কেশবপুর আওয়ামী লীগ, বঞ্চিত হলেন এবারও স্থানীয় নেতারা

সুন্দর সাহা॥ যশোরের ঐতিহ্যবাহী উপজেলা কেশবপুর। প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য ছাড়াও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ভারতের অন্যতম সূতিকাগার কেশবপুরে আওয়ামী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে নেতৃত্ব শূন্যতা। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এমএনএ সুবোধ মিত্রের মত মানুষ দল ছেড়ে চলে যান। সাবেক এমপি আব্দুল হালিমের মত ব্যক্তিত্বরা হারিয়ে যান। এইচএম আমির হোসেনের মত পোড় খাওয়া নেতা বারবার বঞ্চিত হন। দলের নেতা-কর্মীদের ঠেলাঠেলিতে বারবার মনোনয়ন নামের সোনার হরিণ আর ধরা হয়ে উঠে না স্থানীয় নেতা-কর্মীদের। স্থানীয় নেতাদের বঞ্চিত করে তাদের স্থলে দলীয় মনোনয়ন পান বহিরাগতরা। ইতিপূর্বে সাতবার ঢাকায় বসবাসকারীদের করা হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এছাড়া অভয়নগর, মনিরামপুরের রাজনীতিকদের প্রার্থী করা হয়েছে। এবার উপ-নির্বাচনে দলের এক ডজন প্রার্থীর মধ্যে তিনজন প্রার্থী আলোচনায় ছিলেন। যাদের সবাই বহিরাগত। কেউ কেউ কেশবপুরে কোন এক সময় বাড়ি ছিল বলে দাবি করলেও এখানকার মানুষের সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক ছিল বলে কোন প্রমাণ মেলেনি। বর্তমানে তাদের বসবাস ভিনদেশে। যদিও এবারের কেশবপুরে উপ-নির্বাচনের মনোনয়ন দৌড়ে ভিনদেশিদের হটিয়ে দলীয় হাইকমান্ড থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন যিনি তিনিও বহিরাগত। দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিমত কেশবপুরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কয়েক ভাগে বিভক্ত। যার কারণে তারা বারবার বঞ্চিত হন। আর সুবিধা নিয়ে যান বহিরাগতরা। যা ধারাবাহিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। যে কারণে, দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতও থামছে না।
যশোরের ঐতিহ্যবাহী কেশবপুর উপজেলা জুড়ে রয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শন। ভরত ভায়নায় রয়েছে বৌদ্ধ বিহারের নিদর্শন ভারতের দেউল। মোঘলআমলের সুবেদার মীর্জা সফসিকানের হাম্মামখানা, সম্রাট আলীবর্দী খানের হেরেম খানা ও খানজাহান আলীর দিঘীসহ নানা ঐহিত্যে ভরপুর কেশবপুর উপজেলা। এছাড়া বিশ্ব ও দেশ বরেণ্য সব কবি-সাহিত্যিক-অভিনেতাসহ প্রশাসন ও বিচার বিভাগের উচ্চ পদে আসীনদের আবাসস্থল। তে-ভাগা আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, ডহুরী আন্দোলনসহ বাম আন্দোলনের পীঠস্থান চিরচেনা কেশবপুরের। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছাড়াও কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম ও প্রধান বিচারপতি চিত্তরঞ্জনের বাড়ি এই কেশবপুরেই। এছাড়াও এই উপজেলায় যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তারা হলেন বিখ্যাত অভিনেতা ও পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য, কথা সাহিত্যিক মনোজ বসু, মানকুমারী বসু, সু-সাহিত্যিক দিলারা হাশেমের বাড়ি এই কেশবপুরে। এছাড়া তে-ভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন পাঁজিয়া তথা এই কেশবপুরের সূর্য সৈনিকরা। বৃটিশ বিরোধী স্বদেশি আন্দলনে ঝাপিয়ে পড়েন এই