জমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জমি অধিগ্রহণ একটি সাধারণ বাস্তবতা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক জমি ছাড়তে বাধ্য হন জমির মালিকরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আইনের আশ্রয় নিতেও বাধ্য হন। তবে ২০১৭ সালে প্রণীত স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনের খসড়ায় হুকুমদখল আইনের আওতার সরকারী হুকুমদখলের বিরুদ্ধে কোনো আদালতের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ রহিত করা হয়েছে। সেই সাথে সরকারী কাজের জন্য ভ’মি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলের ক্ষতিপুরণের পরিমান দেড়গুণ থেকে বাড়িয়ে তিনগুণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথমত: জমির মালিকদের ক্ষতিপুরণ নিশ্চিত করেই জমি অধিগ্রহণের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, সেই সঙ্গে কৃষিজমি, দরিদ্র কৃষক বা বর্গাচাষিদের জমি অধিগ্রহণ করে সরকারী প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত না নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা সময়োপযোগি, বাস্তবানুগ, মানবিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের পরিপুরক। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট অধিদফতর ও মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে।
দেশব্যাপী লক্ষকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব প্রকল্প নিয়ে সরকার ও সরকারীদলের সুদুরপ্রসারি রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। এ কারণে অনেক প্রকল্পই জনতুষ্টিমূলক। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপুরণ দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যে সব দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিচ্ছে তা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরী করছে। ভ’মি অফিসকেন্দ্রিক দুর্নীতি এবং জমির মালিকদের ক্ষতিপুরণের টাকা পেতে বছরের পর বছর বিভিন্ন অফিসে ঘুরে ঘুরে হয়রান হতে হয়। জমি মালিকরা ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বোঝাপড়া, লেনদেন ও খুশি করার নানাবিধ উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হন। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে অনেকে নিজের ভিটে-বাড়ি, ফসলি জমির মায়া ত্যাগ করলেও তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপুরণের টাকা দিতে একশ্রেনীর সরকারী কর্মকর্তার গড়িমসি, দুর্নীতি ও দীর্ঘসুত্রিতার নানা অজুহাত উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের ত্যাগ ও অংশগ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে কলঙ্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলছে। যাদের জমি ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব, সেই সব কৃষক ও দরিদ্র মানুষদের হয়রানি ও বঞ্চিত করার এই বাস্তবতা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। চলমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অত্যন্ত ইতিবাচক।
প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে একদিকে সাধারণ জমিদাতাদের নানা ধরনের হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে, অন্যদিকে একশ্রেণীর মানুষ সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নানাবিধ উপায়ে সরকারী অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা-তদ্বিরে লিপ্ত হতে দেখা যায়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় এবং প্রকল্প অনমোদনের আগেই অনেকে প্রকল্পের অধিগ্রহণের সম্ভাব্য এলাকায় বাড়তি ক্ষতিপুরণ পাওয়ার জন্য জমিতে স্থাপনা নির্মান করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে ভাগবাটোয়ারার যোগসাজশে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে সরকারী অর্থের যথেচ্ছ অপচয় ও লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। জমি অধিগ্রহণে অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, আইনগত জটিলতা ও দীর্ঘসুত্রিতার কারণে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার প্রকল্পও বাস্তবায়ন বছরের পর বছর ধরে প্রলম্বিত হওয়ার নজির রয়েছে। যেনতেন প্রকারে অবকাঠামো উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য হতে পারে না। কৃষিব্যবস্থা, খাদ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দরিদ্র কৃষকদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার বিষয়গুলোকেও সরকারের বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী কৃষিজমিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিল্পায়ন বা রফতানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আবাদী জমি ও বনভ’মি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। ভ’মি অধিগ্রহণ আইনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও নীতিমালা থাকতে হবে। আইন শুধু কাগজে কলমে থাকলেই হবে না। তা যথাযথ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের কার্যকর পন্থাও নির্ধারিত হতে হবে। একদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ণকালে নানা অজুহাতে অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি অন্যদিকে যাদের জমির উপর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় সেই ভ’মি মালিকদের বঞ্চনা, হয়রানি ও ঘুষ-দুর্নীতির টার্গেটে পরিনত করার চলমান বাস্তবতা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

ভাগ