খালেদা জিয়া ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন : আবরার হত্যার দায় আ’লীগ এড়াতে পারে না : রিজভী

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার দায় ছাত্রলীগের অভিভাবক হিসেবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ একটার পর একটা ভয়ঙ্কর অপকর্ম করে যাচ্ছে। রোববার সকালে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকা ও দেশ বিক্রি করার জন্য আইন আদালতকে কব্জা করে বেগম খালেদা জিয়ার জামিনে বাধা দেয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগ সম্পর্কে তিনি বলেন, গণতন্ত্র হত্যা করে বর্তমান সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকায় গত এক দশকে ছাত্রলীগ মনুষ্য চরিত্র হারিয়ে বন্য পশুর চরিত্র নিয়েছে। সেই চরিত্রেরই সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ বুয়েটে আবরার হত্যাকান্ড। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ একটির পর একটি ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটানোর পর বেরিয়ে আসতে শুরু করে সারাদেশে তাদের ভয়ঙ্কর অপকর্মের কথা। এখন গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের টর্চার সেলের কথা। এটি তো নতুন নয়। নিকট অতীতে, লগি বৈঠা হাতুড়ি চাপাতি নিয়ে সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগ যখন বর্বর আক্রমণ চালিয়েছিল, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নির্যাতন চালিয়েছিল তখনো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল ছাত্রলীগের টর্চারে সেলের কথা। তখন যদি ছাত্রলীগের বর্বরতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে আবরার হত্যাকান্ড ঘটতো না।
রিজভী বলেন, ঠাণ্ডা মাথায় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ছয়টি ঘন্টা ধরে নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলার মতো নৃশংসতা কোনো সভ্য রাষ্ট্র কল্পনাও করতে পারে না। আবরার হত্যাকাণ্ডের দায় ছাত্রলীগের অভিভাবক আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, আজ বড় বিষণ্নতার সাথে জানাচ্ছি, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জনপ্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারিরীক অবস্থার আশংকাজনক অবনতি ঘটেছে। তিনি ৬১৩ দিন ধরে বন্দী। কারাগারে নেয়ার সময় সম্পূর্ণ সুস্থ, দেশনেত্রী এখন হুইল চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারেন না। তিনি কারো সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পারেন না। নিজের খাবার নিজে খেতে পারেন না। মাথার চুলও বাঁধতে পারেন না। তার পোশাকও আরেকজনকে পরিয়ে দিতে হয়। হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। হাত-পায়ের আঙ্গুল ফুলে গেছে। এ অবস্থায় তিনি পিজি (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের আট বাই দশ ফুটের ছোট্ট কক্ষে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি জানান, পঁচাত্তর বছর বয়সী নেত্রীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বারবার ইনস্যুলিন পরিবর্তন এবং ইনস্যুলিনের মাত্রা বৃদ্ধি করার পরও কোনো অবস্থাতেই তার সুগার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো সময় এটি ২৩ মিলিমোল পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে খাবারের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়াতে শরীরের ওজন অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। যথাযথ চিকিৎসার বিষয়ে আমরা বারবার দাবি করা সত্ত্বেও দেশনেত্রীকে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি বিশিষ্ট দেশের কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। তার জরুরিভাবে উন্নত চিকিৎসা দরকার। ব্যাথার কারণে তার ঘুম হচ্ছে না এবং সারাক্ষণ তিনি অস্থির থাকছেন। রিজভী আরো জানান, আর্থ্রাইটিস ও ফ্রোজেন শোল্ডার সমস্যার কারণে স্বাস্থ্যের আরো গুরুতর অবনতি ঘটছে। ঘাড়-মাথা সোজা রাখতে পারছেন না। কয়েক বছর আগে অপারেশন করা চোখ এবং হাঁটুর ব্যাথা ক্রমশ বৃদ্ধির ফলে অসহ্য ব্যথায় কাতরাচ্ছেন ‘গণতন্ত্রের মা’। দেশবাসী দেশনেত্রীর জীবনের পরিণতি নিয়ে অজানা আতঙ্ক ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। সরকার অমানবিক এবং বেআইনি কাজে এতো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, তারা বেগম খালেদা জিয়ার বিপজ্জনক অসুস্থতায়ও ভ্রুক্ষেপ করছে না।
