চামড়া নিয়ে ‘চামবাজি’

আমীর হামযা
চামড়া যাদের নিত্যসঙ্গী, সেই চর্মকারদের গ্রামবাংলায় বলা হয় ‘চামার’। কেউ অশোভন আচরণ করলে আড়ালে-আবডালে চামার সম্বোধন করা হয়। আবার অর্থসম্পদের ব্যাপারে চুল পরিমাণ ছাড় না দিলে বলতে শোনা যায়, ব্যাটা একটা আস্ত ‘চামার’। এখন দিন বদলেছে। নাগরিক জীবনে চামারেরা জাতে উঠেছেন। তাদের উপাধি ‘পাদুকাশিল্পী’। হাল আমলে চামড়া নিয়ে যাদের কায়কারবার, তাদের সমীহের চোখে দেখা হয়। তারা ‘ট্যানারি মালিক’। চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন যে কারখানায় হয়ে থাকে, মোটাদাগে তা পাদুকা শিল্প; মানে ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি। সেই চামড়া ব্যবসায়ী, আড়তদার আর ট্যানারি মালিকদের ত্রিমুখী আঁতাতে দেশে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি চক্র। এটি বাম বা ডানদের আদর্শ প্রচারের পাঠচক্র ধরনের কোনো কিছু নয়, স্বার্থসংশ্লিষ্ট চক্র। তাদের কারসাজিতে এবার দেশে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পরিণামে চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হকদারেরা বঞ্চিত। ‘পানির দর’ বলে একটা কথার প্রচলন আছে, এ বছর কোরবানির চামড়া সেই দরে বিক্রি হয়েছে। ভুল বলা হলো- বাজারে যেসব কোম্পানি খাবার পানি বাজারজাত করে; তা চড়াদামেই কিনে খেতে হয়। ফলে ঘুরিয়ে বলতে হবে, কোরবানির চামড়া ‘মাগনা’ মিলেছে। অর্থাৎ ‘ফাউ’। ঠকবাজির চতুর এ কৌশল সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সংশ্লিষ্ট ত্রিপক্ষীয় ‘সমঝোতা’ শিল্পকলায় উন্নীত হয়েছে। এমন চালের (কূটকচাল) উদ্ভাবকদের নিন্দা না করে উচিত বাহবা দেয়া। সহি তরিকা। এতিমের হক মেরে হক কাজটিই যেন করেছেন তারা।
‘হক’ একটি আরবি শব্দ। বাংলায় সত্য আর অধিকার দুই অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে সাধারণত কোরবানির পশুর চামড়া বা এর বিক্রিকৃত অর্থ দান করা হয়। আবহমানকাল থেকেই এমন রেওয়াজ গড়ে উঠেছে মুসলিম বিশ্বে। এ দান এতিমখানা, মাদরাসাসহ দুস্থ-দরিদ্র জনগোষ্ঠী পায়। কিছু মওসুমি ব্যবসায়ীও কোরবানির চামড়া কিনে দু-চার পয়সা কামিয়ে নেন। একটু বাড়তি আয়ের আশায় ঈদের আনন্দ মাটি করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন তারা। আক্ষরিক অর্থেই তাদের ছোটাছুটি এবার বৃথা। উপরে উল্লিখিত পক্ষগুলোই কোরবানির চামড়া বা এর বিক্রি করা অর্থের প্রকৃত হকদার। সমাজে এতকাল তাদেরই দাবি ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এবারের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের হক হাতছাড়া হয়ে গেছে। আরবি কায়দায় বললে বলতে হয়, মাহরুম; মানে বঞ্চিত। অধিকার পুরোটাই মাঠে মারা গেছে। এক অর্থে ছিনতাই হয়েছে। চামড়া নিয়ে অর্থের কাঙালরা ‘এলাহি কাণ্ড’ ঘটিয়েছেন। তারা ছিলেন খানিকটা নির্লজ্জ। মালকড়ি কামাতে নাকি বেহায়া হতে হয়। এ বিদ্যা তাদের ভালোই জানা। রপ্ত করেছেন শৈল্পিকভাবে। তাদের জীবনে শরমিন্দা হওয়ার বিষয়টি নির্বাসিত। তাই তো চামড়ার পুরো লাভ চালান হয়ে গেছে আড়তদার, ব্যবসায়ী আর ট্যানারি মালিকদের পকেটে। এই তিন চক্রের চালাকিতে গরিবের অর্থ তাদের উদরস্থ হয়েছে। এক কথায়, লালসার আগুনে পুড়ে ছাইচাপা বঞ্চিতদের হক।
এ দিকে অন্য সব বছরের মতো. এ বছরও মহল্লার ছেলেপেলে, মানে মওসুমি ব্যবসায়ীরা ‘টু-পাইস’ কামানোর ‘ধান্ধা’য় কোরবানির চামড়া পেতে বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলেন। আড়তদারেরা বেশি দাম দেবেন না এ শঙ্কা আগেই ছিল। সে কারণে লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া তারা গৃহস্থের কাছ থেকে কিনেছিলেন মাত্র তিন-চার শ’ টাকায়। তখন চামড়াপ্রতি দু-তিন শ’ টাকা মুনাফার আশা ছিল। অনেকেই ধারদেনা করে তিন-চার লাখ টাকার চামড়া কিনেছেন। কিন্তু আড়তদারদের ‘চোখ উল্টে’ যাওয়ায় সে আশার গুড়েবালি। এতে আড়তদারদের দোষ দেয়া যায় না। তাদের কথাও কানে নিতে হয়। একপক্ষের কথা শুনলে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আড়তদারদের