চৌগাছায় নাজিম উদ্দিনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

0

 

মুকুরুল ইসলাম মিন্টু, চৌগাছা (যশোর) ॥ বড় ছেলে নাসির উদ্দিন শারীরিক প্রতিবন্ধী, বিএ পাস করেও পাননি কোন চাকরি। চা বিক্রি করে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করছেন। আর ছোট ছেলে উসমান গনি বাণিজ্য বিভাগে অনার্স পড়া অবস্থায় অভাবের কারণে আর পড়তে পারেন নি। পানির লাইনের মিস্ত্রির কাজ করে রোজগার করা টাকা তুলে দিত পিতার হাতে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় তার একটি পা শরীর থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। দুই সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল পিতা নাজিম উদ্দিনের। সেই কথা বলতে গিয়ে চোখের পাঁপড়ি অশ্রুতে ভিজে উঠলো, পারলেন না আর কথা বলতে।
চৌগাছা পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের জিওয়লগাড়ী গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন। পরের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে চলে সংসার। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে সন্তানের পিতা নাজিম উদ্দিন। অভাব অনটনের সংসার হলেও ছেলে দুটিকে পড়ালেখা করাতে ভুল করেনি। বড় ছেলে নাসির উদ্দিন ১ বছর ৩ মাস বয়সে পোলিও’তে আক্রান্ত হয়ে ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। তারপরও হাল ছাড়েনি, চৌগাছার এবিসিডি ডিগ্রি কলেজ হতে ২০১১ সালে বিএ পাশ করেন। বেশ কয়েক জায়গায় চাকরির চেষ্টা করে কিন্তু চাকরি নামের সোনার হরিণকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে চৌগাছা-মহেশপুর সড়কে দামোদার বটতলায় ভাড়া দোকানে এখন চা বিক্রি করেন। ছোট ছেলে উসমান গনি বাণিজ্য বিভাগে বিএ অনার্স পড়া অবস্থায় অভাবের সংসারে পিতার কষ্ট লাঘবে পড়া বাদ দিয়ে পানির লাইনের মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। দুই ছেলে আর পিতার রোজগারে ভালই চলছিল সংসার। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তাদের সব কিছুই এলোমেলো করে দিয়েছে।
শনিবার দুপুরে জিওয়লগাড়ি গ্রামে নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক নাজিম উদ্দিন বাড়িতে সংসারের কাজে ব্যস্ত। এসময় কথা হয় অসহায় এই পিতার সাথে। তিনি বলেন, বড় ছেলে নাসির উদ্দিন শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও বেশ মেধাবী। কিন্তু অভাব নামক দানব তাকে আর সামনে যেতে দেয়নি। বিএ পাস করলেও পায়নি কোন চাকরি। এখন চা বিক্রি করে। ছোট ছেলে উসমান গনির কথা বলতে গিয়ে কষ্টে কেঁদে উঠলেন বৃদ্ধ পিতা। নাজিম উদ্দিন জানান, অভাবের কারণে অনার্স পড়া অবস্থায় সে পড়া বাদ দিয়ে কর্মে নেমে পড়ে। পানির লাইনের মিস্ত্রির কাজ করে ভাল রোজগার করতে থাকে। গত ঈদুল আজহার আগের দিন চৌগাছা-মহেশপুর সড়কে দামোদার বটতলায় তার বহনকারী মোটরসাইকেলের পেছন হতে যাত্রীবাহি বাসে ধাক্কা দেয়। মারাত্মক আহত হয় উসমান গনি। চৌগাছা, যশোর সর্বশেষ ঢাকা পঙ্গুতে তাকে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ডাক্তার তার ডান পা শরীর থেকে কেটে ফেলে। বর্তমানে সে বাড়িতে আছে, এখনও সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি।
নাজিম উদ্দিনের বড় ছেলে নাসির উদ্দিন বলেন, সব পিতারই স্বপ্ন থাকে সন্তান বড় হয়ে পিতার কষ্ট লাঘব করবে, আমাদেরও সেই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আমরা দুই ভাই পিতার কষ্টকে লাঘব তো দূরের কথা, বর্তমানে যেন বোঝা হয়ে উঠেছি। বিএ পাস করেছি, চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা। কিন্তু হয়নি একটি চাকরি। চা বিক্রি করলেও মনে কষ্ট ছিলনা। কিন্তু দুর্ঘটনায় ছোট ভাইয়ের যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা কাউকে বুঝাতে পারবো না। আমরা দুটো ভাই এখন প্রতিবন্ধী কিভাবে চলবে সামনের দিনগুলো? কিভাবেই বা বেঁচে থাকবো ভেবে অস্থির হয়ে উঠি। ছোট্ট চায়ের দোকান বেচাকেনা ভাল হয়। কিন্তু টাকার অভাবে সেভাবে পণ্য তুলতে পারিনা। সরকারি কোন সহযোগিতা কিংবা সহজ শর্তে যদি ঋণ পেতাম তাহলে এই ব্যবসা থেকেই হয়ত বৃদ্ধ পিতা, মা ও পঙ্গু ভাইয়ের মুখে দুবেলা দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে পারতাম।

 

Lab Scan