কেন বন্ধ হওয়ার মুখে ভারতের জেট এয়ারওয়েজ?

ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এয়ারলাইন জেট এয়ারওয়েজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সংস্থার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঋণদাতা ব্যাঙ্কগুলোর এক জরুরি বৈঠক সোমবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রবল সঙ্কটের মুখে পড়া এই এয়ারলাইনটিকে বাঁচানোর জন্য জেটের পাইলটরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হস্তক্ষেপ চাইছেন।
প্রধান ঋণদাতা স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার কাছে তারা ১৫০০ কোটি রুপি জরুরি তহবিলের জন্যও আবেদন জানিয়েছেন।
মাত্র কিছুদিন আগেও এই এয়ারলাইনটি সপ্তাহে প্রায় এক হাজার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালাত।
কিন্তু তাদের যাবতীয় অপারেশন এখন প্রায় স্তব্ধ – জেটের কর্মীরা প্রতিবাদে রাস্তাতেও নেমে এসেছেন।
কিন্তু কেন আর কীভাবে সংস্থাটির এই হাল হল?
গত পঁচিশ বছরে ভারতের এভিয়েশন সেক্টরের করুণ ও বিবর্ণ ছবিটাকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্য যে সংস্থাটিকে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেওয়া হয়ে থাকে – সেটি জেট এয়ারওয়েজ।
১৯৯২ সালে ভারতে যখন আর্থিক উদারীকরণের যুগ শুরু হয়, তখন অনাবাসী শিল্পপতি নরেশ গয়ালের হাত ধরে এই কোম্পানির জন্ম ।
আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তারা ভারতে ও ভারতের বাইরে মোট ৫৬টি গন্তব্যে নিয়মিত বিমান চালাত।
কিন্তু সেই জেট এয়ারওয়েজ এখন প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে – গত কয়েকদিন ধরে তাদের কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, পাইলটরা ধর্মঘটের হুমকি দিচ্ছেন।
জেটের কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের কর্মী অদিতি বলছিলেন, “এ মাসে আমরা মাইনে পাইনি।”
“সংস্থার বেশির ভাগ গ্রাউন্ড স্টাফ একেবারে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, ফলে এক মাস মাইনে না-পাওয়ার অর্থই হল বাড়িভাড়ার চেক বাউন্স করা কিংবা ছেলেমেয়ের স্কুলের মাইনে না-দিতে পারা।”
“আমরা চাকরির নিরাপত্তা চাই … কারণ জেট বিপদে পড়লে সংস্থার হাজার হাজার কর্মী চাকরি খোয়াবেন।”
জেটের পাইলটদের অবস্থা আরও করুণ, ক্যাপ্টেন নাসিম যেমন জানাচ্ছেন তাদের কারওরই গত সাড়ে তিন মাস ধরে মাইনে হয়নি।
তবে তার পরেও তিনি বলছিলেন, “মাইনেটা কিন্তু আমাদের প্রধান দাবি নয়, প্রধান দাবি হল জেট এয়ারওয়েজকে আগে বাঁচানো।”
“এর জন্যই আমরা ঋণদাতাদের জরুরি সহায়তা চাই, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।”
“কারণ এয়ারলাইনটা না-থাকলে কিছুই থাকবে না, পুরো জেট পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে!”
বস্তুত কিছুদিন আগেও জেট এয়ারওয়েজের বহরে যে ১২৩টি বিমান ছিল, তার মধ্যে বড়জোর গোটাসাতেক এখন আকাশে উড়ছে।
লন্ডন, ব্রাসেলস, আমস্টার্ডাম, হংকং, সিঙ্গাপুর বা ঢাকা-তে ভারত থেকে জেটের যে সরাসরি উড়ানগুলো ছিল সেগুলোও এখন বন্ধ।
কিন্তু ভারতের যে এয়ারলাইনটি একদিন এমিরেটসের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখত, সেটির এই দশা হওয়ার পেছনে আসলে একাধিক কারণ আছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার সাবেক অধিকর্তা জিতেন্দ্র ভার্গব বিবিসিকে বলছিলেন, “যখন থেকে ভারতের বাজারে ইন্ডিগো বা স্পাইসজেটের মতো লো-কস্ট এয়ারলাইনগুলো এসেছে এবং তারা অনেক কম খরচে প্রায় জেটের মতোই ভাল পরিষেবা দিতে শুরু করেছে তখন থেকেই তাদের এই সঙ্কটের শুরু।”
“কারণ, ভারতীয়রা দামের ব্যাপারে খুব সচেতন, ভাড়া কম হলে তারা ইন্ডিগো বা স্পাইসজেটেই ঝুঁকবে।”
“জেটও দশ বছর আগে যে প্রিমিয়াম পরিষেবাটা দিত, এই চাপের মুখে পড়ে সেটাও তারা দিতে পারছিল না।”
এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞ হেমন্ত বাটরাও জানাচ্ছেন, গত কয়েকমাস ধরেই জেট এয়ারক্র্যাফট লিজিং কোম্পানি, তেল সংস্থা বা অন্য ভেন্ডরদের কিস্তির টাকা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
মি বাটরার কথায়, “কারণ তাদের নগদের টানাটানি তুঙ্গে উঠেছিল, ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়ে গিয়েছিল ১০০ কোটি ডলার।”
“গত মাসে জেটের প্রতিষ্ঠাতা নরেশ গয়ালকেও বিদায় নিতে হয়েছে, নতুন বিডিংয়ের সময়সীমা শেষ হচ্ছে ৩০শে এপ্রিল।”
“কিন্তু যা পরিস্থিতি, তাতে এক্ষুনি ১৫০০ কোটি রুপি টাকা না-ঢাললে জেট হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।”
প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইনগুলো এর মধ্যেই ৪০ বা ৫০ শতাংশ কম বেতনে জেটের পাইলটদের তাদের সংস্থায় যোগ দেওয়ার অফার দিতে শুরু করেছে।
বাজার থেকে জেটের বিদায়ে ভারতে বিমানভাড়াও বেড়ে চলেছে হু হু করে।
অতএব ভারতে এভিয়েশনের একটি দারুণ সফল উদ্যোগের মৃত্যুসংবাদও এখন লিখে ফেলতে হবে কি না, সেটাও জানা যাবে খুব শিগগিরি।

ভাগ