জাতিসত্তার অন্তরালে বিষাক্ত নিঃশ্বাস

তৈমূর আলম খন্দকার
একটি জাতি ও একটি রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের প্রকারভেদ এক নয়, এর জন্মগত ইতিহাস ও পদ্ধতি ভিন্নতর। একটি রাষ্ট্র গঠনের পেছনে আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধবিগ্রহ, দখল, পুনর্দখল, কূটনৈতিক চাল, ঈমানদারি, বেঈমানি, বিশ্বস্ততা, বিশ্বাস ঘাতকতা প্রভৃতি জড়িত। বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র, কিন্তু এ ভূখণ্ডটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেমন- পাকিস্তান, ব্রিটিশ, মোগল সাম্রাজ্য প্রভৃতি। নিজ ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা কখনো নিজ অস্তিত্ব বিলীন করে অন্য ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত হওয়া রাষ্ট্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে চলে আসছে। শক্তি যার বেশি তার হাতেই বন্দী হয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব; নীতি, আদর্শ, মানবতা এখানে বাতুলতামাত্র। কিন্তু জাতি গঠনের বিষয়টি ভিন্নতর, যা এক দিনে সৃষ্টি হয় না বা হতে পারে না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী অনুশীলনের মাধ্যমে যে সংস্কৃতি ও ভাবধারা এলাকাভিত্তিক গণমানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে, তা-ই জাতিসত্তা। যুদ্ধবিগ্রহ বা আন্দোলন-সংগ্রাম অথবা কূটকৌশলের মাধ্যমে ‘জাতির’ সৃষ্টি হয় না। একটি জাতি গঠন ও জাতিসত্তা একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ দিন অনুশীলনের ফসলমাত্র। ভৌগোলিক ভাবধারা ও জলবায়ু জাতিসত্তা গঠনে প্রভাব ফেলে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে জাতিসত্তার একটি ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু জাতি গঠিত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ থেকে। বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতিসত্তার বিচার-বিশ্লেষণ করার জন্য ১৭৫৭, ১৯০৫, ১৯১১ এবং ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭০-৭১ সালসহ বর্তমান উপ-আন্তর্জাতিক (ভারতবর্ষ) পরিমণ্ডলকে বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বাংলা ভাষা বাঙালিদের একক ভাষা হলেও ভাষাটির প্রকারভেদ বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম। পার্বত্য এলাকার ভাষা প্রমিত বাংলা থেকে ভিন্নরূপ, যা সাধারণ একজন বাঙালির পক্ষে বোধোদয় হওয়া কষ্টকর। ভাষাভিত্তিক পাহাড়ি, বাঙালি, নৃগোষ্ঠী এবং ধর্মভিত্তিক হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, জৈন, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মিলেই বাংলাদেশ। জতিগত দ্বন্দ্ব পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও হয়েছে। বর্তমানে যা প্রকটভাবে হচ্ছে চীনের উইঘুর ও মিয়ানমারে এবং যা শুরু হয়েছে পাশের রাষ্ট্র ভারতে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে নিঃশেষ করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় গণহত্যা, যার বীজ বপন হয় বৈষম্যের মধ্য দিয়ে। ভারত উপমহাদেশের জাতিগত বৈষম্যের ইতিহাস অনেক দীর্ঘতর, যা বর্ণনা ইতিহাসবিদদের লেখনীতে পাওয়া যায়। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রণীত ‘ভারত স্বাধীন হলো’ বইয়ে তিনি লিখেছেন- ‘এই সময়ে আমি তখনকার একজন বাঘা বিপ্লবীকর্মী শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসি। ফলে আমি বিপ্লবী রাজনীতির দিকে ঝুঁকি ও ছোট ছোট উপদলের একটিতে ঢুকে পড়ি। সে সময় বিপ্লবী দলগুলোতে শুধু হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদেরই নেয়া হতো। সত্যি বলতে কি, বিপ্লবী দলগুলো তখন ছিল কায়মনোবাক্যে মুসলিমবিরোধী’ (সূত্র : ভারত স্বাধীন হলো, পৃষ্ঠা ১২)। জওয়াহেরলাল নেহরুকে লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন।
লেখকের অসিয়ত অনুযায়ী, তার মৃত্যুর ৩০ বছর পর বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়ে উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতাদের দাবি ছিল জোরদার। সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং মিয়ানমারের বৌদ্ধদের ভূমিকা এক ও অভিন্ন। মিয়ানমার ও ভারতের নাগরিকত্ব আইন এবং চীনের উইঘুরে মুসলিম নিধন একই সূত্রে গাথা। রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করার প্রশ্নে চীন ও ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র বলে পরিচিত হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কোনো ধরনের সহযোগিতা বা সমর্থন পায়নি। তার পরও এ জটিল সমস্যার বোঝা বাংলাদেশকে একাই বইতে হচ্ছে; যার সমাধানের জন্য বাংলাদেশের পাশে মুসলিম দেশগুলোই এগিয়ে এসেছে, ধর্মনিরপেক্ষ বা মানবতার নামধারী ভেটো পাওয়ায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রগুলো এগিয়ে আসেনি। তবে কেউ কেউ শুধু উদ্বেগ জানিয়েছে, যা শুধু ছিল লোক দেখানোর পার্শ্বক্রিয়া মাত্র। ১৭৫৭ সালে তৎকালীন কিছু উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, বিশেষ করে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বেঈমানির কারণে ৬৫ হাজার সৈন্য থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজয় বরণ করতে হয়ে ছিল ব্রিটিশের তিন হাজার ৫০০ সৈন্যের কাছে। সে দিন যদি বেঈমানি না হতো তবে ভারতবর্ষের ইতিহাস ভিন্নতর হতো। পৃথিবীতে ঈমানদারিত্বের চেয়ে বেঈমানির ইতিহাস অনেক বড়, যার কালিমা থেকে ভারতবর্ষ বাদ পড়ে না। জনসংখ্যার গুরুত্ব, শিক্ষাবিস্তারসহ গণমানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্ব বিশেষ করে স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে গণদাবির মুখে ব্রিটিশ সরকার পূর্ববঙ্গ ও আসামকে যুক্ত করত : ঢাকাকে রাজধানী করে ১৯০৫ সালে একটি প্রদেশ গঠন করে। কিন্তু ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এ প্রদেশ মেনে নেয়নি। তাদের আন্দোলনের কারণে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেলে আবার পূর্ববঙ্গ ও আসাম রাজধানী কলকাতার অধীনে চলে যায়। ভারত স্বাধীনতা আইন ১৯৩৫ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুমোদন হওয়ার পরই ব্রিটিশ থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ব্রিটিশ সহজভাবে ভারতের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি।
ব্রিটিশ ভারতকে লুট করেছে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে, খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর, স্যার, নানা ধরনের উপাধি দিয়ে ব্রিটিশরা ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দালালশ্রেণী সৃষ্টি করে, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি অনুসরণ করে বৈষম্যের আনুষ্ঠানিক প্রচলন এ দেশে জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, জনস্বার্থবিরোধী একটি আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে ব্রিটিশ সরকার যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। আমাদের রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে (১৯৪৭ ও ১৯৭১) দুইবার, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক রীতিনীতি ব্রিটিশের প্রভাবেই প্রভান্বিত, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, দেশপ্রেম ও মর্যাদাবোধ এখনো পরাধীনতার মানসিকতারই চলছে, ফলে আগে এ দেশ ও জাতি শোষিত হয়েছে ব্রিটিশ, পাকিস্তানি দিয়ে, এখন নিজেদের মধ্যেই শোষক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। ‘হাত মে বিড়ি, মুখ মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ সেøাগানে উজ্জীবিত জনগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেল বটে, কিন্তু পাকিস্তানি রাষ্ট্রনায়কদের শোষণ-শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে আবার সেøাগান উঠল- ‘লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, এ আজাদি ঝুটা হায়।’ পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের সেøাগান উঠল- ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’ এ সেøাগানগুলোর পেছনের মূল কারণ ছিল বৈষম্য, যে বৈষম্য আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমানে কার্যকর হচ্ছে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে। জাতিগত বৈষম্যের মূল নায়ক ভারত সরকার স্বয়ং। তবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয় জনগণের ভূমিকা প্রশংসনীয়। যেমন- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা পাকিস্তান সরকারকে সমর্থন করলেও জনগণ ছিল স্বাধীনতাকর্মীদের পক্ষে। ফলে জনগণ ও সরকারের চিন্তা এক ও অভিন্ন তা বলা যাবে না। বরং শোষণ-বৈষ্যম্যের বিরুদ্ধে জনগণই সঠিক পথের দিকনির্দেশক এবং সর্বশেষ জয়ের মালা যাদের গলায় শোভাবর্ধন করেছে, তারাই হলো জনগণ। তবে এর মধ্য দিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল, সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগীরা যে যতটুকু পারে, ততটুকুই জনস্বার্থ লুট করে নিয়ে গেছে।
ইতিহাসের পেছনে তাকালে দৃশ্যমান হয় যে, মোদি ও অমিত শাহ নেতৃত্বাধীন ভারতে এখন যা ঘটছে তা হলো দ্বিজাতিতত্ত্বের বাস্তবায়ন। মুসলিম লিগের উদ্যোগে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে ‘টু ন্যাশন থিওরি’ অর্থাৎ দ্বিজাতিতত্ত্ব পাস করে। কিন্তু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরই হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি ওঠে ১৯০৮ সাল থেকেই। মুসলমান ও ক্রিশ্চিয়ানদের ভারত থেকে বের করে দেয়ার যুক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িক গবেষক বিনায়ক দামোদর সভারকার ১৯২৩ সালে ‘হিন্দুত্ব’ বইটি প্রকাশ করেন। সে ধ্যান-ধারণাকে লালন করে শুধু মুসলিম নিধনের জন্য ভারতের এই এনআরসি উদ্যোগ। কেউ কেউ স্মৃতি ভুলে গেলেও অতীত তো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে। ইতিহাস ভুলে যাওয়ার কথা নয়, তবে অতীত থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে চায় না। স্মৃতিকে ভুলে যাওয়াকে একটি রোগ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ডিমেনশিয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এ রোগীর সংখ্যা ১০ লাখ, ২০৫০ সালে পৃথিবীতে এ রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১৫ কোটিরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট জনসংখ্যার একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ অতীত ভুলে যায় স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ার কারণে, কিন্তু মূল জনস্রোত কিন্তু ইতিহাস ভোলার কথা নয়। অতীতকে জানার সুযোগ মানুষের রয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে জানার বা দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সৃষ্টিকর্তা জোর দিয়েই বলেছেন, ‘গায়েব’কে জানার জ্ঞানের একমাত্র মালিক তিনি, যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা; কুরআনের ভাষায় ‘আলিমুল গায়েব’। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেউ যদি জানত, তবে কেউই বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করত না। বাংলাদেশে যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করেছে, তাদের পরিণত সুখকর হয়নি। প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং প্রতিপক্ষকে অত্যাচার-নির্যাতনের মানসিকতাপূর্ণ এ সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ইতিহাস খুবই করুণ এবং নির্মম।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে খুন হয়েছেন দুইজন রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়া)। ক্ষমতা হারিয়ে কারাবন্দী হয়েছেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। জাতীয় সংসদের মাধ্যমে অপসারিত হওয়ার আশঙ্কায় পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী। প্রভাবশালী দুই নারী প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দী হয়েছেন, যার মধ্যে একজন এখনো কারাভোগ করছেন। প্রভাবশালী এমন কোনো মন্ত্রী নেই, যারা কারাভোগ করেননি। যারা ঠুঁটো জগন্নাথ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাদের কারাভোগ করতে হয়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতা হারিয়ে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে পুলিশের পিটুনি খেয়েছেন, তারা হলেন- মোহাম্মদ নাসিম, মতিন চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী ও বাবর। গলাধাক্কা খেয়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, বর্তমানে দুদক মামলায় কারাগার তাকে ডাকছে, যদিও দুদককে তিনিই শক্তিশালী করে দিয়েছেন। তার মতে, রাজনীতিবিদরা সবাই দুর্নীতিবাজ। যে রায় প্রদানের কারণে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হলেন, সেই রায়ে সব বিচারপতি স্বাক্ষরদাতা হলেও সিনহাকে বাঁচানোর জন্য তার সহকর্মী বিচারপতিরা এগিয়ে আসেননি, বরং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ দেশে ক্ষমতাভোগীদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কখন কী হয়, তা কেউই আঁচ করতে পারে না। ৩০ টাকার ইফতারি কখন কার ভাগ্যে জোটে, তা বলা যায় না। কখন কে কারাগারে রাজার হালে থাকে বা থাকবে তা ও অনিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটি নির্মম সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু লাশ যখন সিঁড়িতে পড়ে ছিল, তখন দলের এত নেতাকর্মী ছিল কোথায়? বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতিসত্তা লাইনচ্যুত হয়ে কি খাদের কিনারে, নাকি নীড়হারা পাখির মতো শুধু উন্নয়নের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, নাকি পথের সন্ধান পেয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে এগোচ্ছে- বিষয়গুলো অনেক অনেক প্রণিধানযোগ্য। ইট-সিমেন্টের উন্নয়ন দিয়ে জাতিসত্তার মর্যাদার মাপকাঠি নিরূপণ করা যায় না। ‘উন্নয়ন কারো সমষ্টিগত মর্যাদা, সম্মানবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা জমাটবদ্ধ করে না। ফলে বর্তমানে ‘জিরো টলারেন্স’ নামক একটি কালচার আবিষ্কার হয়েছে, যা আদর্শিকভাবে প্রয়োগ না হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। বর্তমান জাতিসত্তা শুধু ক্ষমতার পাশে থাকতে চায়, আদর্শের পক্ষে নয়, ব্যতিক্রম যা রয়েছে তা জনস্রোতের একটি ক্ষুদ্র অংশ যাদের গলায় আওয়াজ রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কর্ণকুহরে পৌঁছায় না। ফলে সর্বত্রই চলে রাজার জয়গান। ‘সত্য’ যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, সময় যখন খারাপ হয় তখন ভুক্তভোগীই বুঝতে পারে সে কতটুক অসহায় (!)
লেখক : চেয়ারম্যান, গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি আইনজীবী আন্দোলন
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

ভাগ