কেশবপুরের বীর যোদ্ধারা। ডহুরী আন্দলনসহ বিভিন্ন বাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মননশীল চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ কেশবপুরের মানুষ। সেই কেশবপুরে আওয়ামী লীগের মত ঐতিহ্যবাহী দলের প্রার্থী সংকট ভাবিয়ে তুলেছে এলাকাবাসীকে। কেশবপুরের বহিরাগত প্রার্থীদের আনা গোনা শুরু হয় ১৯৭৩ সাল্ েকেশবপুর মনিরামপুর এক সংসদীয় আসন হওয়ার পর তৎকালীন এমএনএ সুবোধ মিত্রকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেয়া হয় মনিরামপুরের পিযুষ ভট্টাচার্যকে। তিনি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালে সাবেক এমপি আব্দুল হালিম ও আমির হোসেনকে বাদ দিয়ে ঢাকা থেকে দলীর মনোনয়ন দেয়া হয় সাবেক আমলা এএসএইচকে সাদেককে। তিনি নির্বাচিত হন এবং দায়িত্ব পান শিামন্ত্রীর। ২০০১ সালেও দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয় সাবেক শিামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেককে। ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পান অভয়নগরের আব্দুল ওহাব। দল মতায় যাওয়ার সুবাদে যাকে হুইপ পর্যন্ত করা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন দৌড়ে ফের সামনে চলে আসেন সাদেক পরিবার। ঢাকা থেকে এএসএইচকে সাদেকের পতœী গৃহবধূ ইসমাত আরা সাদেককে দলের টিকিট ধরিয়ে দেয়া হয়। তিনি জয়লাভ করলে তাকে প্রতিমন্ত্রীও করা হয়। ২০১৮ সালেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন। তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তার ভাগ্যে আর জোটেনি পতাকা। সম্প্রতি তার মৃত্যু হলে আবার কেশবপুরের নির্বাচনী দৌড় শুরু হয়। এবার সূদূর আমেরিকা থেকে এমপি হওয়ার খায়েশে ছুটে আসেন কেশবপুরে প্রখ্যাত চিত্র নায়িকা শাবানা। স্বামী ওয়াহেদ সাদিকের জন্যদাবি করেন মনোনয়ন। কেশবপুরের মানুষের সাথে তার নাড়ির সম্পর্ক বলে দাবি করেন। অবশ্য তার আগেই বিদেশ থেকে মনোনয়ন দৌড়ে পা রাখতে ছুটে আসেন সদ্য প্রয়াত ইসমাত আরা সাদেকের কন্যা নওরীণ সাদেক। সেই দৌড়ে সামিল হন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিন চাকলাদার। এছাড়া কেশবপুরের এইচ এম আমীর হোসেন, মেয়র রফিকুল ইসলাম, কাউন্সিলর ইবাদাত সিদ্দীকী বিপুলসহ অনেকর নাম শোনা যায় মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে।
এবারও কে হবেন কেশবপুরের সংসদীয় আসনের জনপ্রতিনিধি তা নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগে শুরু হয়েছে দলীয় কোন্দল। অন্তত ৪/৫টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যান দলের নেতা কর্মীরা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যার বেশির ভাগ অংশ শাহিন চাকলাদারকে সমর্থন করেন। আরেক অংশ চলে যান নওরীণ সাদেকের সমর্থনে। এইচএম আমির হোসেন ও শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের পওে ভিড় জমান অনেকে। কিন্তু এবারও শেষ রা হয়নি। আবারও বঞ্চিত হন কেশবপুরের আওয়ামী লীগ নেতারা। মনোনয়ন নামের সোনার হরিণ তাদের ভাগ্যে জোটেনি। জোটে শাহিন চাকলাদারের কপালে। এবিষয়ে এইচ এই আমীর হোসেনের কাছে জানে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। দলীয় মুখপাত্র দলের সভাপতি-সম্পাদকের কাছে জানতে পরামর্শ দেন তিনি।

ভাগ