তদবিরে চাঁদাবাজ চক্র

রাজধানীতে চলাচলকারী নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। দিনে কমপক্ষে দেড়শ’ টাকা হারে এসব অবৈধ যান থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠছে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আবার প্রতিটি ইজিবাইক ও রিকশার জন্য মাসিক চাঁদা এক হাজার টাকা। এ হিসাবে দিনে চাঁদা উঠছে প্রায় ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। সব মিলে এসব অবৈধ যান থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠছে সাড়ে সাত কোটি টাকা। বিশাল এই চাঁদাবাজি জিইয়ে রাখতেই সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্র নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অটোরিকশা সচল রেখেছে। এতে করে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশায় রাজধানী সয়লাব। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্তে¡ও এগুলো বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন এগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে যানজট, ভোগান্তি। তবে গত ১৯ জুন ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে দুই মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে চলাচলরত অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হবে। সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি রিকশা, অটোরিকশা ও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে ঢাকায় প্রবেশকারী অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এই কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। মন্ত্রী আরও জানান, বৈঠকে ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এজন্য ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ করা হবে।
বাংলাদেশ অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের একজন নেতা জানান, গত মাসে এ ঘোষণার পর নড়েচড়ে বসেছে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্র। তারা এখন তদবিরে ব্যস্ত। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা যে কোনো মূল্যে এ সিদ্ধান্ত যাতে বাস্তবায়িত না হয় সে চেষ্টায় লিপ্ত। জানা গেছে, যানজটের নগরী ঢাকার ব্যস্ততম রাস্তা দখল করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও ফিটনেসবিহীন লেগুনার স্ট্যান্ড। এতে তীব্র যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। অপরদিকে এসব যানবাহনকে পুঁজি করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও পুলিশ দৈনিক লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, দারুস সালাম, কাফরুল, পল্লবী, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলগাঁও, সবুজবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, তুরাগ, হাজারীবাগ, আদাবর থানা এলাকার অলি গলিতে অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা। পুলিশের চোখের সামনেই এগুলো দেদার চলাচল করছে, অহরহ যানজটের সৃষ্টি করে চলেছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্যও চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। প্রায়ই ঘটাচ্ছে দুর্ঘটনা। তবুও নিষিদ্ধ এ যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, জনবলের অভাবে রাজধানীর সব এলাকায় এসব অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তারপরও বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের অভিযানে বহু রিকশার মোটর খুলে ফেলা এবং অনেক ইজিবাইক ডাম্পিংয়ে পাঠানোর দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি রাস্তা, অলিগলি সয়লাব হয়ে পড়ছে নিষিদ্ধ মোটরচালিত রিকশা ও অটো-ইজিবাইকে। এসব যানের মালিক ও চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর সব এলাকায় মোটা অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে অবৈধ এ যান চলাচলের মৌখিক বৈধতা দিয়ে রেখেছে পুলিশ। কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিন নামানো হচ্ছে ৪০-৫০টি নতুন রিকশা ও ইজিবাইক। প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে নিত্যনতুন রুট বানিয়ে শত শত নিষিদ্ধ যানের ভিড়ে অনেক এলাকায় পায়ে হেঁটে চলায় দায়। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কদমতলী থানার দনিয়া এলাকাতে কয়েক মাসের ব্যবধানে পাঁচ সহ¯্রাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা নামিয়েছে একটি চোরাই সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেট নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে রিকশা চুরি করে এনে দনিয়া এলাকার বিভিন্ন রিকশার গ্যারেজে রেখে সেগুলোর রং পরিবর্তন করে ব্যাটারি লাগিয়ে রাস্তায় নামায়। এর সাথে নিষিদ্ধ ইজিবাইক আছে পাঁচ শতাধিক। চালকরা জানায়, প্রতিদিন এসব অবৈধ যান চলাচলের জন্য দেড়শ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় প্রতিদিন। ধোলাইপাড় ও শনিরআখড়া বাজারে নির্দিষ্ট লাইনম্যানরা এই চাঁদা তুলে থাকে। রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় তিনটি রুটেই চলাচল করছে দুই সহ¯্রাধিক ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এ রুটগুলো হচ্ছে- বিমানবন্দর রেলগেইট থেকে