জানুয়ারির শুরুতেই বিদ্যুতের মূল্য বাড়ার শঙ্কা

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর ২৮ নভেম্বর থেকে গণশুনানি শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এর ফলে বর্ধিত মূল্য দিয়ে নববর্ষ শুরুর শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে, চলতি বছরের শুরুর ‍দিকে গ্যাসের মূল্য বাড়িয়েছিল কমিশন। বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবে পিডিবি বলছে, ২০২০ সালে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হতে পারে ৩৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু ওই সময় প্রয়োজন হবে ৪৫ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। ফলে বাকি আট হাজার ৬০৮ কোটি টাকা পূরণের জন্য মূল্য সমন্বয় করতে কমিশনকে অনুরোধ করে পিডিবি।
অন্যদিকে, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের যে হিসাব, তাতে বলা হচ্ছে, ২০২০ সালে ২০ হাজার ৩১ কোটি টাকা হবে সম্ভাব্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। পিডিবি আগামী বছরজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য ঘাটতি দেখিয়েছে আট হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কিছুটা কমানো গেলেই বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হবে বলেও পিডিবি যুক্তি দেখিয়েছে। পিডিবি সূত্র জানায়, যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। সরকার বারবার বড় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বললেও এখন পর্যন্ত সেগুলো উৎপাদনে আসেনি। ফলে এখনও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরই নির্ভরশীল দেশের বিদ্যুৎ খাত। এই কারণে প্রতিবছর বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সাশ্রয়ী ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র আনতে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্ট ও সঠিক ছিল না। তাই প্রতিবছর এই চার্জ বাড়ছে। নভেম্বরেই পায়রার কয়লাভিত্তিক ১৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে আসার কথা ছিল। কিন্তু সঞ্চালন লাইন একই সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রথমে ডিসেম্বর মাসের কথা বলা হলেও এখন বলা হচ্ছে জানুয়ারিতে হতে পারে। একইভাবে পিছিয়ে পড়েছে অন্য বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাজও। অন্যদিকে, এই চার্জের দোহাই দিয়েই প্রতিবছর বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের মূল্য। ২০১৭ সালে সর্বশেষ বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়। এরপর দুই বছরের মাথায় এসে আবারও মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে, এভাবে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর বিরোধিতা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদ্যুতের এই ক্যাপাসিটি চার্জের দায় পুরোপুরি সরকারের। কিন্তু সরকার বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে পুরো দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপাচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মনে করছেন তারা। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ৪৫ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা দিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে ২০১৮ সালে। এছাড়া, চলতি বছর ও আগামী বছরের সম্ভাব্য হিসাব আরও বেশি বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে বিদ্যুতের মূল্য বাবদ ৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে সরকার। ২০১৫ সালে এসে সেই চার্জ ৭ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা দিতে হয়। এরপর ২০১৬ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকায়। ২০১৭ সালে আরও বেড়ে হয় ১০ হাজার ১০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে বেড়ে হয় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এরপর ২০১৯ সালে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালে ২০ হাজার ৩১ কোটি টাকা হবে বলে সম্ভাব্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের ফলে বাড়ছে বিদ্যুতের খরচ। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঠিক সময়ে না আসার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দরকার হলে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা আবারও পর্যালোচনা করে বড় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে মনোযোগী হওয়া। না হলে ভবিষ্যতেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়তেই থাকবে। পাশাপাশি, বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবও আসতে থাকবে।’
এদিকে, সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে বিদ্যুতের দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পিডিবি সরকারের ভর্তুকি থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে। এজন্য তারা বিইআরসির কাছে প্রস্তাব দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি কমাতে হলে বিদ্যুতের দামের বিষয়টি সামনে চলেই আসবে। কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। এখন কমিশন সহনীয় পর্যায়ে রেখে মূল্য সমন্বয় করবে বলে সরকার আশা করছে।’ বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে। এই দুই বছরে মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলেই বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘তেলভিত্তিক ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যতদিন থাকবে, ততদিন ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়তেই থাকবে। বড় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে মূল্য কমে আসবে।’ ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বিদ্যুতের মূল্য এখন মেনে নিতেই হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ভাগ