বয়ান- রাখার জায়গা নেই, এত চামড়া কিনলে রাখব কোথায়? সত্যিই তো। রাখার জায়গা না থাকলে চামড়া কিনবেন কেন? এতে মওসুমি ব্যবসায়ীদের মাথায় বাজ পড়লে কী করার আছে? ব্যবসা হচ্ছে লাভ-ক্ষতির সমীকরণ। তারপরও মওসুমি ব্যবসায়ী, মানে মওসুমিরা আড়তদারদের হাতে-পায়ে ধরে মন গলাতে চেষ্টা করেছেন। যেসব আড়তদারের দিলে রহম ছিল, তিন শ’ টাকার চামড়ার দাম দয়াপরবশ হয়ে পঞ্চাশ টাকা দিতে রাজি হন তারা। এ অবস্থায় মনের দুঃখে চামড়া রাস্তায় ফেলে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলেন ‘মওসুমিরা’। এটি মোটেও ঠিক হয়নি। যা দিতে চেয়েছেন, তা নিলেও তো ক্ষতি একটু পুষিয়ে যেত। পাগলও নিজের বুঝ ভালো বোঝে। ‘মওসুমিরা’ তা বুঝতেও ব্যর্থ। বুদ্ধি না থাকলে তো ব্যবসায় লস হওয়া স্বাভাবিক। আর একটা কথা, মওসুমিরা তো মওসুমি পাখি হয়ে এ খাত থেকে দিন কয়েক পরেই উধাও হয়ে যান। এ জন্য উল্টো কেন তারা সড়কে চামড়া ফেললেন এবং মাটিতে পুঁতলেন, সে বিষয়ে তত্ত্ব-তালাশ জরুরি। যারা এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাদের জানা উচিত, গরিবের মান-অভিমান থাকতে নেই। তাতে আখেরে লাভ হয় না। চর্ম তেজারতিতে মওসুমিদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি বর্তমানে নস্যি। হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির গল্প শুনতে শুনতে আমজনতা এখন আর শত কোটি টাকার কথা শুনেও মালুম করে না। হয়তো সেই কারণে সরকারের দিক থেকেও এ নিয়ে কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না। ঈদের আগে সরকার চামড়া বেচাকেনায় যে ফরমান জারি করেছিল, তার ধারেকাছেও চর্মব্যবসায়ীরা নেই। সরকারের বেঁধে দেয়া দামে যখন ধান-চালই বিক্রি হয় না, তখন চামড়ার বেলায় এর বেশি আশা করা যায় কিভাবে?
দাম কম হলে মন্দ কী! তাতে ত্রিপক্ষীয় চক্রের পোয়াবারো। এর বদৌলতে বাড়তি শত শত কোটি টাকা আয়। অপ্রত্যাশিত আয়ে এখন তারা আত্মহারা। প্রতিটি গরুর চামড়া থেকে গড়ে ৮০০ টাকা মুনাফা করতে ছিলেন পাগলপারা। কম দামে কিনে আর রফতানির অনুমতি পেয়ে হাজার কোটি টাকা হাতানোর মওকা মিলেছে। শুধু মন খারাপের বিষয় হলো, এ মুনাফার বেশির ভাগ অংশ হস্তগত হবে আড়তদার-ব্যবসায়ীদের। রফতানির অনুমতি মেলায় এবার তেমন সস্তায় চামড়া কিনতে পারছেন না বলে ট্যানারি মালিকদের গোস্বা। এতে ‘ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না হওয়ার’ রব উঠেছে। ট্যানারি মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিলে বিষয়টি বেইনসাফিই বটে! সাধারণের ভাষায়, চোরের ওপর বাটপারি। তবু লাভের গুড় একটু হলেও থাকছে। এতেই সান্ত্বনা খুঁজতে হচ্ছে তাদের। নীতিকথা যতই আওড়াই না কেন, সুযোগ পেলে তা কে হাতছাড়া করে? বোকারা ছাড়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করেননি, সব সমাজে এটি বিরল। টাকা দেখলে কাঠের পুতুলও নাকি হাঁ করে। ঝোপ বুঝে কোপ না মারলে জীবনে সাফল্যের দেখা মেলে না। দোষ যদি কারো হয়ে থাকে, তা হয়েছে যাদের বাজার তদারকির কথা, তাদের। নজরদারি না করলে তো ফল কারো না কারো ঝুড়িতে জমা হবেই। ফলে এই তিন পক্ষকে দোষারোপ করা অযৌক্তিক। ‘দুষ্টচক্র’ বলাও অন্যায়। নজর দেয়ার কথা যাদের, তাদের নজরদারির ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপানো অন্যায়। একজনের দোষে অন্যের সাজা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আদালতি ভাষায় ‘অবিচার’। তবে নজরদারির দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা হয়তো ‘নজর দেয়াকে’ ঋণাত্মক অর্থে নিলে তা থেকে বিরত থাকতে পারেন। খামাখা নিজেদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের কোনো মানে হয় না। এ ঘটনায় কী এমন হয়েছে? শুধু গরিবের হক নষ্ট হয়েছে। দেশে বহুভাবেই গরিবের অধিকার ক্ষুণœ হয়ে আসছে। চামড়ার দরপতনকে স্বাভাবিক ভাবলেই সব ‘ল্যাঠা’ চুকে যায়। ঝামেলা থাকে না। বিগত সাত বছর ধরেই কোরবানির চামড়ার দর পড়তির দিকে। এবার না হয় তলানিতে ঠেকেছে। তা নিয়ে এত কথা!