দক্ষিণখান, তালতলা, কসাইবাড়ি থেকে দক্ষিণখান বাজার, কসাইবাড়ি থেকে কাঁচকুড়া, হাজী ক্যাম্প থেকে কাঁচকুড়া এবং আবদুল্লাহপুর থেকে উত্তরখান মাজার রোডসহ অন্যান্য পয়েন্ট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ এলাকার প্রতিটি ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন ৮০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের হয়ে কাজ করে স্থানীয় কয়েকটি চক্র। চাঁদার টাকা থেকে থানা পুলিশ, স্থানীয় মাস্তান-সন্ত্রাসী, ট্রাফিক বিভাগসহ অন্যান্য সংস্থার চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। চাঁদার টাকা না দিলে লাইনম্যান, ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশ সেসব গাড়ি আটক করাসহ সংশ্লিষ্ট চালকদের ওপর নির্যাতন চালায়। শুধু তাই নয়, ‘লাইসেন্স’ দেওয়ার নামে প্রতিটি রিকশা ও ইজিবাইক থেকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নামে দেড় হাজার টাকা করে নেয়া হয়। উত্তরা ৪ নং ও ৮ নং সেক্টরের আবহাওয়া কোয়ার্টারের সামনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক ইজিবাইক নিয়ন্ত্রিত হয়। যার প্রতিটি থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ৪ নম্বর সেক্টরে শাহজালাল এভিনিউতে হাইওয়ে পুলিশের সদর দফতরের নিচেই ইজিবাইকের স্ট্যান্ড। স্থানীয়রা জানায়, এই রুটে চার শতাধিক ইজিবাইক চলে এবং এগুলো খুবই বেপরোয়া। শাহজালাল এভিনিউটি ডিভাইডার দিয়ে একদিকে চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও কোনো কিছুই চালকরা মানতে চায় না। এতে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে আশপাশে বেশ কয়েকটি স্কুল থাকায় রিকশা ও ইজিবাইকগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে উত্তরা, জসীমউদ্দীন রোড ও সোনারগাঁও জনপথে চলে লেগুনা। এসব লেগুনা চালকের অধিকাংশের বয়সই ১৪-১৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিটি লেগুনা থেকে হাউজবিল্ডিং এলাকায় ২০০ টাকা ও দিয়াবাড়ী এলাকায় ১২০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও লেগুনা নামের নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে খিলক্ষেত এলাকায়। সেখানে রেলগেট মোড় থেকে দেড় হাজারেরও বেশি অবৈধ যান চলাচল করছে অবাধে। এদিকে তালতলা ও ডুমনি, বিমানবন্দর ট্রাফিক পুলিশ বক্স থেকে সিভিল এভিয়েশন কোয়ার্টার, খিলক্ষেত বাজার থেকে লেকসিটি, কসাইবাড়ি থেকে দক্ষিণখান বাজার ও ইউনিয়ন, জয়নাল মার্কেট থেকে দক্ষিণখান বাজার, আজমপুর থেকে উত্তরখান থানা এবং ময়নারটেক ও আবদুল্লাহপুর থেকে উত্তর খান। এসব রুটে অন্তত সাড়ে সাড়ে চার হাজার ইজিবাইক এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন ১২০- ১৫০ টাকা এবং রিকশা থেকে ৮০ টাকা আদায় করা হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের হয়ে কাজ করে ‘লাইনম্যান’ নামে স্থানীয় একটি চক্র। ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর ব্যস্ততম কোনো রাস্তায় ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটো চালানোর সুযোগ নেই। বরং প্রতি মাসেই এসব অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, অবৈধ ইজিবাইক ও অটোরিকশায় চার্জ দেওয়ার নামে প্রতিদিন দেশে অন্তত ৩০ লাখ ঘণ্টা কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। বাণিজ্যিকভাবে এর মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। ঢাকায় এসব অবৈধ যান বিদ্যুতের চার্জ দেয়ার নামে আগে সরকারি জায়গা জমি দখল করে দলীয় অফিস বানানো হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি জমি দখল করে অফিস বানিয়ে এরপর সেখানে শ্রমিকলীগ, রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেই পুলিশ আর কিছু বলে না। এরপর সেখানে বিদ্যুতের অবৈধ লাইন নিয়ে চলে চার্জ বাণিজ্য। ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় এরকম বহু দলীয় চার্জিং অফিস আছে। এ ছাড়া কদমতলী, যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগ, ধোলাইপাড় ও শ্যামপুরেও আছে বেশ কয়েকটি। লক্ষাধিক ইজিবাইক আর ৭০ হাজারেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান নাগরিক জীবনকে রীতিমতো বিষিয়ে তুলেছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য মহানগর, জেলা শহর এমনকি থানা সদরেও শত শত ইজিবাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশার বেপরোয়া দাপট রয়েছে। প্রধান প্রধান সড়ক, টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ডে এসব অবৈধ যানবাহনের আধিক্যতায় যানজট-দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে গাড়িগুলোর ব্যাটারি চার্জের নামে দেদার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ এ যানবাহনকে পুঁজি করেই চলছে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখতে গত মাস থেকে তদবির চলছে জানিয়ে সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সংঘবদ্ধচক্র যেকোনো মূল্যে এগুলো বন্ধ হওয়াকে প্রতিহত করার চেষ্টায় আছে। সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে অটল থাকা। তাহলে যানজটের ভোগান্তির পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা অনেকটাই কমবে। একই সাথে পরিবহন সেক্টর শৃঙ্খলা অনেকটাই ফিরে আসবে।

ভাগ