, ক্রয়ের একটি মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয়ের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। এরপর সংবাদ মাধ্যমে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ খবরে চাপা পড়ে কৃষকের আর্তনাদ। ধানের মান নির্ণয়ের নানা শর্তে ধান ক্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরে আসা কৃষকের ধান সেই হাটের মূল্যে ক্রয় করে দালাল, ফড়িয়া, মহাজন আর নেতা।ভরে দেয় গুদামে। ফলে যার ধান তার গলায় কাটা হয়ে ফোটে। টানা এ অবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে গত বোরো মওসুমে কিছু কিছু কৃষক প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু সরকারের কোন সাড়া না পেয়ে ধানের ক্ষেতে আগুন পর্যন্ত লাগিয়ে দেয়। একজন কৃষক বা চাষির জীবনে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর হতে পারে না। কারণ, কৃষকের কাছে উৎপাদিত ফসল তার সন্তানের মতই প্রিয় ও মূল্যবান।
আমরা জানি, কৃষক নিজের সন্তানতুল্য ফসল আগুনে পুড়িয়ে বা রাস্তায় ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চায় না। তার পরও নজিরবিহীন প্রতিবাদ তারা করেছে। তারা সংগঠিত না হওয়ায় সে প্রতিবাদ সরকার রাজনৈতিক রূপ দিতে চেষ্টা করেছে। তবে তা সফল হয়নি। আমরা মনে করি, সরকারের ওই চেষ্টা ঠিক ছিল না। কৃষক বছরের পর বছর লোকসানের জ্বালা জুড়াতে দিয়ে বুকের আগুন দিয়েছিল ধানে। ভেবেছিল আমনে তারা ন্যায্য মূল্য পাবে। কিন্তু এবারও সরকারি ধান-চাল ক্রয় শুরু হবার পরও তারা বিশাল লোকসানে ধান বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এখনই বিষয়টা গুরুত্বের সাথে নিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কারণ যে কৃষক ধানে আগুন দিতে পারে, সে ধান চাষও ছেড়ে দিতে পারে। লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পেতে কৃষক যদি তেমন ঝুঁকি নেয় তাহলে দেশে খাদ্য সংকট অনিবার্য হবে। যার খেসারত দিতে হবে সকলকে। আমরা আশা করবো, সরকার ধানের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করে কৃষি ও কৃষককে রক্ষা করবে।

ভাগ