খেলাপি ঋণ সিএসআর হিসেবে গণ্য করার আবেদনে ‘না’

গবেষণার নামে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতে না পেরে এখন সে ঋণ সিএসআর খাতে অন্তর্ভূক্ত করার আবেদন করেছে ঋণ গ্রহিতা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে খেলাপি ঋণ সিএসআর খাতে নেয়ার কোন সুযোগ নেই।
সূত্র জানায়, ঋণ নিয়েছিলো ব্যক্তিগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য। আট বছর পার হয়ে গেলেও তা পরিশোধের কোনো খোঁজখবর নেই। ফলে ঋণখেলাপির তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঋণ আদায় না করে তা সামাজিক দায়বদ্ধতা সিএসআর খাতে হস্তান্তর করার জন্য আবেদন করেন ফেরদৌস বায়োটিক (প্রা.) লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ড. ফেরদৌসী বেগম। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি অবহিত করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টিকে সিএসআর খাতে নেয়ার সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আলোচ্য প্রকল্পকে গবেষণা প্রকল্প বিবেচনা করে সিএসআর খাতে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। চিঠি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জুলাইয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক এ চিঠি দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্ঠাচার বা নীতি যা সমাজের প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্য অন্তর্ভুক্ত করে। একটি ব্যবসা নৈতিক ও আইনগতভাবে পরিচালিত হলেই এর সমস্ত দায়মুক্তি হয়েছে তা বলা যায় না। যে পরিবেশে বা যে সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সেই সমাজের প্রতি প্রতিষ্ঠানের কিছু দায়বদ্ধতা জন্মায়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই সিএসআর বা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করছে এবং তাদের শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের কিছু অংশ এই খাতে বরাদ্দ রাখছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দায়বদ্ধতা পূরণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় নামে এবং নিয়ম প্রতিপালনের ঊর্ধ্বে চলে যায়। সে ক্ষেত্রে সরকার আইন করে সেখানে সিএসআর নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন লাভে থাকে তখনই এ খাতে ব্যয় করা যায়। এদিকে লক্ষ্য করলে এ বছর ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে জনতা ব্যাংক।
গত জুন শেষে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। ফলে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের দিক দিয়ে সরকারি ব্যাংকের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের। এক বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১১ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া্ ঋণে অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকটি বেকায়দায় রয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সচিবালয়ে দেয়া চিঠিতে বলা আছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর জারিকৃত জিবিসিএসআরডি সার্কুলার নং ৭ এর সকল বিধানাবলি পরিপালন করে তাদের নিজস্ব সিএসআর ব্যবস্থাপনায় সামাজিক ও পরিবেশ দায়বদ্ধতাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বৃহৎ আকারে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক আটটি নির্ধারিত খাতে সিএসআর ব্যয় সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিমালা কোনো ঋণ অথবা কোনো পুনঃঅর্থায়ন স্কিম অথবা সুদ ভর্তুকি স্কিম করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে গণ্য করা হয়নি। ড. ফেরদৌসী বেগমের আলোচ্য বীজ উৎপাদনকারী গবেষণা প্রকল্পটির বিস্তারিত পর্যালোচনায় এ মর্মে পরিলক্ষিত হয় যে, প্রকল্পটির অনুকূলে গৃহীত সমুদয় ঋণ (জনতা ব্যাংক লি. তিন কোটি টাকা এবং ইইএফ দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা, মোট ৫.২৫ কোটি টাকা মাত্র) মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত সিএসআর নীতিমালায় এ ধরনের প্রকল্প বিশেষ করে এসব মন্দ ঋণে জর্জরিত কোনো প্রকল্পকে গবেষণা ফান্ড বিবেচনা করে সিএসআর খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সিএসআরের যে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাতে ব্যত্যয় ঘটবে বলে প্রতীয়মান হয়। সার্বিক বিবেচনায় আলোচ্য প্রকল্পকে গবেষণা ফান্ড হিসেবে বিবেচনা করে সিএসআর খাতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

ভাগ