জাতীয়তাবাদের ভূত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

তৈমূর আলম খন্দকার
মিথ্যা ও সত্যের মধ্যে দূরত্ব বা তারতম্যের পরিমাণ একচুল মাত্র। ক্ষমতাসীনেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ একেক রকম ব্যাখ্যা দিলেও ‘গদিচ্যুত’ হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইনের উৎপত্তি। আভিধানিক অর্থ বা আইনের ভাষা ও ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন ‘জাতীয়তাবাদের’ পরিপন্থী চিন্তা-চেতনাই মূল রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এর কোনোটা ইতিহাসের পাতায় সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে, কোনোটা হয়নি। ইতিহাসবিদদের কলমের জোরে অথবা পক্ষপাতিত্বের কারণে অথবা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তথ্যবিভ্রাটে অনেক ক্ষেত্রে খলনায়ক নায়কে এবং নায়ক খলনায়করূপে ইতিহাসের পাতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কোনো বিষয়ে একজন লেখকের রচিত ইতিহাস পাঠ করে সত্যের সঠিক সন্ধান পাওয়া খুব কঠিন, যদি না বহুমাত্রিক লেখকের লেখা ইতিহাস পাঠ করা যায়। ইতিহাস বিকৃতি বা বানোয়াট কথা লেখানোর জন্য আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব হয় না।
জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে দার্শনিক ঐধহং কড়যহ-এর মন্তব্য মতে ”Nationalies are products of living forces of history, Nationality is an historical and political concept and the word ‘National’ and ‘Nationality’ have undergone many changes in meaning.” ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, পাহাড়ি-সমতল, আদিবাসী-পরবাসী হিসেবে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে থেকেও একটি জাতি দ্বিধাবিভক্ত হতে পারে। কিন্তু জাতিসত্তার প্রশ্নে বিভক্ত থাকতে পারে না। যদি কোনো কারণে বিভক্তি আসে তবে জাতিসত্তা মজবুত হতে পারে না, বরং এক পক্ষ অপর পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এ জন্য বৈষম্যমূলক আইন পাস করাসহ গণহত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানে জাতিসত্তা সৃষ্টি না হওয়ার কারণেই, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৯০-৯২ শতাংশ জনসংখ্যা একই ধর্মের হওয়া সত্ত্বে¡ও পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা করেছিল। বর্তমানে একই কারণে মিয়ানমারে তা ঘটছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী একত্রে বসবাস করেও সেখানে জাতিসত্তার সৃষ্টি হয়নি। ১৮৮৭ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পয়লা মে সেখানে গুলি বর্ষণে শ্রমিক হত্যার দিবসটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও শ্রমিকের কাক্ষিত দাবি আদায় হয়নি। ‘শ্রম’কে পুঁজির সাথে মূল্যায়ন করতে হবে, এটাই ছিল শ্রমিকদের মূল দাবি। পক্ষান্তরে বর্তমানে শ্রমিক নেতৃত্ব নিজেদের দালালির কারণেই শ্রমিক আন্দোলন বারবার মার খাচ্ছে। ট্রেড ইউনিয়ন বোঝেন না, এমন লোকও বর্তমানে ডাকসাইটে শ্রমিক নেতা। ট্রেড ইউনিয়ন কী ও কেন? এ মর্মে রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। যেমন- পরিবহন মালিকরা যখন সঙ্কটে পড়েন, তখন তাদের রক্ষা করার জন্য গঠিত হয় পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। মালিক ও শ্রমিকের স্বার্থ যখন কখনো এক নয়, তখন ঐক্য হয় শুধু মালিকদের সঙ্কট মোকাবেলার জন্য। প্রতিটি দলের একটি শ্রমিক অঙ্গসংগঠন থাকলেও ট্রেড ইউনিয়ন বলতে যা বোঝায় সে পদ্ধতিতে শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠেনি।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি ভাটি এলাকা। হিমালয় পর্বত থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর বেশির ভাগই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ফলে নদী থেকে প্রবাহিত পলিমাটির কারণে বাংলাদেশের মাটি অনেক উর্বর। তাই এলাকাটি একটি কৃষিনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। আরব দেশগুলো থেকে মুসলমান পীর-ফকিরদের এ দেশে আগমনের আগে দেশটি ছিল হিন্দুপ্রধান এলাকা। ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কৃষিজীবী ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের নিম্নবর্ণের মনে করত। ফলে ব্রাহ্মণ, ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি প্রভৃতি বনাম দাস, সাহা প্রভৃতি গোষ্ঠীর বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থনীতিবিদেরাও বর্তমানে রুজি বা আয় ভিত্তিক জনগোষ্ঠীর Classifilation করে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নামে- তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। আধুনিক অর্থনীতিবিদেরা ‘নিম্নবিত্তের’ শব্দটি পরিবর্তন করে তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ডড়ৎশরহম ঈষধংং হিসেবে তাদের চিহ্নিত করছেন। জাতিসত্তার অভাবে ডড়ৎশরহম ঈষধংং দিনে দিনে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কোটিপতি সৃষ্টি হচ্ছে জ্যামিতিক হারে, যার পেছনে রয়েছে অযাচিত ব্যাংক ঋণসুবিধা এবং নানাভাবে অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণের টাকা আত্মসাতের মনোবৃত্তি। মোটা অঙ্কের ঋণের টাকা আত্মসাৎ করা ‘অনেক সোজা’। কারণ, মাত্র ১ শতাংশ ডাউন্ট পেমেন্ট দিয়েই হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নবায়ন করার সুযোগ সরকার দিয়েছে, যার সুবিধা সরকার ঘরানার লোকেরাই পাচ্ছেন; যাদের বেশির ভাগই রয়েছেন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে। এখানেই রয়েছে জাতিসত্তাবোধের প্রচুর ঘাটতি, তবে মুখে মুখে সবাই দেশপ্রেমিক তাদের মধ্যে সুশীল বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫৬৩। ফলে সরকারের বক্তব্য মোতাবেক, দেশের গোটা জনগণের উপার্জন বৃদ্ধি পেয়েছে, কথাটি সত্যের অবলোপন মাত্র। গোটা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন সার্বিকভাবে হয়নি। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ রয়েছে। জাতিসত্তা মজবুত হয়নি বলেই শ্রেণিবৈষম্য এত ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডড়ৎশরহম ঈষধংং দিন দিন নিঃস্ব হয়ে ডড়ৎশরহম ঈষধংং-ই রয়ে গেল। মুচির সন্তান মুচিই হচ্ছে, রিকশাচালকের সন্তান রিকশা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। জাতীয় পত্রিকান্তরে প্রকাশ ‘যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিয়ে গবেষণা করে, এমন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা এশিয়াতে উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ নামে লন্ডনভিত্তিক এ প্রকাশনাটি ২০১৯ সালের যে তালিকা দিয়েছে, সেখানে এশিয়ার ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩৫০। বাংলাদেশের অনুমোদিত ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটিও স্থান পায়নি এই তালিকায়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাপদ্ধতিসহ নানা বিষয় নিয়েই বিভিন্ন সময় সমালোচনা করা হয়। কিন্তু কেন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান পেল না? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতি এখনো সনাতন পদ্ধতির, সাথে রয়েছে নানা অরাজকতা। আমাদের একটা বড় ঘাটতির জায়গা হলো টিচিং অ্যান্ড লার্নিং। এ দু’টি পদ্ধতি খুব পুরনো আমলের। লার্নিং কত ধরনের আছে সেটা নিয়ে গবেষণার অভাব আছে, বোঝাবুঝির অভাব আছে। এখানে অনেক দিন ধরে অনেক অরাজকতা চলছে, সেসব দূর করার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সেটাই বড় সমস্যা।’ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফারজানা সিদ্দিকা বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পরও মাত্র গুটিকয়েক বিভাগে গবেষণা হয়। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। সেটা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে ছাত্রদের পাস করিয়ে দেয়া এর উদ্দেশ্য যত না, তার চেয়ে বেশি থাকার কথা গবেষণার কাজ। বাংলাদেশে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কিছু গবেষণার কাজ হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে কোনো গবেষণা হচ্ছে না। গবেষণার জায়গায় এ দেশের অবস্থান অনেক পেছানো।
এক সময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বারবার এসেছে দেশের নানা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। কিন্তু এসব যে উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লেখানোর জন্য কোনো ভূমিকা রাখে না, সেটাই বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা। (জাতীয় পত্রিকা, ৭ মে ২০১৯)। জাতিসত্তার তাগিদেই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের রাজনৈতিক প্রভাব, নবাব সলিমুল্লাহর দান করা জমি এবং ধনবাড়ির জমিদার নবাব আলীর আর্থিক সাহায্যে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। চরম প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃতি লাভ করে এটি। যাদের উদ্যোগ, জমি ও অর্থের বিনিময়ে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সকোর্ড নামে পরিচিত, তাদের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জাতি জানে না। এতে কি জাতিসত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না?
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী
(অ্যাপিলেট ডিভিশন)
taimuralamkhandaker@gmail.com

ভাগ