টিকা সংগ্রহ ছাড়া কোন বিকল্প নেই

0

করোনার টিকা পাওয়া নিয়ে ভারতনির্ভরতার ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত এখন বাংলাদেশকে দিতে হচ্ছে। অন্য কোনো দেশ বা উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা না রেখে শুধু ভারতের সাথে ছয় মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার চুক্তি এবং যথাসময়ে তা না পাওয়ায় পুরো টিকা কার্যক্রম এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এমনকি টিকার দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করার জন্য ভারতের কাছে প্রায় ১৮ লাখ টিকা চেয়ে আবেদন করেও পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে টিকার মজুদও শেষ হয়ে গেছে। এর ফলে টিকার দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি রয়েছে ১৫ থেকে ১৮ লাখ। দেশের টিকা কার্যক্রমের এই যখন পরিস্থিতি, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হণ্যে হয়ে টিকার সন্ধানে নেমেছে। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ টিকার অন্যান্য উৎসের কাছে ধর্না দিয়েও আশাপ্রদ কোনো সাড়া পাচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রথম ডোজ নেয়ার দুই মাসে দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। টিকা কার্যক্রমের এই বেহাল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি সৃষ্টির মূল কারণই হচ্ছে, একদেশনির্ভর হওয়া। এ সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল তা স্বাস্থ্যবিদরা বারবার বলেছেন। একাধিক দেশ ও উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদর্শীতার অভাব ছিল।
এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, ভারতের টিকা এ বছর পাওয়া যাবে না। কারণ, ভারত নিজেই করোনায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। তার নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে আমাদের টিকা সরবরাহের সক্ষমতা এখন নেই। একেবারে শেষ সময়ে এসে টিকা না পাওয়া যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে স্বাস্থ্যবিদরা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। তারা মনে করছেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এক্ষেত্রে, মন্ত্রণালয় বন্ধুত্বের নামে ভারত তোষণনীতি করতে গিয়েই টিকার অন্যান্য উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আশার কথা হচ্ছে, চীন আমাদের প্রকৃত বন্ধু হয়ে এগিয়ে এসেছে। দেশটির কাছ থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের টিকা সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন থাকার পরও আমাদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা সরবরাহে এগিয়ে এসেছে। প্রকৃত বন্ধু হয়ে দেশটি আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এজন্য চীনকে ধন্যবাদ। ইতোমধ্যে উপহার হিসেবে দেশটি সিনোফার্মের ৫ লাখ ডোজ দিয়েছে। এ টিকা দিয়ে ২৫ মে থেকে নতুন করে টিকা প্রয়োগ শুরু হবে। দেশটি উপহার হিসেবে আরও ৬ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চীন থেকে কেনা দেড় কোটি ডোজ টিকা আসতে পারে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একমাত্র চীনই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। অথচ ভারতের কাছ থেকে কেনা টিকা পাওয়া দূরে থাক আবেদন করেও টিকা পাওয়া যায়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন টিকা কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। উন্নত বিশ্বে টিকা কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অথচ টিকা কার্যক্রম শুরু করেও সংকটের কারণে আমাদের হোঁচট খেতে হচ্ছে টিকা সংগ্রহের দূরদর্শীতার অভাবে। বিশ্বে যখন টিকা রাজনীতি চলছে, তখন আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে অব্যবস্থাপনা, যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যর্থতা ও অদক্ষতা প্রমাণিত। ফলে টিকাবিহীন অবস্থায় দেশের কোটি কোটি মানুষ রয়ে গেছে, যা করোনা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ ও প্রলম্বিত করে তুলতে পারে। অথচ আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরেসোরে চালু রাখার ক্ষেত্রে দ্রুত ভ্যাকসিনেশনের বিকল্প নেই। টিকা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে যত দেরি হবে অর্থনীতিও তত পিছিয়ে যাবে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে হলে যেভাবেই হোক আমাদের টিকা সংগ্রহ করতে হবে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিৎ হবে, দেশে টিকা উৎপাদনে মনোযোগ দেয়া। ইতোমধ্যে জানা গেছে, দেশীয় ওষুধ কোম্পানির টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু টেকনোলজি। এই টেকনোলজি পাওয়া নির্ভর করছে টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরকারের সদিচ্ছার ওপর। তবে যেসব কোম্পানি টিকা উৎপাদন করছে তারা এই টেকনোলজি দিতে চায়। সরকারের অনুমতি ছাড়া তারা এ টেকনোলজি দিতে পারবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিৎ হবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরকারের কাছ থেকে টিকার টেকনোলজির অনুমতি আদায় করা। এতে যেমন টিকার জন্য অন্যদেশের উপর নির্ভর করতে হবে না, তেমনি চাহিদা অনুযায়ী টিকা উৎপাদন করে বিদেশেও রফতানি করা যাবে। টিকা কার্যক্রম চালিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। এক দেশের সাথে আরেক দেশের যোগাযোগ চালু করেছে। এটা করতে পেরেছে টিকা কার্যক্রম সফল করার মাধ্যমে। দেশগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এখন টিকা সনদ আবশ্যক হয়ে পড়েছে। যাদের টিকার কোর্স সম্পন্ন হয়েছে তাদের দেশগুলোতে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। ভ্যাকসিন কার্যক্রম স্থগিত থাকায় অনেক দেশ আমাদের নাগরিকদের প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। ইতোমধ্যে সউদী আরব আমাদের শ্রমিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে টিকা গ্রহণ এবং নিজ খরচে কোয়ারিন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে অনেকে যেতে পারছে না। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া রেমিট্যান্স এবং অর্থনীতির ওপর পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এসব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে শুধুমাত্র টিকা সংগ্রহে সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এখন ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে দ্রুত টিকা সংগ্রহের উপায় খুঁজতে হবে। ভারত থেকে টিকা সংগ্রহের চিন্তা বাদ দিতে হবে। যেখান থেকে টিকা পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করতে হবে। যেভাবেই হোক দেশে ভ্যাকসিনেশনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।

Lab Scan