‘ধর্ষকামী আইনের সমাজ’

রোকেয়া চৌধুরী
ওয়াশিংটনের এক পানশালায় মদ্যপ আর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধর্ষিত হন সারাহ টোবায়াস। প্রেমিকের সাথে ঝগড়ার পর ওই পানশালার কর্মী, বন্ধু স্যালির সাথে সময় কাটাতে গিয়েছিলেন সারাহ। স্যালির পরিচিত গ্রাহক ড্যানির সৌজন্যে পান করেন, ড্যানি আর তার বন্ধু ববের সাথে খানিকটা লঘু আলাপও হয়। তাদের সাথে বারের পেছনে গেম রুমে ভিডিওগেমস খেলেন। বাইরে থেকে মারিজুয়ানা নিয়ে এসে গেম রুমে প্রিয় গানের সাথে নেচে ওঠেন সারাহ। ড্যানিও তার সাথে নাচতে নাচতে ঘনিষ্ঠ হয়ে চুমু খান। সারাহ ধরে নিয়েছিলেন চুমু খেয়ে ড্যানি সরে যাবেন। কিন্তু দুই হাতে গলা চেপে ড্যানি তাকে পিন বল নামের গেম মেশিনে নিয়ে যান। তার দুই হাত চেপে ধরেন ড্যানির বন্ধু। ঘরভর্তি লোক তালি দিয়ে, চিৎকার করে, ছড়া কেটে উৎসাহ দিতে থাকে। আর একের পর এক তিন বন্ধু সারাহকে ধর্ষণ করতে থাকেন।
অমানবিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে সারাহ পালিয়ে আসেন। তার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ক্যাথরিন। মক্কেলের মাদক মামলার রেকর্ড অথবা ঘটনার রাতে পান করা কোনোটাই ক্যাথরিনের পছন্দ হয় না। তাই মামলার অভিযুক্ত প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের সাথে সমঝোতায় বাঁধা দেখেন না তিনি। অথচ সারাহ বিশ্বাস করতে পারেন না তার সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ কিভাবে অন্যদের সমঝোতায় ‘aggravated assult’ হয়ে যেতে পারে, যা ধর্ষণের চেয়ে লঘু অপরাধ। আইন না জানা সারাহ’র নিজের গল্প বলতে না পারার হাহাকার ক্যাথরিনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আইনের অন্তঃসারশূন্যতা। ঘটনাচক্রে নিজের পেশাগত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সারাহ’র হয়ে তিনি আবার আদালতে দাঁড়ান। এবার ধর্ষণের উস্কানিদাতাদের বিচার চেয়ে।
প্রতিপক্ষের আইনজীবী অবিশ্বাস ও উপহাসের মিশেলে সারাহকে জেরা করেন। বলেন আপনাকে ধর্ষণ করা হচ্ছিল, আপনি ‘রেপ’, ‘হেল্প’, ‘পুলিশ’ কোনও কিছু না বলে কেবল ‘না’ বললেন! ক্যাথরিন তখন সারাহকে প্রশ্ন করেন, ঘটনার সময় আপনি কী ভাবছিলেন? সারাহ অবাক হন, কী ভাবছিলাম? ক্যাথরিন বারবার প্রশ্ন করতে থাকেন আপনার মাথায় তখন কী ভাবনা ঘুরছিল, সমস্ত শরীরে কোনও শব্দ অনুরণিত হয়েছিল? সারাহ টোবায়াসের সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘না’। ক্যাথরিন আদালতকে বলেন, ‘No further questions, Your honor’।
১৯৮৮ সালের ছবি ‘The Accused’ এ সারাহ’র ভূমিকায় জোডি ফস্টারের ‘না’ দিয়েই তর্কের ইতি টেনেছেন পরিচালক। এই ‘না’ যে অসম্মতি জ্ঞাপক সেই ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েনি। এ সময়ের জনপ্রিয় বলিউড সিনেমা ‘Pink’ এ আইনজীবী সেহগালের ভূমিকায় অমিতাভ বচ্চন অভিযোগকারীর মুখের ‘না’কে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ব্যাখ্যা করেছেন ‘No means No’। তিনটি মেয়ের অল্প পরিচিত ছেলেদের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে যৌন হয়রানির মুখোমুখি হওয়া, আত্মরক্ষার চেষ্টা, তারপর হুমকি আর হামলার শিকার হওয়া, আদালত আর গণমাধ্যমের কাছে বারবার নিগৃহীত হওয়া-এই নিয়ে সিনেমার