দেশের মাটিতে ট্রফি জয়ের আক্ষেপ ঘুচবে টাইগারদের?

টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তো প্রশ্নই আসে না, ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে বাংলাদেশ কখনোই ঘরের মাঠে কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জিততে পারেনি। ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি- যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ দেশে ও বিদেশে আইসিসির পূর্ণাঙ্গ সদস্য দেশ তথা টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর সঙ্গে খেলে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে , সেটা এ বছর মে মাসে আয়ারল্যান্ডে। ঠিক বিশ্বকাপের আগে ডাবলিনে বসা তিন-জাতি ওয়ানডে টুর্নামেন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ওই ট্রফি জিতেছে মাশরাফির দল। সেটাই টাইগারদের প্রথম এবং একমাত্র কোন আসরের ট্রফি বিজয়।
এশিয়া কাপ, অস্ট্রেলেশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ, আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, বিশ্ব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট তো অনেক দূরে, গত মে মাসে ডাবলিনে ক্যারিবীয়দের হারিয়ে তিন জাতি একদিনের ফরম্যাটে টুর্নামেন্ট জেতার আগে আইসিসির পূর্ণাঙ্গ সদস্যদের সঙ্গে কোন তিন জাতি কিংবা তার বেশি দেশ নিয়ে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে শেষ হাসি হাসতে পারেনি টাইগাররা। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে কেনিয়াকে ফাইনালে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত যতগুলো তিন জাতি টুনামেন্ট খেলেছে, তার মাত্র দুটিতে বিজয়ী হয়েছে। তবে তার একটি কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত কোন ত্রি-দেশীয় সিরিজ নয়। ওই সিরিজের রেকর্ড ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশ দল এবং ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের মধ্যে গণ্য হলেও যেহেতু প্রতিপক্ষ ছিল আইসিসির সহযোগি সদস্য দেশ, তাই টুর্নামেন্টটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে আসর হিসেবে মর্যাদা পায়নি। তবে ব্যক্তিগত সাফল্য-ব্যর্থতা ও পরিসংখ্যান রেকর্ড বইয়ে ঠিকই আছে। এবার যেমন বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর ঠিক ১২ দিন আগে আয়ারল্যান্ডে তিনজাতি ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে প্রথম স্বীকৃত আন্তর্জাতিক তিন জাতি আসরের ট্রফি জিতেছে মাশরাফি বাহিনী। ঠিক একযুগ আগে ২০০৭ সালের ফেব্রয়ারি মাসে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে বিশ্বকাপের আগে ঠিক এমন এক তিনজাতি ওয়ানডে আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল হাবিবুল বাশারের দল। ওই আসরে টাইগারদের প্রতিপক্ষ ছিল আইসিসির দুই সহযোগি সদস্য কানাডা এবং বারমুডা। বারমুডাকে ৮ উইকেটে আর কানাডাকে ১৩ রানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। তবে সেটা আন্তর্জাতিক আসরের ট্রফি জয় বলে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ, বাকি দুই দল বারমুডা আর কানাডা আইসিসির সহযোগি সদস্য দেশ।
আইসিসির সহযোগি সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কয়েকবার সার্ক ক্রিকেটের আয়োজক হয়েছে। একবার রানার্সআপও হয়। তবে বিশ্বকাপ খেলার ছাড়পত্র পাবার পর ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে ঘরের মাঠে প্রথম তিন জাতি আন্তর্জাতিক আসরের আয়োজক হয় বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারত, পাকিস্তানের সাথে ইন্ডিপেন্ডেন্টস কাপে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে বাংলাদেশ। তখন সেটা ছিল এক অসম লড়াই। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওই দুই প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে পেরে ওঠেনি টাইগারররা। ভারত আর পাকিস্তানই ফাইনাল খেলে। সে আসরে ফাইনালে টাইগাররা দর্শক হয়েই ছিলেন। ওই বছর, ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের মাটিতে স্বাগতিক ভারত আর কেনিয়ার সাথে একটি তিনজাতি সিরিজ খেলতে যায় বাংলাদেশ। সেখানেই, ১৭ মে কেনিয়াকে ৬ উইকেটে হারিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। তারপরও ফাইনাল খেলা সম্ভব হয়নি। ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল কেনিয়া। এরপর ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে আবার তিন জাতি আসর টিভিএস কাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। সেখানেও ফাইনাল ওঠা বহু দূরে, জয়ের নাগালই পায়নি বাংলাদেশ। তিন বছর পর, ২০০৮ সালের জুন মাসে আবার দেশের মাটিতে কিটপ্লাই কাপে ভারত ও পাকিস্তানের সাথে তিন জাতি আসরে আবার সব ম্যাচ হেরে বসে আশরাফুলের দল। ভারত এবং পাকিস্তান ফাইনাল খেলে।
২০০৯ সালের জানুয়ারি, ঢাকার শেরে বাংলায় আরও একটি তিন জাতি আসর খেলে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ে। সেই আসরে প্রথম জিম্বাবুয়েকে পিছনে ফেলে ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ; কিন্তু রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে সুবিধাজনক অবস্থায় থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি টাইগারদের। শ্রীলঙ্কা জয়ী হয় ২ উইকেটে।
২০১০ সালের জানুয়ারি দেশের মাটিতে আবারও এক তিনজাতি আসর বসে। তাতে ফাইনালে ওঠা বহু দূরে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ফাইনাল খেলেছিল ভারত আর শ্রীলঙ্কা।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দেশের মাটিতে তিন জাতি আসরে জিম্বাবুয়েকে দুই বার আর শ্রীলঙ্কাকে একবার হারিয়ে দাপটের সঙ্গে ফাইনালে পৌঁছেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি মাশরাফির দল। ফাইনালে টাইগারদের ৭৯ রানে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে লঙ্কানরা।
মোটকথা, ঘরের মাঠে এখনো কোন ট্রফি জেতা হয়নি। সেটা ‘সোনার হরিণ’ হয়েই আছে। তবে বলে রাখা ভাল, ওপরে যে তিনজাতি আসরগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার সবগুলোই ওয়ানডে মানে ৫০ ওভারের আসর।
একটিও টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ছিল না। তবে ২০১৬ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্ট আসরকে সামনে রেখে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে একবার এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হয়েছে বাংলাদেশে। টাইগাররা সে আসরের ফাইনাল খেলেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। ভারতের কাছে ৮ উইকেটে পরাজিত হয়ে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ আগে কখনো টি-টোয়েন্টির ত্রিদেশীয় কোন আসরের আয়োজনই করেনি। অর্থাৎ দেশের মাটিতে টাইগাররা আগে কখনো তিন জাতি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টই খেলেনি। তাই শিরোপা জয়েরও প্রশ্ন ওঠে না। এবারই প্রথম আয়োজন। আর এবারই শিরোপা জয়ের হাতছানি। যদি জিতে যায়, তাহলে হবে ‘একে এক’। পরিসংখ্যানের মানদণ্ডে খুব ভাল। তাহলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশ ভাল দল না, আজ শেরে বাংলায় আফগানদের সাথে জিততে পারলে কি আর তা বলা যাবে?

ভাগ