খুলনায় ভাসমান বেডে সবজি চাষে নাজমা বেগম সফল,কৃষকদের মাঝে আশার সঞ্চার

মো. জামাল হোসেন, খুলনা ॥ বাড়ির পাশের জমিতে থৈ থৈ পানি। ওই পানিতে কচুরিপানাপূর্ণ থাকার কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস কোনো ফসল চাষ করতে পারেন না নাজমা বেগম। অথচ এ বছর তিনি জলমগ্ন এ জমির কচুরিপানা স্তুপ করে ভেলার মতো ধাপ তৈরি করে তার ওপর উন্নত পদ্ধতিতে লাউ ও লালশাক চাষ করে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছেন। তাকে দেখে আশপাশের নারীরাও ভাসমান বেডে সবজি চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। সফল নারী নাজমা বেগম খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার নেবুদিয়া গ্রামের কৃষক ইসমাইল শেখের স্ত্রী।
নাজমা বেগম জানান, তিনি তেরখাদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এ বছর জলাবদ্ধ জমিতে কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে তার ওপর লাউ ও লালশাক চাষ করতে উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি পাশাপাশি চারটি ভাসমান বেডে সবজি চাষ করেছেন। পানির ওপর কচুরিপানা দিয়ে ৩০ হাত লম্বা, ৪ হাত চওড়া ও ৩ হাত উঁচু করে প্রতিটি বেড তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। নাজমা বেগম জানান, তেরখাদা উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে ভাসমান বেড তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়েছে। এ বেড থেকে এ পর্যন্ত তিনি ২৭০ কেজি লাউ এবং ১৫০ কেজি লালশাক উৎপাদন করেছেন। প্রতি কেজি লাউ ১০ টাকা দরে মোট ২ হাজার ৭০০ টাকা এবং প্রতি কেজি লালশাক ১৫ টাকা দরে মোট ২ হাজার ২৫০ টাকাসহ ৪ হাজার ৯৫০টাকা বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। আরও লাউ ও লালশাক বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি জানান। এ কাজে তার স্বামী ইসমাইল শেখ ও দুই ছেলে আজগর ও জোবায়ের তাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাছাড়া ওই এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিহাদুল ইসলাম শেখ সব সময় এ বেডের সবজি দেখাশুনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলমগ্ন জমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষ প্রযুক্তিটি এলাকার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা আগামীতে আরও ব্যাপক এলাকার ভাসমান বেডে সবজি চাষ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভাসমান বেডে সবজি চাষ প্রদর্শনীভুক্ত কৃষকরা হলেন- ফারুক মোল্লা, শ্যাম সরকার, ছিয়ারুন নেছা, আসমা, এহিয়া, আব্বাস আলী, মনিরুজ্জামান, গোলাম মোস্তফা, নাজমা বেগম, বিউটি বেগম, মনোয়ারা বেগম, মৃণাল বিশ্বাস, দুলালী বিশ্বাস, হরিশ বিশ্বাস, অনিতা বিশ্বাস, ডালিম বেগম, সোহরাব মোল্লা, মান্নু শিকদার, বুরুজা খাতুন, মন্নু শেখ, জোসনা বেগম ও আব্দুল্লাহ শেখ। তারা জানান, ভাসমান বেডে খরিপ-২ মৌসুমে শসা, করলা, উচ্ছে, লাউ, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, মরিচ, ধনিয়া, ডাঁটাশাক, ঢেঁড়শ, লালশাক এসব সবজি চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
কৃষকদের মতে, জলাবদ্ধ এলাকার দরিদ্র কৃষকদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ভাসমান বেডে সবজি ও মশলা চাষ কৃষি প্রযুক্তিটি উন্নতকরণ ও এর সম্প্রসারণ করা একান্তভাবে দরকার।
তেরখাদা উপজেলা কৃষি অফিসার কাজী শাহনেওয়াজ জানান, ভাসমান বেডে সবজি চাষ একটি লাভজনক প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে জলমগ্ন অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা যায়। এটি পরিবেশবান্ধব ও জৈব পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে খুব কম সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করা যায়। চাষের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। এতে জলাবদ্ধ এলাকার কচুরিপানা ও জলজ আগাছার সদ্ব্যবহার হয়।
তিনি আরও জানান, তেরখাদা উপজেলার নিচু এলাকাসমূহ (বিশেষ করে ভূতিয়ার বিল, নলামারা বিল) বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস (সাধারণত জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত) জলমগ্ন ও পতিত থাকে। এ সময় এসব এলাকার জমি কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় পূর্ণ থাকে। এ কারণে জলমগ্ন জমিতে কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না। নিচু এলাকার এসব জলমগ্ন পতিত জমি চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যে তেরখাদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্যোগে ‘ভাসমান বেডে সবজি ও মশলা চাষ গবেষণা, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পের আওতায় এ বছর খরিপ-২ মৌসুমে এসব এলাকায় ২২টি ভাসমান বেডে সবজি প্রদর্শনী স্থাপনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় আজগড়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামে ২টি, পশ্চিম শেখপুরায় ১টি, বারাসাত ইউনিয়নের হাড়িখালি গ্রামে ১টি. বারাসাতে ৩টি. সাচিয়াদাহ ইউনিয়নের কামারোল গ্রামে ৩টি, নাচুনিয়ায় ১টি, কড়লিয়া গ্রামে ১টি, ছাগলাদাহ ইউনিয়নের নেবুদিয়া, চরকুশলা ও রাজনগর গ্রামে ১টি করে, তেরখাদা সদরে ৪টি, বলর্ধনা গ্রামে ২টি ও আদমপুর গ্রামে ১টি প্রদর্শনী বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ভাগ