ঢাকায় আফগান দূতাবাসে অবিশ্বাস্য নীরবতা

0

মিজানুর রহমান॥ অবিশ্বাস্য নীরবতা বিরাজ করছে ঢাকার আফগান দূতাবাসে। বারিধারার ওই চ্যান্সারি কমপ্লেক্সে যেন রাজ্যের অন্ধকার নেমে এসেছে। এপ্রিল মাস থেকে ঢাকায় আফগানিস্তানের কোনো রাষ্ট্রদূত নেই। সেকেন্ড সেক্রেটারি লেভেলের একজন কূটনীতিকের কাঁধে মিশনের প্রধানের দায়িত্ব। চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স শাহ ওয়ালি নাসিরিই সর্বেসর্বা! ঢাকায় আছেন তিনি বহু বছর। তার সঙ্গে বর্তমানে আছেন দু’জন আফগান স্টাফ। কাবুলের মসনদ উলটপালটে প্রভাব পড়েছে তাদের কার্যক্রমেও। আফগানিস্তান দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেগুনবাগিচার পদস্থ কর্মকর্তা বলছেন, আফগান পরিস্থিতির ভয়াবহতায় দেশটিতে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ঢাকাস্থ আফগান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ফোনটি রিসিভ করেননি কিংবা ফোনটি ব্যাকও করেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা বলছেন, তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রবেশের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির দেশ ত্যাগের আগ পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আফগান দূতরা দফায় দফায় ব্রিফ করেছেন। পরিস্থিতির ক্রমাবনতি, সরকার ও নাগরিকদের অবস্থা সম্পর্কে হোস্ট গভর্মেন্ট এবং ডিপ্লোমেটিক কমিউনিটিকে অবহিত করেছেন তারা। কিন্তু ঢাকার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের কোনো তৎপরতা ছিল না, এখনো নেই। তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরকেও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার তাগিদ বা প্রয়োজনও মনে করেননি। ঢাকাস্থ আফগান দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ঘেঁটে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে ঢাকায় সর্বশেষ দায়িত্ব পালনকারী আফগান রাষ্ট্রদূত আবদুল কাইয়ুম মালেকজাদের বিষয়ে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। মালেকজাদ ২০১৮ সালের ২১শে মে ঢাকা মিশন শুরু করেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে। এক মাসের মধ্যে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারও আগে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সাক্ষাৎ পান। সেই সাক্ষাতে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। সেদিন রাষ্ট্রদূত মালেকজাদ সরকারপ্রধানের কাছে কাবুলে বাংলাদেশ দূতাবাস পুনরায় চালুর প্রস্তাব করেন। চলতি বছরের ৫ই এপ্রিল রাষ্ট্রদূত আবদুল কাইয়ুম মালেকজাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়। এটা ছিল তার বিদায়ী সাক্ষাৎ। সেই বৈঠকে আফগানিস্তানে ব্র্যাকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর বছরব্যাপী আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন আফগান দূত। সেগুনবাগিচা বলছে, ঢাকাস্থ আফগান রাষ্ট্রদূতের এটাই ছিল শেষ সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। তবে ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে ডিপ্লোমেটিক কমিউনিটিতেও বেশ সক্রিয় ছিলেন তিনি। ভারত, পাকিস্তান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার নিয়মিত বৈঠক হতো। তার সক্রিয়তার ছাপ রয়েছে দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুকে। যে পেজ বর্তমানে অকার্যকরই বলা চলে, গত ১৭ই মার্চ সর্বশেষ ওই পেজে আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, আফগান পরিস্থিতি এবং দূতাবাসের কার্যক্রম বিষয়ে কথা বলার জন্য চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স শাহ ওয়ালি নাসিরির সঙ্গে কথা বলতে হোয়াটস আপে তার পিএসকে বিস্তারিত পাঠিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাওয়া হয়। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব আসেনি।
ভারত ও পাকিস্তানে আফগান দূতাবাসের কার্যক্রম যেমন—
এদিকে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রগুলোতেও আফগান দূতরা তেমন সক্রিয় নন। আফগানিস্তানের সীমান্ত লাগোয়া পাকিস্তানে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত নাজিবুল্লাহ আলী খেলকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মাস দেড়েক আগে। ইসলামাবাদে তিনিই ছিলেন আফগানিস্তানের একমাত্র কূটনীতিক। বর্তমানে দেশটিতে আর কোনো কূটনীতিক অবশিষ্ট নেই। সেখানে কয়েকজন স্টাফ রয়েছেন। তারা চ্যান্সারি কমপ্লেক্সে দরজা-জানালা খুলেন, তবে কোনো কূটনৈতিক কার্যক্রম নেই বলে খবর পেয়েছে ঢাকা। ইসলামাবাদস্থ আফগান মিশনের অফিসিয়াল ফেসবুক ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ ২৯শে জুন আল্লামা ইকবাল বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন রাষ্ট্রদূত নাজিবুল্লাহ আলী খেল। ইসলামাবাদে কূটনৈতিক সূত্র ধারণা দিয়েছে সম্ভবত ওই মতবিনিময় সভাই ছিল প্রত্যাহার হওয়া আফগান দূতের শেষ পাবলিক প্রোগ্রাম। এদিকে ভারতে সরব আফগান দূতাবাসের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে দু’দিন আগে। সেখানে অসম্পর্কিত বা উল্টাপাল্টা টুইটও প্রচার করেছে হ্যাকার চক্র। এমনটা দাবি করা হয়েছে দিল্লিস্থ আফগান দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে। ভারতে আফগান দূতাবাসের সক্রিয়তার প্রমাণ তাদের ওই ফেসবুক পেজ। কাবুলের ঘানি সরকারের মসনদ তছনছ হয়ে যাওয়ার পরও দূতাবাস প্রতিনিধিরা ব্যস্ত রয়েছেন ভারতে আশ্রয় নেয়া আফগানদের কনস্যুলার সেবায়। একদিন আগেও দূতাবাস এ সংক্রান্ত নোটিশ প্রচার করেছে। সেখানে বলা হয়, যারা ভারতে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন তারা যেন তাদের পাসপোর্টের মৌলিক তথ্য সংক্রান্ত পেজ স্ক্যান করে দূতাবাসে মেইল করেন। দিল্লির আফগান দূতের সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের ১১ই আগস্টের বৈঠকটি অফিসিয়াল ফেসবুকে গুরুত্বের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ওই বৈঠকে আফগান পরিস্থিতি নিয়ে দূতদ্বয় বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবান সহিংসতা, চলমান শান্তি প্রক্রিয়া এবং সুইডেনের সহায়তা নিয়ে কথা হয়। বৈঠকে নারী ও শিশুদের অধিকারসহ আফগানিস্তানের মৌলিক মানবাধিকার প্রশ্নে ঘানি সরকারের যে অর্জন তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন সুইডিশ দূত।

Lab Scan