জেঁকে বসা শীতে জবুথবু মানুষ

0

 

আকরামুজ্জামান ॥ যশোরে তাপমাত্রার পারদ নামছে প্রতিদিন। সোমবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন রোববার ছিল ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি। সোমবার সারাদিন দেখে মেলেনি সূর্যের। এ অবস্থায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। জবুথবু অবস্থা প্রাণীকূলের।
আবহাওয়া অফিস বলছে, হিমালয়ান হিমবায়ুর ফলে তাপমাত্রার পারদ নিচের দিকে নামছে। সাথে ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকছে প্রকৃতি। রাতের সাথে দিনের বেলাও শিশির বৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। এদিকে আজ বৃষ্টির আভাস দিয়েছে ঢাকার আবহাওয়া দপ্তর।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন এ তাপমাত্রা অব্যাহত থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া অনেকে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না। দিনের বেলাতেও সড়কে আলো জ্বেলে চলছে যানবাহন। তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে নষ্ট হচ্ছে বোরোর বীজতলা ও সবজিক্ষেত। হাসপাতালে বাড়ছে শিশু ও বৃদ্ধ রোগীর সংখ্যা।
যশোর বিমানবাহিনীর আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, যশোরসহ দক্ষিণের জেলাগুলোতে মৃদু শৈত্য প্রবাহ বিরাজ করছে। গত এক সপ্তাহ ধরে যশোরের তাপমাত্রা নিম্নমুখী। রোববার থেকে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছে। রোববার সকালে যশোরে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটি গতকাল সোমবার আরও ২ দশমিক কমে রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৬ ডিগ্র সেলসিয়াস। এতেই কুয়াশাছন্ন হয়ে পড়ছে পুরো এলাকা; দিনের বেলাতেও দৃষ্টিসীমা ১০০ মিটারের ভেতরে থাকছে। এ কারণে দিনে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সড়ক-মহাসড়কের সব ধরনের যাবাহনকে। সেই সঙ্গে উত্তরের হিমেল হাওয়ার কারণে শীত আরও বাড়ছে। আগামী কয়েক দিন এ ধরনের তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে।
শীতের কারণে সবচেয়ে অসুবিধায় পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। যত ঠান্ডাই অনুভূত হোক না কেন, জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন ভোরে তাদের রাস্তায় বের হতে হচ্ছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা গরম পোশাক গায়ে চাপিয়ে শীত ঠেকাতে পারছেন বটে! কিন্তু নিম্নবিত্ত ও ছিন্নমূলদের কষ্টের সীমা থাকছেনা। অন্যান্য বছরে তীব্র শীতের সময়ে জেলায় শীতবস্ত্র বিতরণের চিত্র দেখা গেলেও এ বছর এর ছিটেফোঁটা দেখা মিলছেনা। যেকারণে আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে ছিন্নমূল অসহায় মানুষদের। সাথে ভোগান্তি বাড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের।
যশোরের উপশহর খাজুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কথা হয় আব্দুর রহমান নামে এক ইজিবাইক চালক বলেন, শীত পড়লেও কিছু করার নেই। জীবিকার তাগিদে বের হতে হয়েছে। শহরে লোকজনের সংখ্যা কম হওয়ায় ভাড়া নেই বলে তিনি জানান।
পাশেই কথা হয় সবদুল হোসেন নামে আরেক রিকশাচালকের সাথে। তিনি বলেন, অন্যান্য বছরে এই সময়ে শহরে বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ হলেও এবার তেমন কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছেনা। আমরা গরীব মানুষ এই শীতে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছি। তিনি বলেন, শীতের কারণে মোটেও বের হওয়া যাচ্ছেনা। তারপরও সংসার চালাতে রিকশা নিয়ে বের হতে হয়েছে। তিনি বলেন, সকাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১০০ টাকা আয় করেছি। অন্যান্য দিন এ সময়ে ৩ থেকে ৪শ টাকা আয় করতে পারতাম। শীতের কারণে মানুষ বের হচ্ছেনা।
তীব্র ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশায় যখন বিপর্যস্ত এ অঞ্চলের জনজীবন তখন এ অঞ্চলের মাঠে মাঠে কৃষক বোরো আবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার বিস্তীর্র্ণ মাঠে ৭৫০০ হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা রয়েছে। এসব বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাথে আলুসহ বিভিন্ন সবজিও হুমকিতে পড়েছে বলে কৃষি বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, শীতের কারণে বীজতলা হুমকিতে থাকলেও এই মুহূর্তে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার সমস্যা নেই। কারণ যশোরাঞ্চলে যে বীজতলা রয়েছে তা অনেক বড় হয়ে গেছে। এগুলো ঘন কুয়াশার কারণে রঙ বদলালেও নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও আমরা কৃষকদের বীজতলা পলিথিন দিয়ে রাতে ঢেকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। এর বাইরে দিনের বেলায় ক্ষেত থেকে ঠান্ডা পানি বের করে দিয়ে সেচ দেয়ার কথা বলছি।
তিনি বলেন, শীত ও কুয়াশার কারণে আলুসহ কিছু সবজির সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এটি সহসা কেটে গেলে কৃষক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে তীব্র ঠান্ডায় হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে শিশু ও বৃদ্ধ রোগীর সংখ্যা। যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, হাসপাতালে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা হাসপাতালে আসছেন। এ অবস্থায় শিশুদের গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা ও গরম খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
চিকিৎসকদের মতে ঠান্ডায় শিশুরা ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। এ সময় বাইরে বের না হওয়া ভালো। জরুরি প্রয়োজনে বের হলে গরম কাপড় ও মাস্ক পরতে হবে। বাসি খাবার মোটেও খাওয়া যাবে না। কুসুম গরম পানি পান ও ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাওয়ার জন্যে গুরুত্ব দেন চিকিৎসকরা।
এদিকে শীত ও শৈত্যপ্রবাহের মাঝে  বৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।  মঙ্গলবার থেকে দেশের কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাসে এমন তথ্য জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ঢাকার বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা থেকে জানা যায়, আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামীকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা থেকে খুলনা বিভাগের কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। পরদিন বুধবার রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।

 

 

 

Lab Scan