বিকল্প চিন্তা করলে এটি ‘ইতিবাচক’। দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য- সব কিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। ঠিক এর বিপরীত চিত্র কাঁচা চামড়া আর ধান-চালের দরে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জিনিসের দাম বেঁধে দিলে অর্থাৎ নির্ধারণ করলে তা কেউ মানতে চায় না। ধান-চাল আর চামড়ার বেলায় শুধু ব্যতিক্রম। অন্তত দু-একটি পণ্য সস্তায় মিলছে। এও বা কম কী! যারা নিজেদের জ্ঞানীগুণী মহাজন ভাবেন, তাদের কথা আলাদা। তবে রাষ্ট্রে-সমাজে ভিন্নমত থাকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য স্বাস্থ্যকর। নিন্দুকেরা বলছেন, ত্রিমুখী চক্রের অশুভ আঁতাতে ষড়যন্ত্র করে চামড়ার বাজারদর তলানিতে নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছেন তারা। এখানে নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। পুঁজির সর্বগ্রাসী চরিত্রই উৎকটভাবে ধরা পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সামাল দিতে পারেনি। মধ্যস্বত্বভোগীরা চামড়ার দরপতন ঘটিয়ে ‘চামবাজি’ করে গরিবের হক মেরেছে। তাদের অতি চালাকিতে সরকারও ধরাশায়ী। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে। ‘দেখি কী করা যায়’ মার্কা আচরণ। তবে সমালোচকেরা বেমালুম ভুলে যান, আগে গেরস্তের তাগড়া ষাঁড় মরলে সেই পশুর চামড়া নিতে চর্মকারদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত। চর্মকার মরা গরু নিয়ে যাওয়ার সময় ‘খুশি হয়ে’ গেরস্তের হাতে শ’খানেক টাকা গুঁজে দিতেন। এখন সেই চামারও নেই, আগের সেই চাহিদাও নেই।
চামড়ার দরপতনে রাজা হবুচন্দ্রের কথা মনে পড়ে গেল। বেচারার সত্যিই কপাল খারাপ। তার জন্য আমাদেরও মন খারাপ হয়। তখনো ‘জুতা আবিষ্কার’ হয়নি। পাদুকা উদ্ভাবনের আগের জমানা। ‘আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি, রাজ্যে মোর এ কী অনাসৃষ্টি!’ বলে হবুচন্দ্র রাজা চিৎকার করছিলেন। রাজার পায়ে যাতে ধূলিকণা না লাগে, সেই কায়দা বাতলাতে ‘উনিশ পিপে নস্য’ খরচ করে যে কয়টা বুদ্ধি বের করলেন পণ্ডিতেরা, তার একটি ‘চর্ম দিয়া মুড়িয়া দাও পুরো পৃথ্বী’। পরে দেখা গেল, ধুলার হাত থেকে পা বাঁচাতে পথঘাট মুড়ে দেয়ার পর্যাপ্ত চামড়া মিলছে না। এসব পণ্ডিত যদি দাঁতে দাঁত চেপে একটু ধৈর্যধারণ করে এবারের কোরবানির ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন, তাহলে চামড়ার অভাব হতো না। টাকা-পয়সাও লাগত না। চট্টগ্রামের রাস্তায় একবেলা চামড়া কুড়ালেই কেল্লাফতে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, বাংলার মাঠে-ঘাটে-হাটে এবার যে পরিমাণ চামড়া পড়ে ছিল, তা দিয়ে হবুচন্দ্র রাজার সব সদর রাস্তা অনায়াসে মুড়ে দেয়া যেত।
camirhamza@yahoo.com

ভাগ