রিজভীর অভিযোগ, সরকারের অমানবিক ও অসুস্থ আচরণ প্রমাণ করে দেশনেত্রীকে প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র করছেন তারা। বেগম জিয়ার সুচিকিৎসা হচ্ছে না। দেশনেত্রীর প্রাণনাশ করার গভীর নীলনকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত অবৈধ সরকার তার জামিনে বাধা দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বিএসএমএমইউ’র পরিচালককে দিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলানো হচ্ছে- ‘খালেদা জিয়া ভালো আছেন, তার অবস্থার কোনো অবনতি হয়নি।’ কতটা অমানবিক হলে এতো বড় মনগড়া কথা তারা বলতে পারেন। জরুরি ভিত্তিতে তার উন্নত চিকিৎসা দরকার। অন্যথায় যে কোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আমরা আজই দেশনেত্রীকে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। রিজভী বলেন, গতকাল চিকিৎসা শেষে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথেই সাজানো মিথ্যা মামলায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী, খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ গ্রেফতার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানুষের চোখকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার অপকৌশলমাত্র। মেজর হাফিজের কণ্ঠকে স্তব্ধ করানোর জন্যই এ গ্রেফতার। চিকিৎসা শেষে অসুস্থ মেজর হাফিজ নিস্তার পেলেন না। কীর্তিমান দেশপ্রেমিক এ মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করে সরকার তার প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে চাচ্ছে। তার গ্রেফতার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আমরা এ মুহূর্তে তার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি। বুয়েটের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ১০ দফা শেখ হাসিনা কিংবা তাদের নিয়োগকৃত ভিসি এমনিতেই মেনে নেয়নি, তাদেরকে ১০ দফা দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। আবরার ফাহাদের মতো আর কোনো অসীম সম্ভাবনাময় জীবন যাতে ঝড়ে না যায় সেইজন্য বুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই ১০ দফা। সুতরাং, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের এই ১০ দফা মানার ঘোষণা দিলেই সরকারের সব অপরাধ মাফ হয়ে যায় না। শুধু বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ১০ দফা মানলেই পার পাওয়া যাবে না।
রিজভী বলেন, দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষ অসম এবং অধীনতামূলক ও সার্বভৌমত্ব বিপন্নকারী চুক্তির বাতিল চায়। দেশের জনগণ, গত একদশকে ভারতের সাথে করা সকল চুক্তির বিস্তারিত জানতে চায়। এই দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। হুমকি ধামকি দিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না। এই আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের গোলামীর জিঞ্জির ছিঁড়তে স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন। তিনি আরো বলেন, শুধু ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার লোভে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে যেহেতু একটি দেউলিয়া সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ফলে ছাত্রলীগের বৈশিষ্ট্য ভালো হবে, এটা আশা করাও বোকামি। আবরার হত্যাকান্ড দেশে-বিদেশে প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। সেই আবরার হত্যাকান্ড নিয়ে যখন আওয়ামী লীগের নেতারা মুখরোচক মন্তব্য করেন, তখন অনেকেই স্বগোতক্তি করেন- পাগলরা এখন আওয়ামী লীগ করে নাকি আওয়ামী লীগ করলে মানুষ পাগল হয়ে যায়।
রিজভী বলেন, ভারতের সাথে চুক্তির এক সপ্তাহ না যেতেই সেই ‘বন্ধুরা’ই আমাদের কয়েকজন র‌্যাব সদস্যকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে বেধড়ক পিটিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর এতো বড় অন্যায়ের খবর পত্রপত্রিকায় দেখে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু শুধু মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য এই তাঁবেদার সরকার সামান্য প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না। প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তে পাখির মতো মানুষ হত্যা করছে বিএসএফ। মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অথচ বিএসএফ’র বন্দনা করছে এ সরকার। তিনি আরো বলেন, দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল ও বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বিএনপির কর্মসুচি ঘিরে পুলিশ আওয়ামী লীগের স্বভাবের মতোই আচরণ করেছে। নয়াপল্টনে সভায় আসতে থাকা কয়েকশ নেতা-কর্মীকে পুলিশ বিনা উস্কানিতে গ্রেফতার করেছে। ফরিদপুরে পুলিশ আক্রমণ চালিয়ে সভা পন্ড করেছে এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের সাথে পুলিশ প্রচন্ড দুর্ব্যবহার করেছে। আমরা গ্রেফতারি অভিযানের তীব্র নিন্দা জানাই। অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি করছি এবং পুলিশি আচরণের তীব্র ন্দিা জানাচ্ছি। এছাড়া আজ একই দাবিতে সারাদশে জেলায় জেলায় জনসমাবেশ করবে বিএনপি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাতের ভূমিকা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বিএনপির কর্মসূচিকে বাধা দেয়াই যেন তার একমাত্র কাজ। তিনি বিএনপির কোনো কর্মসূচি কুষ্টিয়ায় হতে দেন না। এমনকি শহীদ আবরার ফাহাদের পরিবারকেও তিনি নানাভাবে হুমকি ধামকি দিয়েছেন। বর্তমানে শহীদ আবরারের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনযাপন করছে। এ মুহূর্তেই কুষ্টিয়ার এসপির ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং কুষ্টিয়া থেকে অপসারণের দাবি জানাচ্ছি।

ভাগ