চার বছরে বরাদ্দ ৮২৩ কোটি টাকা, তবু ডোবে খুলনা নগরী

0

খুলনা সংবাদদাতা॥ খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ ছয় হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরেই বরাদ্দ হয় ২৬ কোটি টাকা। চার বছরে এত টাকা বরাদ্দের পরও সামান্য বৃষ্টিতে নগরীতে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা। গত বুধবার দুপুরে খুলনায় ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে তলিয়ে যায় নগরীর অলিগলি। নগরীর রয়েল মোড়, শান্তিধাম মোড়, শামসুর রহমান রোড, বাইতিপাড়া, মতি মসজিদ রোড, ফুল মার্কেট, মডার্ন ফার্নিচার মোড়, টুটপাড়া কবরখানা রোড ও রূপসা ঘাটের আশপাশ এলাকাসহ শহর ও পাড়া-মহল্লার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও পানি ঢুকে যায়। এতে বিভিন্ন মালামাল ভিজে ক্ষতি হয় ব্যবসায়ীদের। এ ছাড়া বৃষ্টিতে যানবাহন কমে যাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। নগরীর কেডিএ অ্যাভিনিউ এলাকার হাফিজুর রহমান জানান, ড্রেন উঁচু হওয়ায় বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকছে। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।KCC-2গন্তব্যে পৌঁছাতে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্ট লিমিটেডের প্রকৌশলী খোরশেদুর আলম বলেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে রূপসা নদীর পানির উচ্চতা দুই দশমিক ৮৩ মিটার। অথচ মহানগরীর সড়কগুলোর উচ্চতা এক দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ মিটারের মধ্যে। কেসিসির তথ্যমতে, ৩১টি ওয়ার্ডে কেসিসির আয়তন ৪৫ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। ওয়ার্ডগুলোতে রয়েছে এক হাজার ১৬৫ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার ড্রেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে এসব ড্রেনের অবস্থা বেহাল। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘবে জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে মোট ৮৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কেসিসি। প্রকল্পের আওতায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭টি ড্রেনের উন্নয়ন কাজ চলছে। কেসিসির পরিকল্পনাবিদ আবিরুল জব্বার বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে ১২টি খাল, কয়েকটি ড্রেন নির্মাণ ও ১০ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি খাল, ৮০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, চারটি পাম্প হাউজ ও তিনটি স্লুইস গেট উন্নয়নের কাজ চলছে।KCC-3পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় তৈরি হচ্ছে নোংরা পরিবেশকেসিসি সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর ভেতরে চারটি সড়ক সংস্কার ও ড্রেন পুনর্নির্মাণের জন্য ৩৫ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এমজিএস প্রকল্পের অধীনে কেডিএ এভিনিউ এবং ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু আহমেদ সড়ক ড্রেন ও ফুটপাত পুনর্নির্মাণ করা হয়। প্যাকেজের আওতায় শিববাড়ি মোড় থেকে রয়েল মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ড্রেন নির্মাণ ও সড়কটি কাপের্টিং করা হয়েছে। প্রকল্পের ঠিকাদার তসলিম আহমেদ আশা বলেন, কেডিএ এভিনিউয়ের উন্নয়ন কাজ শেষ করে গত ৩১ মার্চ কেসিসিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্যাকেজের খালিশপুরের কাজটিও গত ৩০ জুন বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।KCC-4দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ড্রেনের অবস্থা বেহালখুলনা সিটির মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে নগরীর সড়ক ও ড্রেনেজ, তথা জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যে ক্ষতি নিয়মিত হচ্ছে তা মোকাবিলা, অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলাসহ বস্তি এলাকার রাস্তাঘাট, ড্রেন ও ল্যাট্রিনসহ শিক্ষার মান সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা চলতি অর্থবছরের বাজেটে রয়েছে। এই অর্থবছরের জন্য কেসিসি ঘোষিত বাজেটে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় কেসিসি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও উন্নয়ন প্রকল্পে’ দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এদিকে মহানগরী ঘিরে মোট ২২টি খাল রয়েছে। দখলে থাকার ফলে এগুলোর বেশিভাগরেই আয়তন সংকুচিত। এ কারণে শহরে পানির চাপ বাড়ে। ফলে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। ময়ূর নদ খননের পরও নোংরা পরিবেশ ও নগরীর পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। ২০০৯ সালে খালের দখলদারদের একটি তালিকা তেরী করেন তৎকালীন মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। ওই তালিকায় শহর ও শহরতলির ৫০টি খাল দখলের সঙ্গে ৮১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকার তথ্য উঠে আসে। KCC-5ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৮৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কেসিসিতালিকায় দেখা যায়, ৫০টি খালের মধ্যে ১১টির কোনও অস্তিত্ব নেই। বাকি ৩৯টি খালের ৭০ শতাংশ অবৈধ দখলে রয়েছে। ২০১১ সালে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন হয়। সেখানে এক হাজার ১৬৫ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও খালগুলো পুনঃখনন, চারটি শক্তিশালী পাম্প হাউজ স্থাপন ও ৩৫ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের বিষয় উল্লেখ হয়। ২০১৬ সালেও নগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ সম্পন্ন হয়। নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় তখন নির্মাণ করা হয় ১৩টি ড্রেন। এর মধ্যে খালিশপুরে বিআইডিসি সড়কের উভয় পাশে আট হাজার মিটার পাইপ ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হয় ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া খালিশপুরে ১২ ও ১৮ নম্বর সড়কে ১৬ হাজার মিটার পাইপ ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হয় ৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এতে অর্থায়ন করে এডিবি।

Lab Scan