দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘বিরোধী পার্টি’ আসলে কারা?

0

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ আলোচনার পর ‘সমঝোতা’র মাধ্যমে জাতীয় পার্টিকে ২৬ টি আসন ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনকে দেয়া চিঠিতে ‘জোটভূক্ত প্রার্থী’ থাকার কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার বিষয়টিকে ক্ষমতাসীন দল তাদের ‘কৌশল’ বলে দাবি করছে। অন্যদিকে আসন নিয়ে দেনদরবার করলেও জাতীয় পার্টি বলছে তারাও আওয়ামী লীগের সাথে কোন জোটে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘বিরোধী পার্টি’ কারা? দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাতে সব দল অংশ গ্রহণ করতে পারে, সে জন্য তফসিল ঘোষণার বেশ আগে থেকেই উৎসাহ দিয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। এ লক্ষ্যে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সাথেও দফায় দফায় আলাপ-আলোচনা করেছে দেশগুলো।
কিন্তু নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে না নেওয়ায় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। ফলে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখানোটাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাবেক বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে বেশ কিছু নতুন দল নির্বাচনকে ঘিরে সামনে আসে। এ দলগুলো আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট ‘কিংস পার্টি’ হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। যদিও এসব দলকে শেষপর্যন্ত কোন আসনে ছাড় দিতে দেখা যায়নি ক্ষমতাসীনদের। পরে মিত্র দলগুলোর পাশাপাশি কিছু ছোট দলকে নির্বাচনে আনতে সক্ষম হয় ক্ষমতাসীনরা।
এক্ষেত্রে অবশ্য জোটভুক্ত দলগুলোকে কিছু আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে দলটির। রবিবার নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি নিয়ে ৩২টি আসন থেকে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে আওয়ামী লীগ। এসব আসনের মধ্যে ২৬টি দেওয়া হয়েছে জাতীয় পার্টিকে। যদিও দলটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলীয় জোটে এখন আর নেই। তারপরও প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার একেবারে শেষ মুহূর্তে তাদের সাথে সমঝোতায় গিয়েছে দলটি।
“একটি পক্ষ নির্বাচনকে পণ্ড করার চেষ্টা করছে। তাদের সেই অপচেষ্টা রুখে দিতেই আমরা সমঝোতার কৌশল নিয়েছি, বলেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, “জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে আগেই জানাতে হয়। আমরা দলের পক্ষ থেকে তেমন কিছুই জানাইনি। কাজেই আমরা জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করছি না”।
তবে জাতীয় পার্টির সাথে এই সমঝোতা করার পেছনে অন্য কারণও রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিন। “জাতীয় পার্টি নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে- এমন একটা ভয় তো ছিলই। সাথে আওয়ামী লীগ এটিও আশঙ্কা করছে যে, এভাবে কিছু আসন না ছেড়ে দিলে তারা হয়তো ৩০০ আসনেই বিজয়ী হয়ে যেতে পারে। যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে?” বলেন নাসরিন।
এদিকে, জোট ও সমঝোতার পাশাপাশি নিজ দলের মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদেরকে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে একটি জমজমাট নির্বাচন দেখাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ। “আগামী নির্বাচন ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের চেয়ে আলাদা কিছু হবে না”, বলছিলেন নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
তার এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “গত দুই নির্বাচনের সাথে এবার কেবল এতটুকুই পার্থক্য যে, আওয়ামী লীগ তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন করার সুযোগ দিচ্ছে।”