গল্প। দুটি সিনেমার মূল বক্তব্য সম্মতি-অসম্মতি। তবে মোটাদাগে পার্থক্য আছে। ‘The Accused’ এ আইনের মারপ্যাঁচ না জানা, নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে বুঝেও প্রকাশ করতে না পারা সারাহ টোবায়াসকে ছাপিয়ে আইনজীবী ক্যাথরিন কখনই মূখ্য হয়ে ওঠেন না। তাই আইন আর সমাজের দগদগে ক্ষত নগ্ন হয়ে ধরা দেয় আমাদের চোখে। ‘Pink’ এ প্রাজ্ঞ আইনজীবী সেহগাল অভিযোগকারীদের মুখের প্রতিটি কথাকে ব্যাখ্যা করেন নাটকীয়ভাবে। সেই নাটকীয়তা বিদ্যমান আইন থেকে আমাদের চোখ সরিয়ে নেয়। আমরা আবেগাক্রান্ত হই, কিন্তু আইনের ফাঁক নিয়ে প্রশ্ন করি না। ভারতের আইনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য না করা হলেও, এই সিনেমা দেখে আমরা বুলি আওড়াই সব ক্ষেত্রেই ‘No means No’।
ফৌজদারি আইনের একটা সাধারণ সূত্র হচ্ছে সন্দেহাতীতভাবে অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। ব্যতিক্রম ছাড়া শুধুমাত্র পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সেটি কখনোই হয় না। ‘Pink’ সিনেমায় পারিপার্শ্বিক প্রমাণ নির্ভর রায়ের দৃশ্য দেখে আমার অনেক বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়েছিল। ব্র্যাক মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কেন্দ্রের এক তরুণ গবেষক তার স্মারক বক্তব্যে বলেছিলেন, যেহেতু অনেক ধর্ষণ মামলা সরাসরি সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খারিজ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে রায় হওয়া উচিত। সেদিনের সভায় উপস্থিত বিচারক এবং  আইনবিদরা সেই গবেষকের তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। গবেষক নারী হওয়ায় উগ্র নারীবাদী খেতাবও পেয়েছিলেন তাৎক্ষণিক। ‘Pink’ এর মতো সহজবোধ্য, সচেতনতামূলক সিনেমা আরো অজস্র হওয়া উচিত, কিন্তু সেই সাথে আইন ও বিচার ব্যবস্থার এসব অসঙ্গতির প্রতি প্রশ্ন তোলার মতো উপাদান থাকাটা জরুরি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে রেইনট্রি হোটেলে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় ‘নো মিন্স নো’ অথবা ‘অনলি ইয়েস মিন্স ইয়েস’ উচ্চারিত হচ্ছে বারবার। এর মাঝেই চলছে অভিযোগকারীর বাড়ির সামনে ক্যামেরা তাক করা ফটো সাংবাদিকদের নজরদারি। অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিডিও অথবা অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের ছবি শেয়ার করা। কেউ কেউ আবার অভিযোগকারীদের সাথে ফোনালাপের বরাত দিয়ে ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা, আপডেট দিয়ে লাইক-কমেন্ট বাড়াচ্ছেন। দুই দলের কারো জন্যই মনে হচ্ছে অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি যথেষ্ট নয়। ভিডিও ফুটেজটা পেলেই তারা তাদের মিডিয়া ট্রায়াল শেষ করতে পারেন। বলতে পারেন মেয়েগুলো নিজ পায়ে হেঁটে হোটেলে ঢুকেছে অথবা দেখুন কত পাকা প্রমাণ আছে অভিযোগের। যারা গলা ফুলিয়ে ‘নো মিন্স নো’ বলেন, তাদের এত প্রমাণের দরকার পড়ছে কেন? আমাদের হয়তো আরও বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে জোর গলায় বলতে, যে কেউ শারীরিক সম্পর্কের সম্মতি দিয়েও সরে আসতে পারেন। যে কোনও সময়ে, যে কোনও অবস্থার অসম্মতিই অসম্মতি।
