ঢাকায় তেল, সিএনজিতে চলা বাসের সংখ্যা কত

0

মেসবাহ য়াযাদ॥ রাজধানীতে ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা নিয়ে চলছে বিতর্ক। বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি বাস মালিক সমিতি কারও কাছেই এ সংক্রান্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বাসের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নামে বাস মালিকেরা। বাস ধর্মঘটের কারণে সরকারের সঙ্গে মালিকপক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস ভাড়া ২৭ শতাংশ এবং মহানগরে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। তবে, এই বাড়তি ভাড়া কার্যকর হয়েছে শুধু ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রে। সিএনজিচালিত পরিবহনের ভাড়া আগের মতোই থাকার কথা। তারপরও সব ধরনের বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীতে চলা বাসের মধ্যে আলাদা করে তেলে বা সিএনজিতে চলা বাসের সংখ্যা কত?
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বরাত দিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ঢাকায় বর্তমানে যত বাস চলাচল করে তার ৯৫ শতাংশই সিএনজি ব্যবহার করে। ডিজেলে চলে মাত্র পাঁচ শতাংশ বাস। সারা দেশেও শতাংশের এই হারটি প্রায় একই বলা হয়েছে। তবে, এই তথ্যের কোনো নির্ভরযোগ্যতা পাওয়া যায়নি। বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি মালিক সমিতির কাছেও এ সংক্রান্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। পেট্রোল পাম্প বা সিএনজি স্টেশনসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঢাকায় অর্ধেকের বেশি বাস চলছে সিএনজিতে। আবার কোনো কোনো বাসে দুই ধরনের জ্বালানিই ব্যবহার করা হচ্ছে।
জার্মানভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদনে বিআরটিএর বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় ৯৫ শতাংশ বাসই এখন সিএনজিচালিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে মোট বাস ১২ হাজার ৫২৬টি৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হজার ৯০০টি। ডিজেলে চলে ৬২৬টি।’ বিআরটিএ-এর পরিচালক (সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি) মাহবুব ই রাব্বানী বলেন, ‘কোন কোন কোম্পানির বাস কোন জ্বালানিতে চলে, আমাদের ডেটাবেজে এ তথ্যগুলো নেই। তবে ২০০৮-২০০৯ সালের দিকে যখন ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন বেশির ভাগ বাস সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছিল। পরে রূপান্তরিত গাড়ির সমস্যার কারণে অনেকে আবার তেলে ফিরে যায়।’ বিআরটিএর বরাত দিয়ে প্রকাশিত- ঢাকার ৯৫ শতাংশ গাড়ি গ্যাসে চলে- এই তথ্য নাকচ করে মাহবুব ই রাব্বানী বলেন, ‘৯৫ শতাংশ বাস গ্যাসে চলে এটা যেমন ঠিক নয়, তেমনি মালিক সমিতির নেতার ভাষ্য মতে গ্যাসের বাস সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ- এই তথ্যও সঠিক বলে আমার মনে হয় না।’
ঢাকা শহরে মাত্র পাঁচ শতাংশ গাড়ি সিএনজিতে চলে, এমন দাবিকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন বুয়েট কর্তৃপক্ষ। বুয়েটের এআরআই ২০১৯ সালে খুব স্বল্প পরিসরে বিআরটি প্রকল্পের জন্য একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। ওই প্রকল্পকেন্দ্রিক গণপরিবহনের ২৫ মালিকের সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, ২৫ জন মালিকের ৮০ ভাগ গাড়ি চলে সিএনজিতে, আর ২০ ভাগ গাড়ি চলে ডিজেলে। এর আগে ২০১০ সালে বুয়েট আরেকটি গবেষণা করেছিল, সেখানে দেখা গেছে, রাজধানীতে ৭০ শতাংশ বাস সিএনজিতে চলে। ঢাকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। যদিও সাড়ে ১২ হাজারের মতো অনুমোদন রয়েছে বলেও বুয়েটের গবেষণায় জানা গেছে।
গাবতলী এলাকার মোহনা ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইউনুস আলী জানান, তাদের পাম্প থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি বাস তেল নেয়। তবে ডেনসো সিএনজি পাম্প থেকে দিশারি পরিবহনের বাসগুলো গ্যাস নেয়। পূর্বাচল গ্যাস ফিলিং স্টেশনের ম‌্যানেজার বশির আহমেদ জানান, তারা আশীর্বাদ পরিবহনের বাসে গ্যাসের জোগান দেন। মিরপুর-১২ থেকে তালতলা পর্যন্ত আটটি গ্যাস স্টেশন ও তিনটি পেট্রল পাম্প আছে। এই এলাকার রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টার থেকে শিকড়, বিহঙ্গ, আশীর্বাদ ও বিআরটিসি পরিবহনের ৫০টি বাস প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান স্টাফ মো. রুবেল। ইন্ট্রাকো সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি থেকে সেফটি, মিরপুর লিংক, আশীর্বাদ ও বিহঙ্গ পরিবহনের ৪০টি বাস গড়ে প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান ম্যানেজার মাসুদ। স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের সুপারভাইজার আলাউদ্দিন জানান— সেফটি, বিকল্প ও মিরপুর লিংকের ১৫টি বাসে তারা গ্যাস দেন। ঢাকা সিএনজি লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ার মোক্তার হোসেন জানান, বিহঙ্গ পরিবহনের ২০টি বাসে তারা গ্যাস সরবরাহ করেন।
অপরদিকে, সোবহান ফিলিং অ্যান্ড সারভিসিং স্টেশন থেকে প্রতিদিন ৩৫টি বাসে তেল নেয় বলে জানান সুপারভাইজার মাসুদ ইসলাম। এএস ফিলিং স্টেশনের কর্মী লুৎফর রহমান জানান, তারা প্রতিদিন গড়ে ২০টি বাসে তেল সরবরাহ করেন। তালতলা এলাকার ফাসান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সুজন মিয়ার হিসাবে, তাদের কাছ থেকে তেল নেয় প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি বাস। বাস কেন সিএনজি থেকে তেলে আসে-যায়, জানতে চাইলে বাস মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েতুল্লাহ খান বলেন, ‘৮ থেকে ১০ বছর আগে মানুষ গ্যাসের গাড়ি বেশি চালাতো। তখন তেলের চেয়ে গ্যাস বেশি সাশ্রয়ী ছিল। পরে দেখা যায়, গ্যাসের গাড়ির ইঞ্জিন দ্রুত বিকল হয়ে যায়। তাই অনেকেই গ্যাসের গাড়ি বিক্রি করে দেয়। আবার অনেকে গাড়িকে গ্যাস থেকে তেলে ফিরিয়ে নেয়।’ ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যার সঠিক হিসাব মালিক সমিতির কাছে আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে নাই। তবে আমরা সরেজমিনে চেক করা শুরু করেছি। এ বিষয়ে সোমবারও মিটিং করেছি। ঢাকা শহরে ছয় হাজার বাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ বাস গ্যাসে থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৯০ ভাগের মতো কাজ কাজ এগিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সংখ্যা জানিয়ে দেওয়া হবে।’

Lab Scan