২৬৩টি আসনে দলীয় প্রার্থী রেখে বাকি আসনগুলো জোট ও মিত্রদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।বাংলাদেশের ৪৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৯টি দল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এসব দলগুলোর মধ্যে জনসমর্থনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শুরুতে দলটি সারা দেশে ২৯৮টি আসনে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে টিকেছেন তাদের ২৬৩ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বসহ নানা অভিযোগে পাঁচটি আসনে দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। বাকি ৩২টি আসন থেকে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। আওয়ামী লীগের পর এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যার কিছুটা নিজস্ব ‘ভোটব্যাংক’ রয়েছে। সেই জায়গা থেকে জাতীয় পার্টিকেই এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ মনে করছিলেন অনেকে। কিন্তু গত দু’টি জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জাতীয় পার্টি। ফলে সেই সম্ভাবনাও এখন আর খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকায় ইতিমধ্যেই ২৬টি আসনে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীদের প্রত্যাহার করেছে আওয়ামী লীগ।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই আমরা কিছু আসন থেকে প্রার্থী প্রত্যাহার করেছি। এটি নির্বাচনকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।” এর আগে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল হিসেবে ২৭টি আসনে জয় পেয়েছিল জাতীয় পার্টি। এরপর সমঝোতার মাধ্যমে ২০১৪ সালে ২৯টি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২২টি আসনে জয়লাভ করে দলটি।
অন্যদিকে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাকি দলগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই খুব একটা জনসমর্থন নেই। ফলে তারা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থেকেই নির্বাচন করতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলীয় জোটের শরিক এবং দীর্ঘদিনে মিত্র ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জেপিকে মোট ছয়টি আসন ছেড়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।
ফলে আওয়ামী লীগের বাইরে এবার নির্বাচনের মাঠে খুব একটা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকছে না। “এবারের নির্বাচনটি আসলে সাজানো খেলা। এখানেই পক্ষ-বিপক্ষ বলতে গেলে একই দলের খেলোয়াড়”, বলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দীন আহমেদ।

এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের আড়াইশ’রও বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এসব প্রার্থীরাই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে ক্ষমতাসীনরা।

“অনেক দল এবার নির্বাচন করছে। তারা নিজেদের মতো করে প্রার্থী দিয়েছে। এর বাইরে অসংখ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। এবারের নির্বাচনে যেসব দল ও প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই হয় সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত, অথবা তাদের মিত্র দলের নেতা। ফলে সমমনা প্রার্থীদের অংশগ্রহণে নির্বাচন কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, সে ব্যাপারে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন।
“এবার তো সেভাবে নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাচনের নামে যেটি হচ্ছে, সেটাকে বরং মকারি বলা চলে”, বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দীন আহমেদ। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতো, যদি বিএনপি অংশগ্রহণ করতো। কিন্তু তারা না থাকায় নিজ দলের জনপ্রিয় নেতাদের নির্বাচন করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।”
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করছে বিএনপি। দলটি এবার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।”কাজেই আপাতদৃষ্টিতে একই দলের প্রার্থীদের মধ্যে লড়াই হতে দেখা গেলেও নির্বাচন সত্যিকার অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না”, বলছিলেন তিনি।

কামাল আহমেদের এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচনটি আসলে গত দু’টি নির্বাচনের মতোই হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখানোর চেষ্টা দেখা গেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য, সে ধরনের নির্বাচন এবারও হবে না।”সব দলের অংশগ্রহণ না থাকার কারণে আগামী নির্বাচন ভোটারদের কতটুকু আকর্ষণ করতে পারবে, সেটি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। “নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ থাকলে সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু পছন্দের প্রার্থী না থাকলে ভোটাররা কেন আসবে?”, বলেন সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার।

বাংলাদেশের গত দু’টি সংসদে প্রধান বিরোধী দল ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টি। এর মধ্যে দশম জাতীয় সংসদে তারা একই সাথে সরকারের মন্ত্রিসভায় এবং বিরোধী দলে ছিল, যা নিয়ে তখন বেশ সমালোচনা হয়। এরপর একাদশ জাতীয় সংসদেও ২২টি আসনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশের অন্যতম বড় এই দলটি। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও নির্বাচনে তারা জয়লাভ করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে। ( সূত্র:বিবিসি বাংলা)

Lab Scan