বলতে পারবো কিভাবে? আমাদের আইন কী বলে? দণ্ডবিধিতে তের বছরের বেশি বয়সের স্ত্রীর সাথে জোর খাটালে ধর্ষণ হয় না। সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে দশজনের মধ্যে নয়জন বিবাহিত নারী সঙ্গীর নির্যাতনের শিকার [বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০১১]। অথচ আইন সেই অনিচ্ছুক সম্পর্ককে ‘না’ বলে মানছে না। আবার সম্মতির ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক সমপ্রেমী নারী-পুরুষের সম্পর্কও আমাদের আইনে অপরাধ। আমাদের সাক্ষ্য আইনে ধর্ষণ মামলায় অভিযোগকারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। ভারতে ২০১৩ সালে সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে [ফৌজদারি আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৩] অভিযোগকারীর নৈতিক চরিত্র বা যৌন জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সম্মতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই সাথে বলা হয়েছে অভিযোগকারী সম্মতি ছিল না দাবি করলে আদালত ধরে নেবে সম্মতি ছিল না। সম্মতি প্রমাণ করা তখন অভিযুক্তের দায়িত্ব। আমরা এখনও ব্রিটিশ আমলের আইনে পড়ে থাকায় অভিযোগকারীদের ছবি প্রকাশ পাওয়াটা কেলেঙ্কারি। অথচ ধর্ষকদের জবানবন্দী আর ছবি প্রকাশের পর তাদের মুক্তি চেয়ে মসজিদে মোনাজাতও হয়েছে (কালের কণ্ঠ, ১৯ মে ২০১৭)।| তাতে সমাজের মূল্যবোধ বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হলো না।
রেইনট্রি হোটেলে নির্যাতিত তরুণীদের একজন বলেন,একটি মেয়ে ‘না’ বলেছে, মানে ‘না’। কিন্তু সমাজ এটা বুঝছে না। ভুক্তভোগীর সাথে আমাদের অনুধাবনের পার্থক্য হয়তো এখানেই। এই লড়াকু মেয়েদের অসম্মতির প্রতি সম্মান দেখানোর কথা মুখে বললেও আমরা অনেকেই তাদের সম্মতির তোয়াক্কা না করে জনমত গঠনের নামে তাদের বিভিন্ন তথ্য জনসমক্ষে নিয়ে আসছি। ধর্ষণ সম্ভবত একমাত্র অপরাধ যেখানে ভিকটিমকেও অপরাধী ভাবা হয়। তাই বিচার এবং রায় কার্যকর হলেও সমাজের চোখ পাল্টায় না। ১৩ বছর বয়সে ধর্ষিতা পূর্ণিমা শীলের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের। ২০০১ সালে তাকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। ধর্ষণের দায়ে পরবর্তীতে ২৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১১ জনের ফাঁসি হয়। অথচ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনো পূর্ণিমাকে এখনও যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়, অনলাইনে-কর্মক্ষেত্রে-পথে-ঘাটে।
আমাদের আইনে নির্যাতিতের জন্য সুরক্ষা নেই, আমাদের সমাজ নির্যাতিতের পক্ষে না, সেখানে দাঁড়িয়ে কোনও সম্মতি-অসম্মতির কথা বলি আমরা? এই মেয়েগুলো যদি আত্মহত্যা করতো অথবা হুমকি-প্রাণনাশের ভয়ে মুখ বুঁজে নির্যাতন সয়ে যেতো তখন আমরা তাদের জন্য চোখের জল ফেলতাম। এখন প্রমাণ, ছবি, ঘটনার বর্ণনা এসব ছাড়া পাশে দাঁড়াতে পারছি না। কারণ ‘ধর্ষিতা’র এই প্রতিবাদী চেহারা আমাদের ধর্ষকামকে আহত করে। নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার, তার সত্তাকে চরমভাবে আহত করার অস্ত্র, ধর্ষণ। সেই অস্ত্রকে উপেক্ষা করে যখন কেউ রুখে দাঁড়ায় তাকে এই সমাজ কোথায় জায়গা দেবে?
লেখক: আইন গবেষক ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভাগ