কাটছাঁট ছাড়াই সংক্ষিপ্ততম সময়ে সর্ববৃহৎ বাজেট পাস

লোকসমাজ ডেস্ক॥ জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট পাস হয়েছে অনেকটা কাটছাঁট ছাড়াই। করোনা পরিস্থিতিতে কঠোর সতর্কতার মধ্যে এই বাজেট পাসে সব থেকে সময় ব্যয়ের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আজ পহেলা জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরের এই বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। করোনা মহামারিসহ সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নে আশাবাদী সরকার। গতকাল মঙ্গলবার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে ২০২০-২১ অর্থবছরের এই বাজেট পাস হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১ সালের ৩০শে জুন সমাপ্য অর্থবছরের কার্যাদি নির্বাহের জন্য সংযুক্ত তহবিল হতে অর্থ প্রদান ও নির্দিষ্টকরণের কর্তৃত্ব প্রদানের জন্য আনীত বিলটি ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২০’ পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এরপর সংসদে উপস্থিত সবাই টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এর আগে গত ১১ই জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সংসদ অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার ইতিহাস থাকলেও এবার আলোচনা হয়েছে মাত্র দুইদিন। সর্বশেষ স্বল্পসংখ্যক সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে পাস হওয়া এই বাজেট আজ থেকে কার্যকর হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত মঞ্জুরি দাবি সংসদে তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্য মন্ত্রীরা তাদের মন্ত্রণালয়ের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। এর আগে ৪২১টি ছাঁটাই প্রস্তাব আসে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৫৯টি দাবির বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি’র নয়জন সংসদ সদস্য এই ছাঁটাই প্রস্তাব দেন। যেসব সংসদ সদস্য ছাঁটাই প্রস্তাব দেন তারা হলেন- জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, পীর ফজলুর রহমান, মো. ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, মুজিবুর রহমান (চুন্নু) ও রওশন আরা মান্নান এবং বিএনপি’র মো. হারুনুর রশীদ ও রুমিন ফারহানা। স্পিকার সংসদকে জানান, ৫৯টি দাবির মধ্যে সংসদ সচিবালয় এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে কোনো ছাঁটাই প্রস্তাব নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একটি করে ছাঁটাই প্রস্তাব আছে। এ ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের চার থেকে ৯টি করে ছাঁটাই প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের আলোচনার পর সবগুলো প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। পরে বাজেট পাস হয়। করোনা ভাইরাস সংকটে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় খুব বেশি না বাড়িয়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা নিয়ম অনুযায়ী আগেই অনুমোদন করা হয়েছে। এবার পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই যাবে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। সংসদে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসাবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৮ শতাংশের বেশি। এবারো সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে। যার পরিমাণ এক লাখ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল এক লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা এক লাখ ৯ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে এক লাখ ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৫৭ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৫৫ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে এক হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা পাওয়া যাবে। জাতীয় বাজেটে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হলেও এবার তা সম্ভব হয়নি। এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীর সহায় অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ। তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানো যাবে। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে। বিদায়ী অর্থবছরের ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও কোভিড-১৯ দুর্যোগের মধ্যে তা সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। সামনে গভীর অনিশ্চয়তা রেখেই অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এবার বাজেট অধিবেশন ছিল অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা হয়েছে খুব সীমিত আকারে। যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। এবার সম্পূরক বাজেটের ওপর একদিন আলোচনা করে সেদিনই তা পাস করা হয়। মূল বাজেটের ওপর আলোচনা হয় মাত্র দুইদিন। সচরাচর বাজেট অধিবেশন দীর্ঘ হয়। অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের উপর দুই থেকে চারদিন এবং সাধারণ বাজেটের উপর ১২ থেকে ১৫ দিন আলোচনা হয়। বাজেট নিয়ে ৫০ থেকে শুরু করে ৬৫ ঘণ্টার মতো আলোচনা রেকর্ড রয়েছে। এর আগে ১৯৯৮ সালের বাজেট অধিবেশন ২০ কার্যদিবস চলছিল। এবার সম্পূরক ও মূল বাজেটের ওপর সব মিলিয়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো আলোচনা হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে বসা অধিবেশনে সংক্রমণ এড়াতে প্রতিদিন ৮০-৯০ জন আইন প্রণেতাকে নিয়ে কার্যক্রম চলেছে। বাজেট পাসের পর অধিবেশন আগামী ৮ই জুলাই বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট সাত কার্যদিবস চলে সংসদের অধিবেশন। গত সোমবার অর্থ বিল পাস করার পর মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হলো।
নির্দিষ্টকরণ বিল পাস: আগামী অর্থবছরের বাজেট ব্যয়ের বাইরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সংযুক্ত দায় মিলিয়ে মোট সাত লাখ ৫৯ হাজার ৬৪২ কোটি ৪৪ লাখ ২১ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ২৪ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৮ কোটি ২০ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাইকোর্টের বিচারপতি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতনও অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, গত ১০ই জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। পরের দিন ১১ই জুন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে নানা প্রস্তাব ও সুপারিশ থাকলেও পাস হওয়া মূল বাজেটে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ভাগ